মো. আব্দুল মান্নান :
ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার সিংহেশ্বর ইউনিয়নের পলাশকান্দা গ্রামে মালিঝি নদী থেকে বের হয়ে আসা খালের উপর উত্তরপাড়া জামে মসজিদ ও শহীদের বাড়ির মাঝখানে বড় পুটিয়া বাজারে যাওয়ার রাস্তায় ১৯ বছর ধরে ভেঙে কাত হয়ে পড়ে আছে একটি ব্রিজ! দফায় দফায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনেক লেখালেখি হয়েছে। প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর অফিস থেকে লোকজন যায়। গিয়ে মাপ ঝুক করে চলে আসে কিন্তু ব্রিজ আর হয় না। এগুলো দেখতে দেখতে এলাকাবাসী এখন অতিষ্ঠ। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ব্রিজটি হয়েছিল। তারপর তারা ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু এত দীর্ঘ সময়েও ব্রিজটির উন্নয়নে কাজ করেনি। এমনকি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছর অতিক্রান্ত হলেও উনারাও এটি মেরামতের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এ ব্রিজটির জন্য ধান-বন বহন ঘরে উঠানো, রোগী টানা, স্কুলে যাওয়া ও নিত্য-নৈমিত্তিক চলাচলে যাতায়াত দুর্ভোগ তো আছেই, সবচেয়ে হৃদয় বিদারক ঘটনা হলো- এই ব্রিজ ও রাস্তার কারণে ভাল জায়গায় অভিভাবকরা তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদি দিতে পারেননি। এর দায় নেবে কে?
পলাশকান্দা গ্রামের মো. ইসরাফিল হোসেন ও উত্তর পাড়া জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা বিলাল হুসাইন বলেন, বড় পুটিয়া, পুরা পুটিয়া, দনারভিটা, মাইঝপাড়া, পলাশকান্দা ও চাতুলিয়াকান্দাসহ এর আশপাশ এলাকার মানুষ এই ভাঙা ব্রিজের কারণে নানাভাবে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একটা ধান ভাঙানির মেশিন পর্যন্ত এই পাড়া থেকে হেই পাড়ায় নেওয়া যায় না।
এসব ভোগান্তির কথা তুলে ধরে ২০১৮ সনেও এ প্রতিবেদকের একটি নিউজ পাবলিশ হয়েছিল। এর কিছুদিন পর স্থানীয় এলজিইডি অফিস থেকে বলা হয়েছিল যে, ব্রিজটির টেন্ডার হয়ে গেছে। কিন্তু এরও প্রায় ৭ বছর পর শনিবার (৫ জুলাই ২০২৫) আবারও সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় ব্রিজটি সেই আগের মতই কাত হয়ে পড়ে আছে। এ বিষয়ে কথা হয় এলাকার ভুক্তভোগী মানুষের সাথে। বড় পুটিয়া গ্রামের আব্দুল জুব্বার বলেন, পলাশকান্দা গ্রামে আমার শ্বশুর বাড়ি। মরহুম আব্দুল হাকিম ভেন্ডার আমার শ্বশুর।

একদিন শ্বশুর বাড়ি থেকে বাড়িতে যাওয়ার সময় এই ভাঙা ব্রিজে গিয়া পড়ছি বিপদে। নড়বড়ে বাঁশ। থরথরায়া কাঁপতাছে। পরে এইন্দা না উইট্যা মনে করলাম যে নিচে দিয়া যাইগা। যেই নামছি ওমনি একটা টান মাইরা স্রোতে আমারে ভাসায়া লইয়া গেছেগা। পরে হেই অনেকটা দূরে গিয়া বিন্নার ছুবাত বাজছি। এরপর আস্তে আস্তে পাড়ে উইট্যা ভিজ্যা বাড়িত গেছি। পলাশকান্দা গ্রামের কৃষক লিয়াকত আলীর সাথে কথা হয়েছিল এর আগের বার। তিনি বলছিলেন, বহু কষ্ট কইরা মেয়েডারে বিএ পাস করাইছি। পয়ারী গ্রাম থাইক্যা আমার মেয়ের লাইগ্যা ভালা একটা প্রস্তাব আইছিন। তারা ফস্ট কইছে, আইফনের মেয়েরে আমরার পছন্দ অইছে কিন্তু ব্রিজডার লাইগ্যা আর রাস্তাডার লাইগ্যা পছন্দ অইছে না। এসময় কষ্টে উনার চোখ ছলছল করে ওঠে। একই গ্রামের মো. শাহাদত হোসেন বলেন, ব্রিজটি করার সময়ই দুর্বল অইছে। যে কারণে একটা বছরও টিকছে না। কাইত অইয়া পইড়া গেছে। এর কারণে আমরা সীমাহীন কষ্টে আছি। মো. জিয়াউল হুদা বলেন, এই ব্রিজ আমরার কোন উপকারে আইছে না। এইডা ভাইঙা কাইত অইয়া পইড়া আমরার আরও বিপদ অইছে। ফিশারীতে যাইতারি না। গাড়ি টারি কিচ্ছু নিতারি না। যে কোন সময় পোলাপান এইনো আয়া পইড়া মইরা যাওনের ভাউ অইছে। কিন্তু কি করবাম? নিরুপায় অইয়া আমরা গ্রামবাসী মিল্যা পরে বাশখুডা দিয়া হাহু (সাঁকো) বানায়া চলছি কতদিন। এরপর হাহুও ভাইঙা গেছে। ভাইঙা যাওয়ার পর আবারও চাঁদাটাদা উডায়া ভেকু দিয়া মাডি কাডায়া দুই পাশের সংযোগ সড়কে যে ফাঁকা আছিন এডি ভইরা পায়ে আইট্যা যাওনের ভাউ করছি। অহন এইবা চলতাছে। কিন্তু কোন গাড়ি ঘোড়া এইন্দা যাইতারে না। সাঁকোটি এ প্রতিবেদক পরিদর্শনে গিয়েছেন শুনে পলাশকান্দা গ্রামের আবুল হোসেন নামে এক মুরুব্বি এসে দেখা করে বলেন, বেডাইন আয়া খালি মাইপ্যা মুইপ্যা যায়গা। কিন্তু বিরিজ ত আর অয় না!