ময়মনসিংহের ফুলপুরে মাত্র ১৩৫ দিনে পবিত্র কুরআন শরীফের হিফজ সম্পন্ন করে অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে বিরল মেধাবী শিশু শিক্ষার্থী সাজিদুর রহমান সাজিদ (৯)। তার এ অসাধারণ অর্জনে পরিবার, শিক্ষক ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষসহ স্থানীয়দের মাঝে আনন্দের জোয়ার বইছে। বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হচ্ছে।
সাজিদ উপজেলার রহিমগঞ্জ ইউনিয়নের ধন্তা গ্রামের মো. আনিসুর রহমান ও রুনা আক্তারের ছোট ছেলে। তার দাদা আবুল ফজল কবির এবং নানা আকাম উদ্দিন। সাজিদের বড় ভাই আরিফুল ইসলাম রাফিও একই মাদরাসা থেকে হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেছেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আমুয়াকান্দা বাজার বড় মসজিদ আদর্শ হাফিজিয়া মাদরাসার হিফজখানার প্রধান হাফেজ মুহিব্বুল্লাহর কাছে হিফজের সর্বশেষ সবক শুনিয়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের হিফজ সম্পন্ন করে সাজিদুর রহমান।
জানা যায়, গত ১ মে ২০২৬ সে হিফজের সবক নেয়। এরপর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ হিফজ সম্পন্ন করে। এর মধ্যে ২৫ দিন সে অসুস্থ ছিল। তার উস্তাদরা জানান, সাজিদ মাত্র ১৩৫ দিনের মধ্যেই পুরো কুরআন শরীফ হিফজ সম্পন্ন করেছে। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ২৫ দিন অসুস্থ থাকায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটলেও তার অদম্য মনোবল ও অসাধারণ মেধার কারণে সে দমে যায়নি; নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হিফজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।
সাজিদের এ অসাধারণ কৃতিত্বে আনন্দিত হয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তার জন্য বিশেষ সংবর্ধনার আয়োজন করে। পরে তাকে ও তার গর্বিত পিতা ফার্মাসিস্ট মো. আনিসুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুলের মালা গলায় পরিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পিতা-পুত্রের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, আমুয়াকান্দা বাজার জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মেরাজুল হক। এছাড়া পয়ারী আলিম মাদরাসার সিনিয়র উস্তাদ মাওলানা আব্দুর রহমান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আলহাজ্ব লুৎফুর রহমান, হাফেজ মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ নোমান, এক্সিলেন্ট স্কুল অ্যান্ড মাদরাসার পরিচালক ও সাংবাদিক মোঃ আব্দুল মান্নান, আমুয়াকান্দা বড় মসজিদ মাদরাসার মুহতামিম হাফেজ মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফকির, হিফজখানার প্রধান হাফেজ মুহিব্বুল্লাহসহ মাদরাসার শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
উপস্থিত আলেম-উলামা ও শিক্ষকবৃন্দ সাজিদুর রহমানের অসাধারণ মেধা, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তারা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষায় উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।

জানা যায়, হিফজ শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার আগে সাজিদ তার গ্রামের বাড়ির পাশে অবস্থিত ‘মাদরাসা উম্মাহাতুল মুসলিম বালক-বালিকা বাংলাদেশ’-এর নার্সারি শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হাফেজ মাওলানা ইরশাদুল্লাহ শরীফ জানান, ”ছোটবেলা থেকেই সাজিদ অত্যন্ত মেধাবী, মনোযোগী ও নম্র-ভদ্র স্বভাবের ছিল। সবসময়ই সে ভালো ফল করত এবং বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করত। ঝড়-বৃষ্টিতেও সে কখনো ক্লাস নাগাহ করত না। পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল অসাধারণ।”
পরবর্তীতে আমুয়াকান্দা বাজার বড় মসজিদ আদর্শ হাফিজিয়া মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পরও সে তার অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখতে থাকে। যেখানে অন্য শিক্ষার্থীরা সাধারণত সবক কমিয়ে নিত, সেখানে সাজিদ প্রায়ই উস্তাদের কাছে সবক বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করত। কখনো ১০ পৃষ্ঠা, আবার কখনো ১২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সবক শুনিয়ে সবাইকে বিস্মিত করত বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তবে অসাধারণ এ মেধাবী হাফেজের পারিবারিক অবস্থা খুব একটা সচ্ছল নয়। তার বাবা মো. আনিসুর রহমান ফুলপুর গোলচত্বর এলাকার শেরপুর রোড মোড়ে ‘মেডিসিন সেন্টার’ নামে একটি ওষুধের দোকানে সাধারণ কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। পরিবারের উল্লেখযোগ্য কোনো জমিজমা নেই বললেই চলে। সাজিদরা দুই ভাইয়ের মধ্যে দুজনই পবিত্র কুরআনের হাফেজ হওয়ায় পরিবারটির জন্য এটি এক বিরল গৌরবের বিষয় হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, উত্তর ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী এই হিফজুল কুরআনের প্রতিষ্ঠান আমুয়াকান্দা বাজার বড় মসজিদ আদর্শ হাফিজিয়া মাদরাসাটি ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী এবং ২৪ জন উস্তাদ রয়েছেন। এর মধ্যে হিফজখানায় প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন ৮ জন শিক্ষক। এতে কিতাব বিভাগও খোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এটিকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত উন্নীত করা হবে বলে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে মো. আবু তালেব এবং সেক্রেটারি হিসেবে মো. শরীফ কমিশনার দায়িত্ব পালন করছেন। মাদরাসাটিতে কিন্ডারগার্টেন সেকশনও চালু রয়েছে। বাংলা, ইংরেজি ও আরবি শিক্ষার সমন্বয়ে আধুনিক সাবজেক্ট পাঠদানের পাশাপাশি পবিত্র কুরআন হিফজের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মাত্র ১৩৫ দিনে পবিত্র কুরআন শরীফ হিফজ সম্পন্ন করে সাজিদুর রহমান সাজিদ যে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে, তা শুধু তার পরিবার কিংবা মাদরাসার জন্যই নয়, পুরো ফুলপুরবাসীর জন্যও গর্বের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি বর্তমানে টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে। তার এ বিরল মেধা, অধ্যবসায় ও কুরআনের প্রতি ভালোবাসা ভবিষ্যতে তাকে আরও সাফল্যের পথে এগিয়ে নেবে, দেশে বিদেশে আরও উন্নত প্রতিষ্ঠানে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে ইলমে দীনের উপর বিশেষ অবদান রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।