ময়মনসিংহে ‘মাদরাসায় উচ্চ শিক্ষা : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা-এর অধীনে ময়মনসিংহ বিভাগের ফাজিল ও কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও গভর্নিং বডির সদস্যগণের অংশগ্রহণে টাইন হল মোড়ে তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে ওই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। কামিল (স্নাতকোত্তর) শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র এর আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান। সভাপতিত্ব করেন, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ ছিদ্দিকী। প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ছিলেন সাবেক সচিব ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার শাহীনুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদরাসা পরিদর্শক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী।

প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে মাদরাসাগুলোর বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বলেন, মাদরাসাগুলোর সমস্যা শুনতে শুনতে কোন কাজ করতে পারছি না। বহু সমস্যা। ফাজিল কামিলে শিক্ষার্থী কম। অধিকাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণি কক্ষে উপস্থিত থাকে না। আরবি ভাষায় তারা দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ইংরেজিতেও দুর্বল। সহীহভাবে কুরআন তেলাওয়াতেও রয়েছে তাদের সমস্যা। নীতি নৈতিকতা ও আত্মশুদ্ধিরও অভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সমন্বয়তায় দুর্বলতা আছে। ইসলামি শিক্ষার এসব দৈন্যদশার কারণে অনেক শিক্ষার্থী দাখিল পাস করার পর আলিমে ভর্তি না হয়ে কলেজে গিয়ে ভর্তি হচ্ছে। তিনি বলেন, তাদেরকে মাদরাসায় ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। মাদরাসা শিক্ষায় এখন বহু সম্ভাবনা রয়েছে। আলিয়া মাদরাসায় পড়ে বহু শিক্ষার্থী এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাচ্ছে। বিসিএস করতে পারছে। সরকারি চাকরি পাচ্ছে। তাদের জন্য বিদেশে কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। কাজেই সম্ভাবনা অনেক। তিনি বলেন, এজন্য তাদেরকে যোগ্য, দক্ষ ও কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে হবে। কারিগরি শিক্ষাসহ ৬টি বিদেশি ভাষা শিখাতে হবে, রপ্ত করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি আলিয়া মাদরাসা গড়ে তুলতে চাই, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা আরবি, ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনসহ আমল আখলাক ও সার্বিকভাবে উপযুক্ত হয়ে দেশ ও সমাজে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। পরকালে নাজাতের উসীলা হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের আধুনিক, কর্মমুখী ও গণমুখী শিক্ষার্থী হিসেবে গড়তে চাই। এ রকম উপযুক্ত করে গড়তে পারলে আমাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার শাহীনুল ইসলাম প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি প্রবন্ধে এসব বিষয়ের উল্লেখ করে বলেন, মাদরাসায় পড়ে এখন বিসিএসে অংশ গ্রহণ করা যাচ্ছে। সরকারি চাকরিতে সুযোগ, প্রশাসনে, ব্যাংকে এ রকম বহু প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে আরবি জানা লোকদের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আরবি দেশগুলোতে বহু চাহিদা, বহু ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এসব সুবিধা গ্রহণ করাতে হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাবতে হবে। মাদরাসায় শিক্ষার্থী কেন কমে যাচ্ছে তা খুঁজে বের করে এর সমাধান দিতে হবে।

এ ব্যাপারে প্রধান অতিথি প্রফেসর ড. আবু জাফর খান গভর্নিং বডির সভাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, আপনারা কমিটির সদস্যদের নিয়ে মাসে অন্ততঃ একবার বসেন। ৪ মাস পর পর ৩ দিনের একটি করে কর্মশালার ব্যবস্থা করেন। বিশেষায়িত শিক্ষক এনে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেন। ছুটি ব্যতীত কোন শিক্ষক যাতে না যেতে পারেন সে বিষয়ে খেয়াল রাখুন। দেখুন, কেন শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে? আপনারা চেষ্টা করলে, নিজেরা কিছু আর্থিক সহযোগিতা করলে, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে পারলে তাদেরকে ধরে রাখা শুধু সম্ভব নয় বরং শিক্ষার্থী আরও বাড়বে। আর এটা আপনাদের দ্বারাই সম্ভব। তিনি বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়েও বসতে চাই। খুব শীঘ্রই তাদের নিয়ে এ রকম সেমিনার করে শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনে তা সমাধানের মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধান অতিথি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান। এজন্য তিনি যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সকলকে প্রস্তুত থাকার জন্য উৎসাহিত করেন।

এসময় ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার আখলাকুল আম্বিয়ার উপস্থাপনায় আরও বক্তব্য রাখেন, কাতলাসেন কাদেরিয়া আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা দেলোয়ার হোসেন আজিজী, নেত্রকোনার এন. আকন্দ কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল বাতেন, শ্রীবর্দী ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল হালিম মিয়া, জামালপুর কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ, মোমেনশাহী ডিএস কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. মাওলানা ইদ্রিস খান, ঈশ্বরগঞ্জের পীতাম্বর পাড়া কামিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এড. আনাস মিয়া, ফুলপুর কাতুলী এমদাদীয়া ফাজিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মহিবুল হক টুটুল, মুন্সিরহাট ফাজিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রমুখ।

এড. আনাস প্রাইমারি স্কুলের ন্যায় ইবতেদায়ী মাদরাসায় সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান। আরবিকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন। তাহলে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আরও বাড়বে। ফাজিল কামিল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পার্ট টাইম কর্মের ব্যবস্থা দাবি করে তিনি মাদরাসার কার্যকরী কমিটিতে রাজনৈতিক প্রাধান্য না দিয়ে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের কমিটিতে সভাপতি করার প্রস্তাব করেন। কাতুলী এমদাদীয়া ফাজিল মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মহিবুল হক টুটুল বলেন, মাদরাসায় সম্ভাবনাও অনেক চ্যালেঞ্জও অনেক। আদর্শ জাতি গঠনে মাদরাসা শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আমাদের শিক্ষার্থীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হলে আরও আধুনিক কিছু শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুর রহমান ফুলপুর উপজেলায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন।আমরা দুজনই প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এ ব্যাপারে আপনাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
মোমেনশাহী ডিএস কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. মাওলানা ইদ্রিস খান বলেন, মাদরাসা শিক্ষায় সম্ভাবনা আছে। এটা লাভ করার জন্য যেসব অসম্ভব আছে সেগুলোকে সম্ভব করতে হবে। ফাজিল কামিল শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরকে কিভাবে শ্রেণি কক্ষে উপস্থিত করা যায়, কিভাবে তারা দেশে বিদেশে লাভবান হতে পারে সে বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে।

এর আগে বিশেষ অতিথি ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদরাসা পরিদর্শক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, আজকের প্রধান অতিথি মাদরাসার ছাত্র। তিনি আমাদেরই একজন মানুষ। সব গ্রুপ মিলিয়ে কামিলে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছেন। যে কারণে আপনাদের আমাদের জন্য উনার দরদটা একটু বেশি। আপনারা হীনমন্যতায় ভুগেন কেন? আপনাদের চেয়ে অন্যরা কি বেশি ভালো আছে? কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, আপনারাই শ্রেষ্ঠ। কাজেই এটাকে চাকরি হিসেবে নয় বরং ইবাদত হিসেবে মূল্যায়ন করে মাদরাসা শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আত্মনিয়োগ করুন। এরপর সভাপতি প্রো-ভিসি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। সবশেষে ফুলপুর কাজিয়াকান্দা কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদীন মুনাজাত পরিচালনা করেন।

সমাপনী বক্তব্যে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আবু জাফর খান গভর্নিং বডির সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, নিয়মিত সভা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষার্থীদের সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে মাদরাসায় শিক্ষার্থী ধরে রাখা এবং নতুন শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। তিনি এ ব্যাপারে অধ্যক্ষ উপাধ্যক্ষসহ কার্যকরী কমিটি সভাপতি ও সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করে শিগগিরই শিক্ষার্থীদের নিয়ে পৃথক সেমিনার আয়োজনেরও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।