লুৎফর রহমান হিমেল :
২০০০ সালের মার্চ মাস। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ট্যাম্পা শহর। শহরের ব্যস্ত ডাউনটাউনে হঠাৎ একটি ছোট বিমান আছড়ে পড়ল একটি ব্যাংক ভবনে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকা ঘিরে ফেলল পুলিশ। রাস্তায় মানুষের ভিড়। ধোঁয়া, আতঙ্ক, সাইরেন আর দৌড়াদৌড়ি। খবর ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিলেন টিবিও ডটকমের প্রতিবেদক জিম কলিন্স। তিনি দ্রুত লাইভ রিপোর্টিং শুরু করলেন। চোখের সামনে যা দেখছেন, তা পাঠককে জানানো সম্ভব। কিন্তু একটা সমস্যা ছিল। ঘটনাটি যে ভবনে ঘটেছে, সেই ভবন সম্পর্কে গভীর তথ্য তাঁর কাছে ছিল না। ভবনে কারা কাজ করত, কোন কোন প্রতিষ্ঠান সেখানে ছিল, আগের ইতিহাস কী, এসব জানার জন্য ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একজন রিপোর্টারের হাতে তখন সময়ও নেই, তথ্যও নেই।
ঠিক সেই সময় পাশে থাকা ডেস্ক থেকে এগিয়ে এলেন ট্যাম্পা ট্রিবিউনের বিজনেস রিপোর্টার ডেভ সিমানফ। তাঁর কাছে আগে থেকেই ছিল ওই ভবনের ভাড়াটেদের বিস্তারিত তথ্য। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই তথ্য পৌঁছে গেল অন্য প্ল্যাটফর্মের সাংবাদিকদের হাতে। টেলিভিশন পেল তাৎক্ষণিক ছবি ও প্রত্যক্ষ তথ্য, আর সেই তাৎক্ষণিকতার সঙ্গে যুক্ত হলো সংবাদপত্রের তথ্যভাণ্ডার ও প্রেক্ষাপট।
একই ঘটনা। একই ভবন। একই শহর। কিন্তু গল্পটি তৈরি হলো একাধিক সাংবাদিকের তথ্য ও দক্ষতা মিলিয়ে।
এটাই ছিল ট্যাম্পা নিউজ সেন্টারের শক্তি।
একই ছাদের নিচে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা কাজ করছিলেন। তাঁরা তিনটি আলাদা মাধ্যমের জন্য তিনটি আলাদা নিউজ-স্টোরি তৈরি করছিলেন না। বরং একই ঘটনাকে নিজেদের দক্ষতা ও প্ল্যাটফর্ম অনুযায়ী সমৃদ্ধ করছিলেন।
মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমের ধারণাটি বুঝতে এর চেয়ে ভালো উদাহরণ বোধ করি আর দ্বিতীয়টি দিতে হবে না।
একসময় সংবাদপত্রের সাংবাদিক মানেই বুঝাতো সংবাদপত্রেরই সাংবাদিক। টেলিভিশনের সাংবাদিক আলাদা। রেডিওর সাংবাদিক আলাদা। অনলাইন সাংবাদিকতা যখন নতুন ছিল, তখন অনলাইনও যেন আলাদা একটি জগৎ। প্রত্যেকের আলাদা নিউজরুম, আলাদা রিপোর্টিং ব্যবস্থা, আলাদা সম্পাদক, আলাদা সময়সূচি।
প্রযুক্তি এসে সেই দেয়াল ভেঙে দিয়েছে।
আজ একটি স্মার্টফোন দিয়ে ছবি তোলা যায়, ভিডিও করা যায়, অডিও রেকর্ড করা যায়, সাক্ষাৎকার নেওয়া যায়, লাইভ করা যায়, ভিডিও সম্পাদনা করা যায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে তা প্রকাশ করা যায়। একজন সাংবাদিকের পকেটের ডিভাইসটিই অনেক সময় ছোট একটি নিউজরুমের কাজ করতে পারে।
কিন্তু মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমের অর্থ শুধু এই নয় যে একজন সাংবাদিককে সব কাজ জানতে হবে।
বিষয়টি আরও গভীর।
মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম হলো এমন একটি সম্পাদকীয় কাঠামো, যেখানে সংবাদ সংগ্রহ, যাচাই, সম্পাদনা ও পরিকল্পনার মূল প্রক্রিয়াটি সমন্বিত থাকে এবং সেই সাংবাদিকতাকে প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়েব, প্রিন্ট, ভিডিও, অডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম, নিউজলেটার কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়।
অর্থাৎ মাধ্যম আলাদা হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার কেন্দ্রটি এক।
কেন এই পরিবর্তন হলো
প্রথম কারণ প্রযুক্তি। আগে একটি সংবাদপত্রের জন্য ছবি তুলতে আলাদা ফটোগ্রাফার, ভিডিও করতে আলাদা ক্যামেরা টিম, অডিও রেকর্ড করতে আলাদা ব্যবস্থা এবং লেখা তৈরির জন্য আলাদা রিপোর্টার দরকার হতো। এখন একটি স্মার্টফোন এবং কয়েকটি ডিজিটাল সরঞ্জাম দিয়ে এসব কাজের একটি বড় অংশ করা সম্ভব।
দ্বিতীয় কারণ পাঠকের আচরণ বদলে গেছে।
একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে খবরের শিরোনাম পড়ছেন। অফিসে যাওয়ার পথে ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখছেন। দুপুরে ইউটিউবে একটি বিশ্লেষণ শুনছেন। সন্ধ্যায় টেলিভিশনে পুরো ঘটনার প্রতিবেদন দেখছেন। রাতে হয়তো একই ঘটনার বিস্তারিত বিশ্লেষণ পড়ছেন ওয়েবসাইটে।
এই পাঠককে আর শুধু “পত্রিকার পাঠক” বা “টেলিভিশনের দর্শক” দিয়ে বোঝা যায় না। তিনি একই সঙ্গে পাঠক, দর্শক এবং শ্রোতা।
তাই একটি আধুনিক সংবাদ প্রতিষ্ঠানকেও একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় উপস্থিত থাকতে হচ্ছে।
তৃতীয় কারণ ব্যবসা।
আলাদা আলাদা নিউজরুম মানে আলাদা লোকবল, আলাদা অবকাঠামো, আলাদা প্রযুক্তি, আলাদা ব্যবস্থাপনা এবং অনেক ক্ষেত্রে একই খবরের জন্য একাধিকবার একই ধরনের কাজ করা।
একজন রিপোর্টার একটি খবর লিখছেন। অন্য একজন সেই একই খবর আবার অনলাইনের জন্য লিখছেন। তৃতীয় একজন সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়ার জন্য ছোট করছেন। ভিডিও টিম আবার একই তথ্য নিয়ে আলাদা স্ক্রিপ্ট তৈরি করছে।
এভাবে একই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একই সাংবাদিকতার জন্য বারবার শ্রম খরচ হচ্ছে।
মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম সেই অপচয় কমানোর চেষ্টা করে।
তবে এখানেই একটি বড় ভুল করা হয়। অনেকে মনে করেন, মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম মানেই কর্মী কমিয়ে দেওয়া। আসলে বিষয়টি তা নয়। উদ্দেশ্য হলো একই সাংবাদিকতা থেকে সর্বোচ্চটা বের করে আনা।
একজন রিপোর্টার একটি ভালো অনুসন্ধান করলেন। সেই অনুসন্ধান শুধু একটি ওয়েব প্রতিবেদনে আটকে থাকবে কেন?
সেটি থেকে তৈরি হতে পারে একটি বিস্তারিত লংফর্ম প্রতিবেদন, একটি ভিডিও এক্সপ্লেইনার, কয়েকটি ছোট ভিডিও, একটি তথ্যচিত্র, একটি ইনফোগ্রাফিক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট, একটি পডকাস্ট এবং পরদিন ছাপা সংস্করণের জন্য বিশ্লেষণ।
এখানে একেকজন কর্মী একেকটি আলাদা নিউজ স্টোরি করছেন না। একটি রিপোর্টিংয়ের ফলাফলকে বিভিন্ন মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এটাই কর্মী বাহিনীর কার্যকর ব্যবহার।
একটি মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমকে তিনটি স্তরে দেখা যায়।
প্রথম স্তর হলো সাংবাদিকতা।
খবর কোথা থেকে আসবে? কে রিপোর্ট করবে? তথ্য কীভাবে যাচাই হবে? সোর্স কে? কোন তথ্য প্রকাশযোগ্য? কোনটি প্রকাশের আগে আরও যাচাই দরকার?
দ্বিতীয় স্তর হলো প্রোডাকশন।
এই সাংবাদিকতাকে কোন মাধ্যমে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে? ওয়েবের জন্য কতটা বিস্তারিত লেখা দরকার? ভিডিও কত দীর্ঘ হবে? কোন তথ্য গ্রাফিক্সে দেখালে ভালো বোঝা যাবে? কোন অংশটি অডিওতে বেশি কার্যকর?
তৃতীয় স্তর হলো ডিস্ট্রিবিউশন।
কোথায় প্রকাশ করা হবে? ওয়েবসাইটে কখন যাবে? ফেসবুকে কীভাবে যাবে? ইউটিউবের জন্য আলাদা প্যাকেজিং দরকার কি না? নিউজলেটারে কোন অংশ যাবে? পাঠক কোন প্ল্যাটফর্মে কীভাবে গল্পটি গ্রহণ করছে?
এই তিনটি স্তর একসঙ্গে কাজ করলেই একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম তৈরি হয়।
একজন রিপোর্টার কি সবকিছু করবেন?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়।
মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা মানে একজন রিপোর্টারকে একই সঙ্গে ভালো লেখক, ভালো ফটোগ্রাফার, ভালো ক্যামেরাপারসন, ভালো ভিডিও এডিটর, ভালো গ্রাফিক্স ডিজাইনার এবং ভালো সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার বানানো নয়।
একজন সাংবাদিকের কিছু অতিরিক্ত দক্ষতা থাকা অবশ্যই বড় সুবিধা।
একজন রাজনৈতিক রিপোর্টার যদি স্মার্টফোনে ভালো ভিডিও করতে পারেন, তা তাঁর রিপোর্টিংকে আরও শক্তিশালী করবে। একজন অপরাধ প্রতিবেদক যদি ঘটনাস্থলে ভালো ছবি তুলতে পারেন, সেটিও বাড়তি শক্তি। একজন ব্যবসা রিপোর্টার যদি ডেটা থেকে একটি সাধারণ গ্রাফিক্সের ধারণা দিতে পারেন, তাতেও গল্প সমৃদ্ধ হবে।
কিন্তু বড় ও জটিল সাংবাদিকতায় বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন থাকবেই।
একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রিপোর্টার তথ্য সংগ্রহ করবেন, ডেটা সাংবাদিক তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, ফ্যাক্ট-চেকার তথ্য যাচাই করবেন, ভিডিও টিম ভিজ্যুয়াল তৈরি করবে, গ্রাফিক্স টিম জটিল তথ্য সহজ করে দেখাবে এবং সম্পাদক পুরো গল্পটির সাংবাদিকতার মান নিশ্চিত করবেন।
তাই ভবিষ্যতের নিউজরুমে সবচেয়ে কার্যকর মডেল হবে মাল্টি-স্কিলড সাংবাদিক + বিশেষজ্ঞ সহায়তা।
একটি খবর কতভাবে ব্যবহার করা যায়
ধরা যাক, একজন রিপোর্টার একটি শিল্পকারখানার দূষণ নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন।
মূল অনুসন্ধান প্রকাশ হলো ওয়েবসাইটে।
কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ নয়।
ডেটা সাংবাদিক সেই কারখানার দূষণের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন। গ্রাফিক্স টিম দেখাতে পারে গত পাঁচ বছরে দূষণের মাত্রা কীভাবে বদলেছে। ভিডিও টিম কারখানার আশপাশের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি ভিজ্যুয়াল স্টোরি বানাতে পারে। মোবাইল সাংবাদিক ছোট একটি মাঠপর্যায়ের ভিডিও করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে ছোট ভিডিও বা কার্ড তৈরি করতে পারে। পডকাস্ট টিম সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞকে নিয়ে আলোচনা করতে পারে। পরদিন ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত হতে পারে অনুসন্ধানের বিশ্লেষণ ও প্রভাব।
* একটি রিপোর্টিং কিন্তু বহু ধরনের সাংবাদিকতা। এখানেই একটি শক্তিশালী মাল্টিমিডিয়া নিউজরুমের অর্থনৈতিক ও সম্পাদকীয় শক্তি।
* অনলাইন থেকে সংগৃহীত।