মো. আব্দুল মান্নান :
দুই মেয়ে দুই হাসপাতালে ভর্তি। বড়টার বুধবারে আশা জেনারেল হাসপাতালে সিজারে ছেলে হয়েছিল। ৯ ঘন্টা থাকার পর ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে। আসরের পর জানাজাশেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মনে হয় বিষয়টি অনেকেই জানেন।
জানাজাশেষে আমরা সবাই শেরপুর রোডে বাসায় ফিরলাম। মাগরিবের নামাজ পড়তে মসজিদে গেলাম। নামাজ আদায় করে বড় মেয়েকে দেখতে আশা জেনারেল হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ওর আহাজারি সহ্য করার মত না। কাঁদতে কাঁদতে চোখগুলো ফোলে গেছে। জন্মের পর বাচ্চাকে এক ফোটা দুধ খাওয়াতে পারেনি। কোলে নিতে পারেনি। এ যন্ত্রণা শুধু একজন মা-ই ভালো বুঝবেন। ময়মনসিংহ থেকে কখন তার বাচ্চা আসবে কোলে নিবে, দুধ খাওয়াবে; এই অপেক্ষায় ছিল। পরে যখন লাশ এনে তার কোলে দেওয়া হলো তখন তার সকল স্বপ্ন ভেঙেচুরে খান খান যায়। তাকে আর কোনোভাবে বুঝানো যাচ্ছিল না। দাফনের জন্য লাশ দিতে চায় না। কয়েকজনে ধরে কোল থেকে জোর করে নেওয়া হয়েছিল। বলে যে, না, দিব না। আমার বাবাকে আমি দুধ খাওয়াবো। আমার বাবারে নিয়ে আমি ঘুমাবো। আমি তো এ সংবাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম না। আমি আমার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াবার জন্য অপেক্ষা করতেছিলাম।
এর আগে সকাল থেকে বার বার সে তার মাকে ফোন দিচ্ছিল। তার সন্তানের খবর নিচ্ছিল। অবস্থা জানার জন্য উদগ্রীব ছিল কিন্তু তার মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছিল শুধু।
এমন একটা পরিস্থিতি শেষ হতে না হতেই মাগরিবের পর বাসা থেকে ফোন আসে মেঝ মেয়ের পেটে প্রচণ্ড ব্যথা। অথচ পরদিন অর্থাৎ আজ বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) তার ফাযিল দ্বিতীয় বর্ষের চূড়ান্ত পর্ব পরীক্ষা। কিন্তু ব্যথা এত বেশি যে, সে সহ্য করতে পারতেছে না। অনেক কান্নাকাটি করতেছে। পরে দ্রুত তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে ভর্তি করা হয়। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ময়মনসিংহে রেফার করার কথা বলছিল। পরে একটু কমলে আর ময়মনসিংহে নেওয়া হয়নি। পরীক্ষা নীরিক্ষায় তার কিডনি সমস্যা ধরা পড়ে। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মেঝ মেয়েটি তার মা ও আমার গলা জড়িয়ে ধরে বলে, আব্বু, আমি আর বাঁচতাম না। আমারে মাফ কইরা দেও। আমার জন্য দোয়া কইরো। ওর হাত-পা ঠাণ্ডা বরফের মতো হয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আসলেই হয়তো বাঁচবে না। এমন পরিস্থিতি আমার জীবনে আর আসেনি; এই প্রথম। শুধু মেয়ে দুটি নয় তাদের জন্য তাদের মা, সাথে আমার শ্বাশুড়ি, ছেলে দুজন ও জামাইসহ পরিবারের প্রায় সবাই অঘুমা। বাড়িতে আমার মা এবং আত্মীয় স্বজন অনেকেই টেনশানে।
আলহামদুলিল্লাহ, এখন একটু ভালোর দিকে। স্যালাইন চলতেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে এ স্যালাইনটা শেষ হলে তাকে পরীক্ষার জন্য হলে নিয়ে যাব। সকালে স্যালাইন চলমান অবস্থায়ই পাতা উল্টিয়ে এক নজর দেখছিল আজকের পরীক্ষার কিতাবটি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলের পেরেশানি দূর করে দেওক। সকলের দোয়া কামনা করছি।