মো. আব্দুল মান্নান :
আমার শ্বশুর বাড়ি এলাকায় (ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার নড়াইল ইউনিয়নের খরমা উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন) ১৯ ডিসেম্বর জামিয়া খাদিমুল জান্নাত মহিলা মাদরাসা ও খাদিমুল উলূম ক্বওমী মাদরাসায় সভা ছিল। দীর্ঘদিন ধরে শ্বশুর বাড়িতে রাতে থাকা হয় না। এবার সভায় তাদের জামাইকে সভাপতি রাখায় মধ্যরাতে দোয়া পর্যন্ত থাকতে হয়েছিল। পরে রাতে আর আসা সম্ভব হয়নি। সকালে যখন রওনা করছিলাম এসময় খরমা স্কুলের সামনে আমার শ্বশুর বাড়ির প্রতিবেশী আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সাথে দেখা হয়ে যায়। সালাম বিনিময়ের পর তিনি কান্নার স্বরে দোয়া চাচ্ছিলেন। বললাম, কি হয়েছে?
এরপর বহুদিন পরে জন্ম নেওয়া অনেক ভালবাসার ও আদরের একমাত্র কন্যা রাবেয়ার গলায় ক্যান্সারের করুণ বর্ণনা তুলে ধরেন এই মুরুব্বি। খুবই প্যাথেটিক ঘটনা। শুনে হৃদয় গলে যায়। ১৪ বছর বয়সী রাবেয়ার যৌবনকাল কেবল শুরু হয়েছিল। ফুটফুটে চেহারা। এসময় মরণব্যাধি ক্যানসার তাকে আক্রমণ করে বসে। বর্ণনা দিতে গিয়ে বাবা আব্দুর রাজ্জাক বার বার চোখের পানি মুছছিলেন। উনার চোখে পানি দেখে নিজেকেও সংবরণ করতে পারছিলাম না।
রাবেয়া খরমা বি কে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। কিছু দিন আগে হালুয়াঘাটে যখন বন্যা হয়েছিল তখন রাবেয়ার গলায় সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমে তাকে ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ওখান থেকে তাকে ইন্ডিয়ায় রেফার করা হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে মেয়েকে ইন্ডিয়ায় নিতে পারেননি আব্দুর রাজ্জাক। তবে তার একটা টেস্ট ইন্ডিয়া থেকে করিয়ে আনা হয়েছিল। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেলে রেখেই কোনোমতে তার চিকিৎসা চলছিল। বাবা আব্দুর রাজ্জাক জানান, ‘প্রায় দুই মাস যাবৎ আমার স্ত্রী মেয়েডারে লইয়া ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পইড়া রইছে। অনেকের আত্মীয় স্বজনই ওইহানে রোগী দেখতে যায়। ফলফলাদি, খাবারদাবার নিয়া যায় কিন্তু আমার ত কেউ নাই। কেডা যাইবো? আমার এমন কেউ নাই যে, আমার মেয়েডার লাইগ্যা একদিন দুইলা ভাত লইয়া যাইবো। মেয়েডা আমার কি স্বাইস্থ্য আছিন! অহন হুহায়া আড্ডি বাইরইয়া ফরছে। হুজুর, আমার মেয়েডার লাইগ্যা এট্টু দোয়া করুইনযে।’
উনার করুণ কাহিনী শুনতে গিয়ে আমি কয়েকটি গাড়ি ছেড়ে দিয়েছিলাম। পরে শেষের দিকে অল্প ভিডিও করে Abdul Mannan নামে একটি ফেইসবুক পেজ আছে ওখানে শেয়ার করেছিলাম কিন্তু কেউ উনার সহযোগিতায় এসেছেন কি না, জানা নেই। তবে খরমা বি কে কে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষকরা সাড়ে ৩ হাজার টাকা ও স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বাররা কিছু দান করেছিলেন। যা খুবই সামান্য বলা চলে। আজ সকালে হঠাৎ মনে পড়লো রাবেয়ার কথা। ভাবলাম, হালুয়াঘাটের সমাজসেবা অফিসারকে ফোন দিব। যাতে রাবেয়ার পাশে দাঁড়ায়। পরে রাবেয়ার সর্বশেষ তথ্য নেওয়ার জন্য ফোন দেই খরমায়। এরই মাঝে আমার স্ত্রী জানালেন, রাবেয়া আর নেই। ২৫ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ৯টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আজ বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) সকাল ১১টায় খরমা মাদরাসার মসজিদ প্রাঙ্গণে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। রাবেয়ার জন্য সবাই দোয়া করবেন। ওর বাবার বাড়ি ভিটা ছাড়া আর কোন জায়গাজমি নেই। এ উপলক্ষে বেশ কিছু ঋণও উনার হয়েছে। পারলে তার ০১৪০৩৭৩৪০৯৮ নাম্বারে ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নেওয়ার প্রত্যাশা রইলো।
ছবি : রাবেয়ার বাবা।