যাদের লেখায় সারা বাংলার আনাচে কানাচে অহরহ রাস্তা হয়, রাস্তা সংস্কার হয়, অসহায় দুঃখী মানুষের দুঃখ দূর হয়, কষ্ট লাঘব হয় সেই প্রতিথযশা তারকা সাংবাদিক জাতীয় প্রেসক্লাবের সম্মানিত সদস্য ড. গালিব হাসান ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের অ্যাসিস্ট্যান্ট নিউজ এডিটর শায়খুল হাসান মুকুল ভাইয়ের মমতাময়ী মা মহীয়সী নারী জোবাইদা খাতুনের মরদেহ নিয়ে তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার ১নং ছনধরা ইউনিয়নের মেরিগাই গ্রামের বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারেনি অ্যাম্বুলেন্স।
পথে নামিয়ে খাটকিতে উঠিয়ে কাঁধে করে বাড়ি পর্যন্ত নিতে হয়েছে মরদেহটি। কেননা, তাদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার মধ্যে কয়েকটি বড় বড় খাদ, গর্ত। পানি জমে আছে। গর্তগুলো এতটাই বড় যে ওখানে অ্যাম্বুলেন্স পড়লে মোচড় দিয়ে উল্টে গাড়ি রাস্তার নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে মায়ের মরদেহ তারা কাঁধে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
দৃশ্যটা ছিল খুবই করুণ, খুবই মর্মান্তিক। আমি ওই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। বিষয়টি আমাকে পীড়া দিয়েছে। জাতির জন্য যারা এতকিছু করেন জাতি তাদের জন্য কিছুই করবে না? তাদের মায়ের মরদেহটিও কি ভালোভাবে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে না? আপনাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে গেলাম। ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো। এগুলো লিখছি কেন? আমার বিবেকের দায় থেকে। মনটা আমার ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বুকে যেন মারাত্মক আঘাত পেয়েছি; ব্যথা অনুভব করছিলাম। আমরা ছোট। আমাদের এমন কোন পরিচয় নেই যে এক ডাকে সবাই আমাদেরকে চিনে ফেলবে। কিন্তু যাদের নিয়ে লিখছি তারা তেমনই পরিচিত, সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত ফ্যামিলির লোক। উনাদের আব্বা মাওলানা জয়নুল আবেদীন অনেক নামকরা মানুষ ছিলেন। তিনি ভাইটকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। উনার শত শত ছাত্র ছাত্রী রয়েছে এদেশে। উনার মেয়েদেরকে বিয়ে দিয়েছেন যাদের কাছে তারাও এরকম সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য। কিন্তু আমাদের এ সে রকম কোন পরিচয় নেই। এটাই বাস্তবতা, এটাই সত্য। তারপরও আমাদের মা-বাবার বিষয়ে এমন পরিস্থিতি হয়তো সহজেই মেনে নিতে পারতাম না। নিলেও কষ্ট হতো। হয়তো সেই কষ্টটাই আজ উনারা পেয়েছেন। এরকম কষ্ট যাতে আগামী দিনে আর না পাওয়া লাগে সেই লক্ষ্য নিয়ে লিখছি। আলহামদুলিল্লাহ, সকল দিক থেকে আমরা ভালো আছি। পাকা সড়কের সাথে আমাদের বাড়ি। ফরোয়ার্ড জায়গায় আছি।
আলহামদু লিল্লাহ, উনাদের গ্রামের বাড়িও বিশাল এরিয়া নিয়ে। রাস্তাও আছে। এরপরও অ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে যেতে পারেনি শুধু রাস্তাটিকে সংস্কার না করার কারণে। রাস্তাটিতে ঠিকমতো মাটি ভরাটই হয়নি। হরিণাদী এমদাদীয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে কিছু রাস্তা ইট দিয়ে সলিং করা হলেও উনাদের বাড়ি পর্যন্ত আজও কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। বলতে গেলে এলাকাটি উন্নয়ন বঞ্চিত। তেপুরাইন্যা আদিকালের যে রাস্তাটি ছিল সেটি দিয়েই তারা চলাচল করে থাকেন। ঢাকা থেকে গাড়ি নিয়ে উনারা বাড়ি আসলে সেই গাড়ি হরিণাদী মাদরাসা সংলগ্ন স্থানে রেখে পায়ে হেঁটে বাড়িতে যাতায়াত করেন। এবার নিজের চোখে মুকুল ভাইকে দেখেছি খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কেননা, রাস্তাটি তখন জায়গায় জায়গায় এমন অবস্থায় ছিল যে জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটার মতও উপযুক্ত ছিল না। তেপুরাইন্যা এই রাস্তাটি এখন ভেঙে চুরে গর্ত হয়ে বড় বড় খাদ তৈরি হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। শুকনো সীজনে পায়ে হেঁটে চলাচল করা গেলেও বর্ষাকালে তাও সম্ভব নয়। বিশেষ প্রয়োজনে বর্ষাকালে একবার উনাদের বাড়িতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে এ প্রতিবেদকের। হাঁটুর উপর পর্যন্ত কাপড় ভিজিয়ে যেতে হয়েছিল। তখন উনারা বা বিশেষ করে শিশু ও মহিলারা নৌকা দিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। সেখান থেকে ফিরে তখন আমরা এ রাস্তাটি সংস্কার করার দাবি জানিয়ে নিউজ করেছিলাম। কিন্তু প্রশাসন তাতে নজর দেয়নি। এবার আবারও জানাজায় শরীক হতে গিয়ে যে নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম, যারা সবসময় ‘ঘর থেকে গাড়ি, গাড়ি থেকে ঘর’ এভাবে চলাচল করে থাকেন তাদের মমতাময়ী মায়ের চির বিদায়ের সময় মরদেহটি অ্যাম্বুলেন্স থেকে পথে নামিয়ে খাটকিতে তুলে কাঁধে করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার যে করুণ দৃশ্য দেখে আসলাম তা ভুলতে পারছি না; শুধু কষ্টই পেলাম। হয়তো উনারা এ রাস্তাটি করার বিষয়ে কোনদিন কাউকে কিছু বলেননি। বললে অবশ্য তখন তখনই হয়ে যেতো বলে আমার বিশ্বাস। তবে কেন বলেননি? কি সমস্যা? এসব বিষয় আমার জানা নেই। লেখাটা আমি নিজ থেকে লিখেছি। আমি প্রয়োজন অনুভব করেছি তাই লিখেছি। কেননা, আজ উনাদের মায়ের মরদেহ বাড়ি পর্যন্ত গাড়ি দিয়ে নিতে পারেননি এটাই শেষ নয় হয়তো সামনে আরও এমন বিপদ যে কারো জন্য আসতে পারে, ওই এলাকার যে কোন মানুষের সমস্যা দেখা দিতে পারে, অ্যাম্বুলেন্স বাড়িতে আনা লাগতে পারে তখন কেমন করে সম্ভব, বলুন? এজন্য বলছি- এরকম করুণ দৃশ্য আমরা সামনে আর দেখতে চাই না।
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যারা রয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো, আপনারা রাস্তাটা সরেজমিন পরিদর্শন করুন। যদি রাস্তাটা করার মত উপযুক্ত বলে মনে হয় তাহলে দয়া করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।