“এত স্কুল, এত পরীক্ষা, এত সার্টিফিকেট! কিন্তু এত কিছুর ভিড়ে সত্যিকারের শিক্ষাটা আসলে কোথায়? অথচ উচিত ছিল পরীক্ষার জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীর জন্য প্রস্তুত করা।”
প্রশ্নটি করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি শিক্ষা বিভাগের মেধাবী ছাত্রী, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ‘হিজাবী কন্যা’ ফাতিহা আয়াত। মাত্র ৭ বছর বয়স থেকে জাতিসংঘের ইকোসক চেম্বারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে বাংলাদেশ ও বিশ্ববাসীর শান্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশুদের অধিকার নিয়ে বক্তব্য দিয়ে আসছেন তিনি। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ১৭তম আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস ইয়ুথ সামিটে তিনি লাভ করেন ‘হিউম্যান রাইটস হিরো অ্যাওয়ার্ড’। এর আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনে তিনি ‘অনারেবল মেনশন’ খেতাবও অর্জন করেছেন।
১৭ সেপ্টেম্বর—মহান শিক্ষা দিবস। ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে মোস্তফা, বাবুল, ওয়াজিউল্লাহসহ অনেকে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের ৬৪ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—রক্তের বিনিময়ে অর্জিত শিক্ষার অধিকারকে আমরা কি কেবল ভর্তি, পরীক্ষা, জিপিএ ও সার্টিফিকেট অর্জনের অধিকারে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের Multiple Indicator Cluster Survey (MICS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ৭–১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র ৫০ দশমিক ২ শতাংশ মৌলিক পড়ার দক্ষতা এবং ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ মৌলিক গণিতের দক্ষতা অর্জন করেছে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সমস্যা শুধু শিশুদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসা নয়; বিদ্যালয়ে এসে তারা আসলে কী শিখছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
প্রাথমিক শিক্ষায় তাই প্রয়োজন নতুন করে ভাবার। প্রথম বিপ্লবটি হওয়া উচিত সাক্ষরতা, গণনাদক্ষতা, কৌতূহল ও শিক্ষার মানে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসমৃদ্ধ শ্রেণিকক্ষে মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং নম্বরের প্রতিযোগিতা থেকে শিশুদের বের করে এনে প্রশ্ন করতে, বুঝতে, অনুসন্ধান করতে এবং আবিষ্কার করতে শেখাতে হবে।
মাধ্যমিক পর্যায়েও পরীক্ষাকেন্দ্রিক দৌড় কমানো জরুরি। Critical thinking, communication, technology, financial literacy, creativity এবং real-life problem solving—এসব দক্ষতাকে শিক্ষার কেন্দ্রে আনতে হবে। শিক্ষা যেন কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউটরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের প্রয়োজন স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল ডিগ্রি বিতরণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে internship, entrepreneurship ও leadership-এর সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হতে হবে জ্ঞান, দক্ষতা ও বাস্তব সমস্যার সমাধান তৈরির কেন্দ্র। কতজন গ্র্যাজুয়েট বের হলো—শুধু সেই সংখ্যা দিয়ে উচ্চশিক্ষার সাফল্য মাপা যথেষ্ট নয়। বরং কত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হলো, কত সমস্যার সমাধান হলো এবং দেশের অর্থনীতি ও সমাজে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এল—সেদিকেও নজর দিতে হবে।
শিক্ষায় সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ২ শতাংশে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে শুধু নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ করলেই শিক্ষা নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন দক্ষ ও নিবেদিত শিক্ষক, মানসম্মত পাঠদান, গবেষণা, জবাবদিহি এবং চিন্তার স্বাধীনতায় বিনিয়োগ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
يُؤْتِى ٱلْحِكْمَةَ مَن يَشَآءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ ٱلْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِىَ خَيْرًۭا كَثِيرًۭا ۗ
“তিনি যাকে ইচ্ছা প্রজ্ঞা দান করেন এবং যাকে প্রজ্ঞা দান করা হয়, সে নিশ্চয়ই প্রচুর কল্যাণ লাভ করে।”
—সূরা আল-বাকারা: ২৬৯
শিক্ষা দিবসে তাই বার্তাটি হওয়া উচিত পরিষ্কার—শিক্ষাকে আর দশটি প্রকল্পের মতো না দেখে জাতি নির্মাণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
কারণ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর ভবিষ্যৎ শুধু একটি অশিক্ষিত প্রজন্ম নয়; বরং এমন একটি সার্টিফিকেটধারী প্রজন্ম, যারা চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে ও বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম।
যে শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে, কৌতূহলকে হত্যা করে এবং মেধাকে কেবল নম্বরের মধ্যে বন্দি করে ফেলে, সেই ব্যবস্থার সংস্কার কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সময়ের জরুরি জাতীয় প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে—
ইট-বালু-সিমেন্টে প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়, শিক্ষা নয়।
সিলেবাসে অধ্যায় যোগ হয়, চিন্তা নয়।
সার্টিফিকেটে ডিগ্রি লেখা হয়, মেধা নয়।
অতএব, শিক্ষায় আর কেবল cosmetic change নয়—প্রয়োজন structural shift। শিক্ষার লক্ষ্য হতে হবে শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়; বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যারা জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারে, সত্যকে অনুসন্ধান করতে পারে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারে এবং দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
১৭ সেপ্টেম্বরের শিক্ষা দিবস আমাদের সেই মৌলিক প্রশ্নটিই নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়—আমরা কি শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়াচ্ছি, নাকি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত একটি প্রজন্ম গড়ে তুলছি?
* তথ্য ও ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত।