মোঃ আব্দুল মান্নান :
মেরে রক্তাক্ত করে সংবাদ সম্মেলনে ‘আমি যেটা দেখেছি, তার একজন কর্মী পাকঘরে মুরগী জবাই করে নিজের গায়ে লাগিয়ে ফেইসবুকে ছেড়েছে। ভিডিওটা আপনারাও দেখবেন উনাকে তো রান্নাঘরে পাওয়া গেছে’ বলায় সংসদে বিচার চাইলেন ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনের এমপি মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ। আজ রবিবার (২৬ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ বিচার দাবি করেন।
এমপি মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ বলেন, মাননীয় স্পীকার, একটা কথা না বললেই নয়, পহেলা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল) সরকারি অনুষ্ঠানে যোগদান করতে আমি তারাকান্দা উপজেলা অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাকে এবং আমার নেতাকর্মীদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এরপর আমরা একটা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিলাম। সেখান থেকে ফেরার সময় আমাদের ১০-১৫ জন মানুষের উপর আক্রমণ করে রক্তাক্ত করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরে (প্রতিপক্ষ ময়মনসিংহ উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে) সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ‘আমি যেটা দেখেছি, তার একজন কর্মী পাকঘরে মুরগী জবাই করে নিজের গায়ে লাগিয়ে ফেইসবুকে ছেড়েছে। ভিডিওটা আপনারাও (সাংবাদিকরাও) দেখবেন উনাকে তো রান্নাঘরে পাওয়া গেছে’। এ ঘটনা বলার সময় সংসদে হঠাৎ তার কথা শোনা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল- তার মাইক বন্ধ হয়ে গেছে। এসময় স্পীকার বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. হাফিজ উদ্দিন বলেন, মাননীয় সদস্য, আপনি এক মিনিটের মধ্যে আপনার বক্তব্য শেষ করুন। পরে এমপি মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ দুই মিনিট চেয়ে নেন। এমপি বলেন, আমি তদন্ত পূর্বক সেটার একটা বিচার চাই। এরপর তিনি বলেন, মাননীয় স্পীকার, লম্বা কথা বলবো না। যেহেতু সময় কম। আমরা এখানে এসেছি দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য। এ দেশের মানুষ ও মানব কল্যাণের জন্য। আমি আপনার মাধ্যমে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সকল মন্ত্রীদের নিকট দুইটা প্রস্তাব রাখবো। এগুলো একটু বিবেচনা করা হলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সুন্দর হবে ও ভালো হবে বলে আশা রাখি। এক নম্বর হলো- বাংলাদেশের ক্বওমী সনদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে কিন্তু এর বাস্তবায়ন হয়নি। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলবো, এ সনদের বাস্তবায়ন করে প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, কলেজ ও আলিয়া মাদরাসায় তাদের শিক্ষকতার ব্যবস্থা করে দেন। তাহলে এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পরকালে নাজাত পাবে এমনকি দুনিয়ার খারাপি থেকেও বেঁচে থাকার রাস্তা পাবে, ইনশাআল্লাহ।
আর দ্বিতীয় প্রস্তাবটি হলো- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন। সেটি হলো ইমামদের বেতন ভাতা। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে ইমামকে বেতন দেওয়া শুরু করেছেন তিনি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের জন্য বেতন ভাতা চালু করা হোক। এর পাশাপাশি প্রত্যেকটা মসজিদে মক্তব চালু করা যাতে আমাদের দেশের প্রত্যেকটা নাগরিককে আদর্শবান করে গড়া যায়।
এর আগে এমপি মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহ সালাম দিয়ে বক্তব্য শুরু করে স্পীকারকে ধন্যবাদ জানান। তাকে এমপি নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হককে ধন্যবাদ জানান। মামুনুল হকের বাবা মরহুম শায়খুল হাদীস আল্লামা আযীযুল হককে স্মরণ করেন। ৭১-এর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করেন। ২০১৩ সনে শাপলা চত্বরে ও ২০২৪ সনে আন্দোলনকারীসহ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের তিনি স্মরণ করেন। মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মরহুম প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমাদের বিরোধী দলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই সনদের আইন বিষয়ে আমরা যে মারপ্যাঁচে আছি সেখান থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে আসবেন।
এরপর তিনি বলেন, মাননীয় স্পীকার, আমার সংসদীয় আসন ১৪৭, ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা)। আমার আসনের লোকজন বিগত ৫৪ বছর ধরে সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত। আমার ফুলপুর তারাকান্দার আইডিযুক্ত রাস্তাগুলোর মধ্যে মাত্র ২০% রাস্তা পাকা। এর মধ্যে ১০% অচলাবস্থা। এত অচলাবস্থা সারা বাংলাদেশের আর কোথাও মনে হয় নেই। আমি মাননীয় সড়কমন্ত্রী ও সেতু মন্ত্রীর নিকট অনুরোধ করবো, আপনি একটু দৃষ্টি দিবেন। এই মানুষগুলো আলেম হিসেবে ভোট দিয়ে আমাকে সংসদে পাঠিয়েছে। তারা আগেও ভোট দিয়েছিল কিন্তু কেউ তাদের কমিটমেন্ট রক্ষা করেনি। আমি সেটা রক্ষা করবো, আমার প্রতি এমন বিশ্বাস নিয়ে তারা আমাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। আমি মন্ত্রী মহোদয়ের প্রতি অনুরোধ করে বলবো- আমার প্রতি একটু বিবেচনা করবেন। আমার এলাকার অসহায় মানুষদের দিকে একটু বিবেচনা করবেন। তিনি বলেন, মাননীয় স্পীকার, আমার দুইটি থানায় দুইটি হাসপাতাল আছে। ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। এর মধ্যে একটি হাসপাতালে আউট ডোর আছে ইনডোর নেই। অন্যটিতে আউটডোর ইনডোর আছে। কিন্তু আশপাশের ৪-৫টি থানার রোগী এসে সেখানে ভীড় করে। আপনি যদি যান মাননীয় স্পীকার চোখে পানি চলে আসবে। রাস্তাঘাটে, বারান্দায় সব জায়গায় শত শত রোগী পড়ে আছে। কিন্তু তাদের খাবারের ব্যবস্থা নেই, ওষুধের ব্যবস্থা নেই, তাদের পরিপূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। মানুষ আসে। বুক বেধে বসে থাকে কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পায় না। আমি মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নিকট অনুরোধ করবো, উনার কাছে একটি ডিও দিয়েছি। আপনি আমার এই দুইটি হাসপাতালের দিকে একটু নজর রাখবেন।