আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ময়মনসিংহের ফুলপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পুরাতন ডাকবাংলার কাজীবাড়ীর কৃতি সন্তান, ওমান প্রবাসী ইমাম হাফেজ রেজাউল করিমের জানাজায় গিয়ে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। অল্প বয়সেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। রেখে গেলেন মাত্র ছয় মাস বয়সী এক কন্যাশিশু ও অল্পবয়সী স্ত্রীকে।
হাফেজ রেজাউল করিম ছিলেন অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। আমলদার, আল্লাহওয়ালা ও বিনয়ী মানুষ হিসেবে তার পরিচিতি ছিল। তাকে নিয়ে তার ভাইয়েরা গর্ব করতেন। তাদের আশা ছিল—একদিন তারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলে ছোট ভাই রেজাউলই হয়তো তাদের জানাজায় ইমামতি করবেন। কিন্তু আল্লাহর লিখন যে ভিন্ন!
আজ সেই রেজাউলেরই জানাজা তার ভাইদের পড়তে হলো। শেষ পর্যন্ত তার বোনজামাই জানাজায় ইমামতি করেন। মানুষের পরিকল্পনা একরকম, আর আল্লাহ তায়ালার ফয়সালা আরেক রকম। মৃত্যু আমাদের সেই চিরন্তন সত্যের কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—কখন কার ডাক আসে, তা কেউ জানে না।
জানাজার আগে সমবেত স্বজনদের মাঝে যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল হৃদয়বিদারক। হাফেজ রেজাউলের সহোদর ভাই ইমরান কাজী, চাচাতো ভাই তাহের শাহ, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব—প্রত্যেকের চোখেমুখে ছিল শোকের ছাপ। কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল পরিবেশ। প্রিয় একজন মানুষকে হারানোর বেদনা সেখানে স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
জানাজায় যাওয়ার পথেও মনের মধ্যে বারবার একটি কথাই ঘুরছিল—মাত্র ছয় মাস বয়সী শিশুটির কী হবে? অল্পবয়সী স্ত্রী কীভাবে এই শোক ও বাস্তবতার ভার বহন করবেন?
মুফতী আজীমুদ্দীন শাহ জামালী হুজুরের সঙ্গে রিকশায় করে জানাজায় যাওয়ার সময়ও আমরা এসব নিয়েই আলোচনা করছিলাম। কষ্ট পাচ্ছিলাম। কিন্তু জানাজাস্থলে গিয়ে সেই কষ্ট যেন আরও গভীর হয়ে গেল।
সেখানে দেখলাম, ফুলপুর থানার সাবেক এসআই এবং আমাদের অত্যন্ত কাছের মানুষ মোফাখখারুল ইসলাম ভাই বক্তব্য রাখছেন। তিনি ছিলেন হাফেজ রেজাউলের শ্বশুর। বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি যখন কান্নায় ভেঙে পড়লেন, তখন তার কণ্ঠের প্রতিটি শব্দ যেন হৃদয়ে আঘাত করছিল।
বক্তব্য শেষে সামনের কাতার থেকে যখন মোফাখখার ভাইয়ের কাছে এগিয়ে গেলাম, তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে কেঁদে উঠলেন—নিজের চোখের পানিও আর ধরে রাখতে পারলাম না। মনে হলো, তার মেয়ে যেন আমার নিজের মেয়ের মতো, আর তার ছোট্ট নাতনিটিও যেন আমার নিজের নাতনি। সেই মুহূর্তে এতিম শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মনের ভেতর নতুন করে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলো।
কিন্তু টেনশন করে তো আমরা কিছুই করতে পারব না। মানুষের সাধ্যের সীমা আছে। আমাদের করণীয় একটাই—আল্লাহ তায়ালার দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়া করা।
হে আল্লাহ হাফেজ রেজাউল করিমকে ক্ষমা করে দাও। তার কবরকে নূরে ভরপুর করে দাও। তাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান হিসেবে কবুল কর।
হে আল্লাহ, তার রেখে যাওয়া ছয় মাসের নিষ্পাপ কন্যাশিশুটিকে তোমার হেফাজতে রাখ। তার মাকে সবর দান কর। মোফাখখারুল ইসলাম ভাইসহ হাফেজ রেজাউলের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে এই কঠিন শোক সহ্য করার তাওফীক দান কর।
আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সবরে জামিল এখতিয়ার করার তাওফীক দান করুক।