মানুষের জীবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের একটি আন্তরিক বাক্য, একটি সাহসী সমর্থন কিংবা একটি ছোট্ট উৎসাহই ভবিষ্যতের পথচলাকে সহজ করে দেয়। ফুলপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মতিন (মতি) ভাই আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ। আজ তাঁর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছি।
২০০৯ সালের আগস্ট মাসের শুরুতে আমি ফুলপুরে আসি। এর আগে ২০০৬ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত আমাদের ‘এক্সিলেন্ট স্কুল অ্যান্ড মাদরাসা’ হালুয়াঘাটের মাঝিয়াইল মাদরাসা রোডে ভাড়া ভবনে পরিচালিত হতো। সময়ের প্রয়োজনে নতুন ঠিকানার সন্ধান করতে গিয়ে শায়খে বালিয়া আল্লামা গিয়াছ উদ্দিন আহমাদ পাঠান (রহ.)-এর পরামর্শে ফুলপুরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর কলেজ রোডে একটি ভবন নির্বাচন করি এবং শায়খে বালিয়ার সম্মতি নিয়েই সেখানে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে সাবেক সংসদ সদস্য হায়াতের রহমান খান বেলাল এবং তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন মতি ভাইকে আমন্ত্রণ জানাতে যাই। কাজিয়াকান্দা গ্রামের আবুল হাশেম সুজন ভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান। সেদিনই প্রথম মতি ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং আমাদের সম্মান দিয়ে আপ্যায়ন করেন। প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর বিনয় ও সৌজন্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
যদিও পারিবারিক শোকের কারণে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমপি বেলাল খান উপস্থিত হতে পারেননি, তবে কিছুদিন পর ফুলপুর মহিলা কামিল মাদরাসার একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ফেরার পথে এক স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। আমাদের মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ইউনিফর্ম পরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অতিথিদের সালাম জানায়। শিশুদের শৃঙ্খলা ও সৌজন্যে মুগ্ধ হয়ে এমপি সাহেব গাড়ি থামিয়ে মাদরাসা পরিদর্শনে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মতি ভাইও।
মাদরাসার অবকাঠামো দেখে এমপি সাহেব বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, ‘এত বড় মাদরাসা কবে হলো, তুমি জানো, মতি?’ তখন মতি ভাই বিনা দ্বিধায় উত্তর দিয়েছিলেন, ‘জি স্যার, আমি জানি। আমাকে জানানো হয়েছে।’
এই একটি বাক্যই আমার জন্য ছিল বিরাট প্রেরণা। তখন সমাজের একটি অংশ নতুন কোনো মাদরাসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অকারণ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাত। নানা অপপ্রচার ও ভুল ধারণা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও ছিল। সেই সময়ে একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির অকুণ্ঠ সমর্থন আমাকে সাহস জুগিয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজও সেই মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে অম্লান।
ফুলপুরে আসার পর প্রায় দেড় যুগ কেটে গেছে। এই জনপদেই নিজের জায়গা কিনেছি, ঘর নির্মাণ করেছি, সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তবুও কখনো কখনো কিছু মানুষের কাছ থেকে ‘বহিরাগত’ পরিচয়ে তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয়। কিন্তু এসব নিরুৎসাহিত করতে পারেনি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার কর্মেই নিহিত।
মতি ভাই শুধু কথায় নয়, কাজেও আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। তিনি তাঁর বড় ছেলে হৃদিককে আমাদের মাদরাসায় ভর্তি করানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সেই ইচ্ছা বাস্তবায়ন করেন তাঁর শ্বশুর, ৬নং পয়ারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আলহাজ এ কে এম তোফাজ্জল হক। তিনি নিজ হাতে নাতিকে প্রতিদিন মাদরাসায় নিয়ে আসতেন। তাঁদের এই আস্থা ও ভালোবাসা আজও আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
মতি ভাইয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁর জীবদ্দশার একটি সমর্থনের কারণেই আজও অটুট। প্রতি বছর আমরা তাঁর রূহের মাগফিরাতের জন্য কুরআন খতম ও দোয়ার আয়োজন করার চেষ্টা করি। এবারও বিশেষ কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে তাঁর জন্য দোয়া করার ইচ্ছা রয়েছে। তাঁর ছোট ভাই ওয়াহেদুজ্জামান মিঠুনও মেসেঞ্জারে আমাদের কাছে দোয়া কামনা করেছেন। এ উপলক্ষে আজ সোমবার (৩ আগস্ট) দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এগুলো সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হোক; দোয়া রইলো।
মৃত্যু মানুষের জীবনাবসান ঘটায়, কিন্তু সৎকর্ম, মানবিকতা এবং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। মতি ভাই ছিলেন এমনই একজন মানুষ, যিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, নতুন উদ্যোগকে সাহস দিয়ে এবং আন্তরিকতা দিয়ে নিজের স্মৃতিকে অমর করে গেছেন।
তাঁর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা—তিনি যেন মরহুম আব্দুল মতিন (মতি) ভাইকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করেন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ও কল্যাণ দান করেন এবং আমাদের সবাইকে মানুষের কল্যাণে কাজ করার তাওফীক দান করেন। আমিন।