হাফেজ মাওলানা নাজমুস সাকিব :
অদ্ভুত একটা বিষয়! আল্লাহর হেকমত বোঝা বড়ই কঠিন। কার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তার বান্দার রিজিকের ব্যবস্থা করে দিবেন সেটা তিনিই ভালো বুঝেন।
যাচ্ছিলাম অফিসিয়াল একটা কাজে, কেরানীগঞ্জে। উত্তরা আসতেই হঠাৎ বিশেষ একটা কারণে কেরানীগঞ্জ যেতে দুই থেকে তিন ঘন্টা দেরি হবে মনে হলো। আর এই সময়টুকু উত্তরাতেই কাটাতে হবে। বরাবরই আমি রাস্তায় কোন কারণে অবসর সময় কাটাতে হলে আশেপাশে মসজিদ অথবা মাদ্রাসায় গিয়ে সময়টুকু পার করার চেষ্টা করি। তো যাচ্ছি মসজিদের উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রাস্তায় দেখা মিললো জীর্ণশীর্ণ কাপড় পরা, লাল একটা গামছা গলায় পেঁচানো সাদা দাঁড়িওয়ালা সুন্দর চেহারার একজন বৃদ্ধ দাদার সাথে। উনার হাতে অনেকগুলো কাপড়ের টুকরোসহ ইট-পাথরের একটা বস্তাবন্দি টোপলা। রাস্তার পাশে শুয়ে আছেন। আর সেই বস্তাবন্দি টোপলাটা পেটের উপর চাপা দিয়ে রেখেছেন! আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। উনার এই অবস্থা দেখে খুব মায়া লাগলো। মনে মনে ভাবলাম, এই ভদ্রলোকটা হয়তো কারো বাবা, চাচা, নানা অথবা কোন স্ত্রীর প্রিয়তম স্বামী বা কোন মায়ের আদরের সন্তান ছিলেন! কিন্তু আজ সে রাস্তায় থাকা পাগলদের মধ্যে একজন। এটাই হয়তো এখন তার সবচেয়ে বড় পরিচয়! কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম। কোন উত্তর পোলাম না। আবারও গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা! পেটের উপর টোপলা চেপে রেখেছেন কেন? মাথার নিচে তো কোন কিছু নেই। এইভাবে শুয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না? এ কথা জিজ্ঞেস করার পর উনি আমাকে যে উত্তরটা দিলেন, তা শুনে আমার চোখ ভিজে গেলো। বাবা, ক্ষুধার যন্ত্রণায় পেটে টোপলাটা চেপে ধরে রেখেছি! বাবা, কারো কাছে কিছু চাইনা। ক্ষুধার যন্ত্রণা যিনি দিয়েছেন, উনিই একটা ব্যবস্থা করবেন এই আশায় আছি। আমি না খেয়ে থাকিনা, বাবা। উনার কথাগুলো শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম! আর ভাবলাম, জানিনা আল্লাহ উনাকে কেন এই অবস্থায় রেখেছেন। আল্লাহর উপর উনার তাওয়াককুল দেখে অভিভূত হলাম। ভাবলাম, আমরা রিজিকের পিছনে ঘুরতে ঘুরতে রিজিক দাতাকেই ভূলে যাচ্ছি। আর উনি? —। পরে উনাকে পাশেই একটা ছোট খাবার হোটেলে নিয়ে গেলাম। গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কি খাবেন? উনি বললেন, বাবা, আমি ভাত খাবো। জিজ্ঞেস করলাম, কি তরকারি দিয়ে খাবেন? উনি বললেন, ভাত আর একটু লবণ হলেই হবে! আমি বললাম, শুধু লবণ দিয়ে কি খাওয়া যায়? লজ্জা না পেয়ে বলেন, কি তরকারি দিতে বলবো? উনি বললেন, অনেক দিন ধরে মন চাইছে ডিম দিয়ে ভাত খাবো। পরে উনাকে ডিমের তরকারি দিতে বললাম। ডিম দিয়ে খেতে দেখে মনে হচ্ছে উনি যেন অমৃত কিছু একটা খাচ্ছেন! উনার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক কিছু মনে মনে ভাবলাম। আর আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করলাম এবং অনেক কিছু চাইলাম। আল্লাহ আমাকে যেন এমন সাধ্য দান করেন যেন আমি আমার মনের আশা পূরণ করে এ সকল আল্লাহর খাস বান্দদের খেদমত করে আল্লাহর প্রিয় পাত্র হতে পারি।