মো. আব্দুল মান্নান
নেত্রকোণার পূর্বধলা জামিয়া ক্বাওমিয়া দারুল উলূম সেহলার মুহতামিম ও শায়খুল হাদীস শায়খে সেহলা আল্লামা আহমাদ হুসাইন বলেছেন, যে মনের গুনাহ খেদায়া মনডারে পরিষ্কার কইরালছে সে বেহেশতে যাইবোগা। সূরা শামসের ওয়া নাফসিও ওয়ামা সাওওয়াহা — দাসসাহা পর্যন্ত তিলাওয়াত করে তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা গুনাহ ছাড়নের কথা কইছে। যারা মনের গুনাডি পরিষ্কার কইরা মনডারে সাফ কইরালছে এই মানুষটা বেহেশতে যাইবোগা। যারা মনের গুনাহ সাফ করছে না, ধোঁকা খাইছে, অহংকার করছে, নিজেরে বড় মনে করছে, নিজেরে চিনছে না, আল্লাহরে চিনছে না সে ক্ষতির মধ্যে পইরা যাইবো।
তিনি বলেন, শরীয়ত দুই প্রকার। একটা অইলো শরীয়তে জাহেরা আরেকটা অইলো শরীয়তে বাতেনা। শরীয়তে জাহেরা অইলো- নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি যা দেহের সাথে সম্পর্কিত। আর শরীয়তে বাতেনা অইলো ঈমান। যা মনের সাথে সম্পর্কিত। ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়ার ১০৫তম বড়সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বয়ান করতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, অহংকার অইলো মনের গুনাহ। মান আরাফা নাফসাহু ফাক্বাদ আরাফা রব্বাহু। যে নিজেরে চিনছে সে আল্লাহরে চিনছে। এসময় কুত্তার প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, আচ্ছা, কুত্তারে সৃষ্টি করার আগে সে কি আছিন? কুত্তা কি তার দোষে কুত্তা অইছে? আল্লাহর ইচ্ছা অইছে তারে কুত্তা বানাইছে। আমাদের নিজেদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, আমারে আল্লাহ যে মানুষ বানাইছে এইডা কি আমার গুণে বানাইছে? বলেন যে, না। আল্লাহর ইচ্ছা অইছে বানাইছে। কাফেররে যে কাফেরের ঘরে জন্ম দিছে এইডা কি তার দোষে দিছে। আর আমারে যে ঈমানদারের ঘরে জন্ম দিছে, ঈমানদার বানাইয়া পাডাইছে, এইডা কি আমার গুণে দিছে? বলেন যে, না। আল্লাহর ইচ্ছা অইছে তাই বানাইছে।
তিনি আরও বলেন, আজকে আমি ভাবতাছি, আমি কুত্তার চেয়ে উত্তম। এই উত্তম কার দান? এইডা কি আমার কামাই? কুত্তা মরলে তার দোজখে যাওন লাগদো না। কিন্তু আমি যদি ঈমান ছাড়া মরি তাইলে আমার দোজখে যাওন লাগবোগা। তাইলে ভালা কেডা?
বহুত বুজুর্গানে দ্বীন গুনার কারণে বেঈমান অইয়া মরছে। আবার বহুত বেদীন ঈমান লইয়া মরছে। আচ্ছা, ইবলিস গুনাহ করছে কয়ডা? -একটা। লক্ষ লক্ষ বছর ইবাদত করার পরও একটা গুনার কারণে তার জাহান্নামে যাইতে অইবো। আদম (আ.)কে সে সম্মানের সিজদা করছে না। সে কইছে, আমি উত্তম। উত্তম তুই কি করে অইলে? উত্তম তরে বানাইছে কেডা? সে কইছে, আমি আগুনের তৈরি। আগুন কি তুই বানাইছছ? (আল্লাহ বলেন) এর জন্য অহংকার করলে আমি করতে পারি। যেহেতু আমি আগুন বানাইছি। এখানে তোর অহংকারের কি আছে? পরে সে (ইবলিস) আর উত্তর করে নাই। তার রোগডা কি ছিল, ভাই? — অহংকার। তুমি যে উত্তম এ নিয়ামতটা কার? ধনী, ইলেম এগুলো কার দান? গরিব কে বানাইছে? গরিব অইয়া যদি ঈমান লইয়া মরতে পারে তাইলে সে উত্তম। অন্ধ অইয়াও যদি কেউ বেহেশতে জায়গা, আর যদি চোখওয়ালা অইয়াও না যাইতে পারি তাইলে ভালা কেডা? এরকম আরও বহু প্রশ্ন তিনি শ্রোতাদের প্রতি ছুড়ে দিয়েছেন। শ্রোতাদের বিবেকের কাছে এসব প্রশ্ন তিনি রেখেছেন।
তরিকা বুঝাতে গিয়ে শায়খে সেহলা বলেন, তরিকত অইলো আল্লাহকে পাওয়ার রাস্তা। ভণ্ডরা মনে করে আলেমরা জানে শরীয়ত আর পীরেরা জানে মারফত। বিষয়টি বুঝাতে গিয়ে তিনি তার একটি বাস্তব ঘটনা বয়ান করেন। তিনি বলেন, আমার এক মামু ছিল। বহুদিন পরে তার লগে দেহা। জিজ্ঞেস করলাম যে, মামু, কই থাহ? কয়, বাবার এইনো থাহি। বললাম, মামু, নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত পড়? কয়, না। যা পড়ে বাবাই পড়ে। এরপর তিনি বলেন, মামু, বয়স তো কম অইছে না! এডি ছাড় অহন। ছাইড়া নামাজডা ধর। মামু কয়, তুমি এডি বুঝদানা। আমরা মারফত। তিনি বলেন, মামু, তোমরার এইডা মারফত না, মরার পথ। যে মারফতে কুরআন নাই, হাদীস নাই, যার মধ্যে নামাজ নাই এডি মারফত না বরং মরার পথ।
তিনি বলেন, এজন্য আমরাও দায়ী। আমরা তাদেরকে মারিফাত, হাকীকত চিনাই না। আল্লাহকে চিনার নাম মারিফত আর মনকে গুনাহ থেকে পরিষ্কার করার নাম তরীকত। এছাড়া যারা নামাজ পড়ে না তারা তো প্রকাশ্য গোমরাহিতে আছেই কিন্তু যারা নামাজ পড়েন তাদের বিষয়ে তিনি বলেন, মাইনষের সামনে আমরা নামাজ সুন্দর কইরা পড়ি। আর এলহা এলহা পড়লে তাড়াতাড়ি পইড়ালাই। যারা এরকম করেন তাদের প্রতি ইশারা করে তিনি বলেন, এডি কারে দেহাইবার লাইগ্যা পড়ছ? সবশেষে সেহলার পীর শায়খুল হাদীস আল্লামা আহমাদ হুসাইন কেঁদে দিয়ে সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন যাতে ঈমানডা লইয়া মরতারি।