সমগ্র সমাজ জুড়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো খাতভিত্তিক বৈচিত্র্যকরণ। বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো মূলত তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল, যা অর্থনীতিকে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মুখে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। সুতরাং, উদীয়মান এবং উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বৈচিত্র্য আনা অপরিহার্য। সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ঔষধশিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং ব্লু ইকোনমি। এই খাতগুলোতে কৌশলগত বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং দেশের রপ্তানি ভিত্তি প্রসারিত করতে পারে। বিনিয়োগে আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঢাকা এবং কয়েকটি প্রধান নগর কেন্দ্রে কেন্দ্রীভূত। ফলে, গ্রামীণ এবং প্রান্তিক অঞ্চলগুলো প্রায়শই পিছিয়ে থাকে। অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ, জেলা পর্যায়ে শিল্পায়নকে উৎসাহিত করা এবং গ্রামীণ অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করতে সাহায্য করতে পারে। এই ধরনের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করবে এবং অতিরিক্ত নগর অভিবাসন হ্রাস করবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই)-এর জন্য অর্থায়নের সুযোগ পাওয়া অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো জামানতের সহজলভ্যতা এবং কম ঝুঁকির কারণে বৃহৎ শিল্পগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেয়। ফলস্বরূপ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রায়শই ঋণ পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হন এবং উচ্চ সুদের হার, কঠোর জামানতের শর্ত এবং জটিল পদ্ধতির মুখোমুখি হন। এছাড়াও, খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতের প্রশাসনিক সমস্যাগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করে। একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরির জন্য এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা অপরিহার্য। একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বল্প সুদের ঋণ এবং জামানতবিহীন অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে এসএমই-এর জন্য সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও সম্পদের অপচয় কমাতে বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে হবে। তৃতীয়ত, একটি গতিশীল স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বৃহত্তর বিনিয়োগ প্রয়োজন। চতুর্থত, নির্দিষ্ট প্রণোদনা এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের মাধ্যমে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণকে উৎসাহিত করা উচিত। পঞ্চমত, বিকেন্দ্রীভূত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী স্থানীয় শাসনের মাধ্যমে আঞ্চলিক উন্নয়নকে জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে মূল্যবান শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। জার্মানির ‘মিটেলস্ট্যান্ড’ মডেল তার অর্থনৈতিক সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (এসএমই) স্থাপন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বৃহৎ কর্পোরেশন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে দ্রুত শিল্পায়ন অর্জন করেছে। চীনের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির পেছনে আংশিকভাবে গ্রামীণ শিল্পায়ন এবং কৌশলগত রাষ্ট্র-পরিচালিত বিনিয়োগ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই মডেলগুলোকে তার অনন্য আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অভিযোজিত করে বাংলাদেশ একটি বাস্তবসম্মত ও টেকসই বিনিয়োগ কৌশল তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, বাংলাদেশকে একটি সুসংহত ও সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হতে হবে। এই পরিকল্পিত ভবিষ্যতে, বৃহৎ প্রকল্পগুলো অপরিহার্য অবকাঠামো সরবরাহ করবে, এসএমইগুলো কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনকে চালিত করবে, প্রযুক্তি নতুন সুযোগের দ্বার উন্মোচন করবে এবং আঞ্চলিক বৈষম্য ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশল এই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পথ দেখায়। দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায় যে, টেকসই ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার জন্য দেশের বিনিয়োগ কাঠামোর সংস্কার অপরিহার্য। শুধুমাত্র মেগা প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি বহন করে, অন্যদিকে কেবলমাত্র ক্ষুদ্র উদ্যোগের ওপর নির্ভরতা একটি আধুনিক, বৃহৎ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাই, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বৈচিত্র্যময় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করা সময়ের দাবি। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, এই ধরনের কৌশল শুধু বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতিকেই ধরে রাখবে না, বরং দেশটিকে একটি স্থিতিস্থাপক, ন্যায়সঙ্গত এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করবে।
* লেখক : ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও সমাজ চিন্তক।
ইমেইল: mukhles1975@gmail.com
বি. দ্র. Balanced Investment Strategy শিরোনামে The New Nation পত্রিকায় আজ ৯ মে ২০২৬ মো. মুখলেসুর রহমান ভাইয়ের একটি ইংলিশ আর্টিকেল পাবলিশ হয়েছে। সেটি যারা ইংরেজি কম বুঝেন বা বুঝেন না তাদের জন্য অনুবাদ করে ‘দৈনিক বাংলাদেশ নিউজ’-এ প্রকাশ করা হলো।