কওমী মাদরাসাকে কেন্দ্র করে চলমান অপপ্রচার, অপতথ্য প্রচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা মোকাবিলায় কওমী মাদরাসার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ আল-হাইআতুল উলইয়া এবং দেশের বৃহত্তম কওমী শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর কাছে ১২ দফা সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা পেশ করেছে ‘সচেতন আলেম সমাজ’।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আল-হাইআতুল উলইয়ার প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিদলটি আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রস্তাবনা হস্তান্তর করে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, বর্তমানে কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো তথ্যগত শূন্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পাদিত ভিডিওর মাধ্যমে ডিজিটাল মব সৃষ্টি এবং একপেশে মিডিয়া ট্রায়াল। কোনো ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট মাদরাসার পক্ষ থেকে দ্রুত ও প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য না আসায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করার প্রবণতা তৈরি হয়।
প্রস্তাবনা উপস্থাপনের সময় সচেতন আলেম সমাজের প্রতিনিধিরা জানান, মাদরাসাগুলোর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অপপ্রচারের কার্যকর মোকাবিলায় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
এ সময় বেফাকের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, মাদরাসাকে ঘিরে সম্প্রতি যেসব অভিযোগ ও ঘটনা সামনে এসেছে, তার অনেকগুলোই অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন। এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
তবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, কোনো মাদরাসায় বাস্তবিক অর্থে অপরাধ, অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা নৈতিক স্খলনের ঘটনা ঘটলে তা কোনোভাবেই গোপন বা ধামাচাপা দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মুষ্টিমেয় ব্যক্তির অপরাধের দায় যেন পুরো কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর না পড়ে, সে জন্য অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অপরদিকে আল-হাইআতুল উলইয়ার অফিস ব্যবস্থাপক মু. অছিউর রহমান জানান, পরিস্থিতির উন্নয়নে জেলা সফরসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু সময় প্রয়োজন হবে।
সচেতন আলেম সমাজের ১২ দফা প্রস্তাব
১. সকল শিক্ষকের জন্য কেন্দ্রীয় নিবন্ধন ও সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার (ডাটাবেজ) প্রতিষ্ঠা।
২. শিক্ষক নিয়োগে শিক্ষাগত, চারিত্রিক ও পেশাগত যোগ্যতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন।
৩. গুরুতর অপরাধ বা শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে দোষী শিক্ষকদের কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকলিস্ট এবং বোর্ডগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা।
৪. মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, নিবন্ধন, অনুমোদন ও নির্দিষ্ট মেয়াদে নবায়ন ব্যবস্থা চালু।
৫. একাডেমিক, প্রশাসনিক, আবাসিক ও নৈতিক কার্যক্রমের নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থা জোরদার।
৬. শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য শিশু সুরক্ষা, নৈতিকতা ও আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ।
৭. শিক্ষা উন্নয়ন, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে সহায়ক কেন্দ্রীয় রিসার্চ সেন্টার প্রতিষ্ঠা।
৮. সব মাদরাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
৯. অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে মনিটরিং সেল গঠন।
১০. মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের শিকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের আইনি সহায়তা প্রদান।
১১. শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য ২৪ ঘণ্টার কেন্দ্রীয় হেল্পলাইন চালু।
১২. মহিলা ও হিফজ মাদরাসার জন্য শিক্ষা, আবাসন, নিরাপত্তা, শিক্ষক নিয়োগ, তত্ত্বাবধান ও শিশু সুরক্ষাসহ পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।
প্রস্তাবনা প্রদানকারী প্রতিনিধিদলে ছিলেন মুফতি মহিউদ্দীন ফারুকী, মাওলানা রুহুল আমীন সাদী, মুফতি আবু মুহাম্মাদ রাহমানী, মুফতি আদনান মাসউদ, মাওলানা শফিকুল ইসলাম ইমদাদী রাহাত, মুফতি আ ফ ম আকরাম হুসাইন, মুফতি আফফান বিন শরফুদ্দীন, মুফতি আবদুল্লাহ তামিম, মাওলানা রাকিবুল ইসলাম রইস এবং মাওলানা আবদুল গাফফার।
প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেন, এসব সংস্কারমূলক পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে কওমী মাদরাসাগুলোর জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং পরিকল্পিত অপপ্রচার মোকাবিলা করা আরও সহজ হবে।
* তথ্য ও ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত।