লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলায় দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে মিথ্যা, সাজানো ও হয়রানিমূলক দাবি করে তা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন সাংবাদিকেরা। কর্মসূচি শেষে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সার্বিক সহযোগিতারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সামনে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুর জেলা ও বিভিন্ন উপজেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মামলার শিকার দুই সাংবাদিক হলেন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার রায়পুর প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং দৈনিক সবুজ বিপ্লবের সাংবাদিক মিজানুর রহমান।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের জেলা কমিটির সভাপতি একেএম মাহামুদ রিয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আবু মোহাম্মদ মনজুরী আলা। এতে বিভিন্ন প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা অংশ নেন।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, যথাযথ তদন্ত ও তথ্যপ্রমাণ যাচাই ছাড়াই দুই সাংবাদিককে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি এবং হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানান তাঁরা।

বক্তারা বলেন, সাংবাদিকেরা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরে জনস্বার্থে কাজ করেন। অথচ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁদের মিথ্যা মামলা, হুমকি ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক মো. খায়রুল আলম রফিক, সংগঠনটির পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) মোহাম্মদ আলী আবির, দৈনিক নতুন পথের সম্পাদক ও আনন্দ টেলিভিশনের লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিনিধি এবিএম সাগর এবং দেশের সংবাদের সম্পাদক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম হাওলাদারসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে তাঁদের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একজন সাংবাদিক যখন সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেন, তখন তাঁকে হয়রানি না করে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের অভিযোগ উদ্বেগজনক। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাঁদের মামলা থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দায়েরের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

খায়রুল আলম রফিক বলেন, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ কোনো নিরপরাধ সাংবাদিকের ওপর অন্যায়, নির্যাতন কিংবা হয়রানি মেনে নেবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সংগঠনটি সব সময় সোচ্চার থাকবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ না হলে প্রয়োজনে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি গড়ে তোলা হবে।
প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা প্রভাবশালী মহলের স্বার্থে কোনো নিরপরাধ সাংবাদিক যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সংগঠনটির পরিচালক (আইন ও মানবাধিকার) মোহাম্মদ আলী আবির বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করা হলে আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁর অধিকার রক্ষায় সংগঠনটি ভূমিকা রাখবে। সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
মানববন্ধন থেকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে মামলা থেকে অব্যাহতি, সাংবাদিক হয়রানি বন্ধ এবং স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস পুলিশের
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকেরা লক্ষ্মীপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে যান। সেখানে তাঁরা রায়পুরের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিষয়ে পুলিশের কাছে জানতে চান এবং অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
সাংবাদিকদের দাবি ও উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে মামলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা এবং সাংবাদিকদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সাংবাদিকেরা।
পুলিশের এ আশ্বাসকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সাংবাদিক নেতারা বলেন, শুধু আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের প্রবণতা বন্ধ না হলে এবং রায়পুরের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
তাঁরা বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না। অন্যায় ও হয়রানির বিরুদ্ধে দেশের সাংবাদিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।