আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া যখন নাগরিক জীবনে নানা সুযোগ-সুবিধার দ্বার খুলে দিয়েছে, তখন দেশের অনেক সীমান্তবর্তী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা এখনো মৌলিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। শহুরে পরিবেশে প্রযুক্তি ও মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার যখন সন্তানদের সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অভিভাবকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, ঠিক তখনই সীমান্তঘেঁষা অজপাড়াগাঁয়ের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার নীরব প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে দানিম ফাউন্ডেশন পরিচালিত তালিমুল কোরআন একাডেমি।

নেত্রকোনার দুর্গাপুর এবং শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার বাবলাকোনা—সীমান্তঘেঁষা এই দুই এলাকায় গড়ে উঠেছে তালিমুল কোরআন একাডেমির প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটিতে প্রায় আড়াই শত শিশু প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ও ইউনিফর্মও বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে। ফলে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের সন্তানদের জন্য এসব শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার নতুন দ্বার।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এসব শিক্ষার্থীর শিক্ষার মান, আচার-আচরণ, আদব-কায়দা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও শিশুদের মধ্যে যে শৃঙ্খলাবোধ, নৈতিকতা ও শেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। এটি প্রমাণ করে—সঠিক দিকনির্দেশনা, আন্তরিক পরিচর্যা ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ পেলে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুরাও সমাজের আলোকিত নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি আলোচিত শিক্ষা কেন্দ্র দুটির কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করেন ভূমি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ এবং ইত্তেফাকুল উলামা বৃহত্তর মোমেনশাহীর সিনিয়র সহ-সভাপতি মুফতী আহমদ আলীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
পরিদর্শনকালে শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণ, শৃঙ্খলা ও সার্বিক কার্যক্রম দেখে সংসদ সদস্য মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ সন্তোষ ও মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরও বেশি করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু তাকে পড়তে শেখানো নয়; বরং তার সামনে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়া। আর সেই শিক্ষা যদি জ্ঞান, নৈতিকতা, আদব-কায়দা ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে হয়, তাহলে তা একটি পরিবার নয়—একটি সমাজের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন নিবেদিতপ্রাণ জ্ঞানসাধক, একনিষ্ঠ সমাজসেবক ও নিভৃতচারী আলেম মাওলানা আমীনুল হক। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তাঁর এই উদ্যোগ প্রান্তিক শিশুদের জন্য যে সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করছে, তা সমাজের আরও বিত্তবান ও সক্ষম ব্যক্তিদের জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে।
দেশের উন্নয়ন শুধু শহরের অবকাঠামো, সড়ক কিংবা প্রযুক্তির প্রসারে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন সীমান্তের প্রত্যন্ত গ্রামের একটি দরিদ্র শিশুও শিক্ষার আলো, নৈতিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাবে। তাই তালিমুল কোরআন একাডেমির মতো উদ্যোগগুলোকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক প্রচেষ্টা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সীমান্তের প্রান্তিক শিশুদের হাতে যখন বই, খাতা ও কলম; চোখে যখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন—তখন সেখানেই গড়ে উঠছে আগামীর আলোকিত প্রজন্ম। এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হোক, আরও বহু শিশুর জীবনে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিক—এটাই প্রত্যাশা।
* মুফতি আমির ইবনে আহমদের আইডি থেকে তথ্য ও ছবি সংগৃহীত।