মো. আব্দুল মান্নান :
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুফাসসিরে কুরআন মাওলানা হাফিজুর রহমান ছিদ্দিকী, কুয়াকাটা হুজুর বলেছেন, ‘আল্লাহ হেদায়াতের রাস্তায় নিয়ে আসছে। কপালডা কি এখনো খুলেনি? এমন সুন্দর প্যান্ডেল! এখানে বসলে গুনাহ মাফ হয়। কিছু বদমাশ এসে মার্কেটে ঘুরে। বেলুন কিনে। প্লাস্টিকের মাছ কিনে। এটা কি ওয়াজের শান? ওয়াজ উপলক্ষে মার্কেট কেন? বড়জোর এখানে কিছু চায়ের বা রুটির দোকান থাকতে পারে। কিন্তু মার্কেট কেন? আবার সেই মার্কেটে বেলুনের দোকান কেন? খেলনার দোকান কেন? মার্কেট এমন হবে কেন যে, এখানে যুবতী মেয়েরা ঢুকবে, কবিরা গুনাহ হবে? মুনাজাতের পর বেলুন নিয়ে বাড়ি যায়। সে কি পাইছে, ভাই? তার মুনাজাতে বেলুন কবুল অইছে।’
শনিবার (৭ ডিসেম্বর) রাত পৌনে ১২টার দিকে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার ছনধরা ইউনিয়নে হাটপাগলা বায়তুল জান্নাত জামে মসজিদ কর্তৃক আয়োজিত ৫ম বাৎসরিক ইসলামী মহাসম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে বয়ান করতে গিয়ে তিনি একথা বলেন। শেরপুর রাবেয়া বসরী মহিলা মাদরাসার মুহতামিম পীরে কামিল হজরত মাওলানা আলহাজ্ব আজিজুল হকের সভাপতিত্বে ও হাটপাগলা গ্রামের কৃতি সন্তান বায়তুল জান্নাত জামে মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা খতিব হজরত মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সহসভাপতিত্বে ওই ইসলামী মহাসম্মেলনে প্রধান বক্তা মাওলানা হাফিজুর রহমান ছিদ্দিকী আরও বলেন, মরার আগে মারে বাবারে বা বউয়েরে বইল্যা যাইস মোবাইলডা কাফনের কাপড়ের মধ্যে দিয়ে দিতো। এই মজলিসে মোবাইল চালানো বেআদবি। তুমি তো নিজেরে ভাবতেছ বড় মস্তান। মোবাইল চালাইতেছ। আল্লাহ হেদায়াত দান করুক। এসময় তিনি মোবাইলের নানা অপকারিতা তুলে ধরেন। ‘মুনাজাতে বেলুন কবুল অইছে’ একথা শুনে কেউ কেউ হেসে দেন। এসময় ছিদ্দিকী বলেন, আপনারা হাসেন? লজ্জা শরম না থাকার কারণে হাসেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, যার হায়া বা লজ্জা নেই তার ঈমান নেই। লজ্জা না থাকার কারণে আপনি হাসেন। গভীরভাবে চিন্তা করলে আপনার কান্না আসতো যে, আমরা এত খারাপ কেমনে অইলাম? শুধু এখানে নয়, আমরা সারা বাংলাদেশে ঘুরি, সব জায়গায় এই হালাত। ওয়াজ মাহফিলের পাশে জাহান্নামের বাজার। মেয়েরা অবাধে ঘুরতেছে। যুবকরাও ঘুরতেছে। এই গুনাহের দায় কে নেবে? এসব বিষয়ে কেউ কথা বলে না। বললে বলবে বক্তা বাদ দাও। তবু আমাদের আকাম বাদ দেওয়া যাবে না। কপাল যদি পুইড়া যায় হাফিজুর রহমান কেন স্বয়ং রাসূল এসে যদি বয়ান করে তবু এদের কপালে কালেমা জোটে না। যে নবীকে এক নজর দেখলে জাহান্নাম হারাম। সেই নবীকে ১৩ বছর কাছে থেকে দেখছে, বয়ান শুনছে তবু কালেমা পড়েনি। কতবড় নিকৃষ্ট বেঈমান হলে কতবড় কপালপোড়া অইলে এরকম হতে পারে? অন্যদিকে, ২৭ বছরের এক যুবক খোলা তরবারি নিয়ে নবীকে জবাই করতে এসে নবীর চেহারা মুবারক দেখে ঈমান আনছে। জান্নাতী হয়ে গেছে। এর নাম কপাল। হাটপাগলায় বড়সভা হবে জেনে অনেকে আসছে ঠিকই কিন্তু কপাল খারাপ। এই সুন্দর বেহেশতের বাগানে ঢুকতে পারেনি। দোকানে ঘুরে আর তাজা তাজা কবিরা গুনাহ করে। মহিলা প্যান্ডেল তাওয়াফ করে। আরেকজন ঢুকছে ঠিকই, ঢোকার পরও তার কপালডাও বেশি ভাল না। মোবাইল হাতে নিয়ে কলবের দরজাটা বন্ধ করে বসে আছে। বাবারে এখানে আসতে কপাল লাগে। বসতে কপাল লাগে। শেষে মা-বাবার জন্য দোয়া করে বিদায় নিতেও কপাল লাগে। পাহাড় পরিমাণ গুনাহ মাথায় নিয়েও যদি বিনয়ের সাথে বান্দা বলে যে, আল্লাহ আমি ভুল করছি আর করব না। মাফ করে দাও। তাহলে আল্লাহ তায়ালা মাফ করে দেন।
দুনিয়ায় অন্যায় করলে আদালতে মামলা হয়। একই ব্যক্তির নামে চুরি, ডাকাতি, হত্যা, লুন্ঠন জুলুমের অভিযোগে মামলা হয়। ১০ অপরাধের জন্য ১০ মামলা। ১০ ধারায় ১০ রকমের শাস্তির আদেশ হয়। আদালতে হাজিরা দিতে হয়। কোন মামলায় জরিমানা হয়। কোন মামলায় জেল হয়। আবার কোনডার জন্য ফাঁসি হয়। কিন্তু আমার মাওলা এত দয়ালু যে, কত ধারায় তুমি গুনাহ করছ? জিনা করছ এক ধারার গুনাহ। চুরি করছ আরেক ধারার গুনাহ। তুমি মায়ের সাথে বেআদবি করেছ আরেক ধারার গুনাহ। আলেমের সাথে বেআদবি করেছ ভিন্ন ধারার গুনাহ। এরপরও মালিকের আদালতে গিয়ে হাজিরা দিতে হয় না। মামলার তারিখ পড়ে না। যদি হাজারো গুনাহ করে একবার বল, ওগো মোর আল্লাহ, তুমি আমারে মাফ করে দাও। আল্লাহ কয়, তারিখ নেই, ধারা নেই, কোন কিছুর প্রয়োজন নেই। যদি শুধু একটু শরমিন্দা হয়ে আমার কোন বান্দায় বলে যে, আল্লাহ! তুমি আমারে মাফ করে দাও। তাহলে সেকেন্ডের মধ্যে আমি মাওলা তার সব ধারার মামলাগুলো মাফ করে দেই।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, আমি সূর্য বানাইছি কিন্তু বলি না যে, এটা আমার সূর্য। আমি চন্দ্র বানাইছি কিন্তু বলি না যে, এটা আমার চন্দ্র। এভাবে আমি আসমান বানাইছি, জমিন বানাইছি, গাছ বানাইছি, মাছ বানাইছি আরও কত কিছু বানাইছি! কিন্তু বলি না যে, এটা আমার। এই সবগুলো আমি বানাইছি কিন্তু আমার না। এগুলো হলো আমার বান্দার। আর আমার বান্দা হলো আমার। উদাহরণ দিয়ে ছিদ্দিকী বলেন, আমার বাচ্চার জন্য আমি জামা বানাইছি। টুপি কিনে দিয়েছি। জুতা কিনে দিয়েছি। জামা পায়জামার জন্য কাপড় কিনেছি। টেইলারের মুজুরী দিয়েছি। আমার বন্ধু জিজ্ঞেস করে, হাফিজ ভাই, জামা কার? আমি বলি জামা আমার না। জামা হলো আমার বাচ্চার। আর বাচ্চা হলো আমার। এরকমভাবে আল্লাহ দুনিয়া বানাইছে বান্দার জন্য আর বান্দা বানাইছে আল্লাহর জন্য। দুনিয়া বান্দারে খুঁজবে আর বান্দায় আল্লাহকে খুঁজবে। অথচ এটা এখন উল্টো হয়ে গেছে। তুমি আমি দুনিয়া খুঁজি আর আল্লাহ আমাদেরকে খুঁজে। নামাজে দাঁড়িয়েও দুনিয়া দুনিয়া, ক্ষমতা ক্ষমতা। এভাবে যারা দুনিয়া খুঁজে তারা দুনিয়াও পায় না, আখেরাত তো পাবেই না।
বাবা, তোমাকে এমন কিছু করে যেতে হবে যা আখেরাতে গেলে পাইবা। মানুষ তোমার জন্য কাঁদবে। কিন্তু তুমি তা না করে এমন আকাম করছো এমন খারাপ চরিত্র নিয়ে মরছ যে, তুমি মরলে মানুষে বলবে যে, মরছে ভাল অইছে। মানুষ খুশি হবে। তোমার মা-বাবা কাঁদলেও মনে মনে খুশি অইবে। বলবে, ভাল অইছে। ওর নামে কদিন পর পর বিচার আসতো। ওর জন্য বাইরে মুখ দেখানো যেত না। তাই কানবে ঠিকই কিন্তু মনে মনে খুশি হবে।
যুবক, মনে কিছু নিও না। বুঝানোর জন্য বলতেছি। তুমি আজ বাসায় গিয়ে দরজাটা লাগিয়ে জুতাটা হাতে লইবা। লইয়া কপালে একটা বাড়ি দিবা আর নিজেরে নিজে বলবা, ‘তর কপাল এত খারাপ কেন? তর মত ছেলে স্কুলে পড়েও নামাজ পড়ে। তুই কেন পার না? তর মত যুবক কৃষি কাজ করে নামাজ পড়ে। তুই কেন পার না? তর মত যুবক সরকারি চাকরি করে, পুলিশে আর্মিতে চাকরি করেও নামাজ পড়ে কিন্তু তুই কেন পার না? ও পর্দার আড়ালের মা ও বোনেরা, আপনারাও নিজেদেরকে ফাতেমার মত, বিবি খাদিজার মত বিবি আছিয়ার মত নারী হতে চেষ্টা করবেন। প্রধান বক্তা বলেন, বাবারে তুমি যা ইচ্ছে তাই হও কিন্তু বেআদব হইও না। উলামায়ে কেরামের বদদোয়া নিয়ে মইরো না। আলেমদের বাড়ি নেই, গাড়ি নেই কিন্তু সবাই তাদের সম্মান করে, সবাই তাদের ভয় পায়। তুমি যার পিছনে পইরা দাঁড়ি কাটতেছ বাবা, যার পিছনে দৌড়ে নামাজ ছাড়তেছ, আলেমের সাথে বেআদবি করতেছ, যেসব আকাম করনেওয়ালাদের ভালবাসতেছ সে তো তোমার বন্ধু না। যে তোমারে ভালবাসে সেই তো তোমার আসল বন্ধু।
রাজনীতি সম্বন্ধে হাফিজুর রহমান ছিদ্দিকী বলেন, স্বার্থে আঘাত লাগলে দল থেকে তোমার নাম যে কাটবে না, একথা বলা যায় না। সোনার বাংলার রাজনীতি এখন এতটাই খারাপ যে, নাম না শুধু বরং কখনো কখনো কল্লাও কেটে দেয়। এখন সব ধান্দাবাজি আর চান্দাবাজির রাজনীতি। এগুলো ছেড়ে ইসলামের রাজনীতিতে আসতে হবে। আল্লাহর কুরআনের রাজনীতি ইসলামের রাজনীতি এমন রাজনীতি যে, মালিক আর গোলাম এক প্লেটে খাবে বৈষম্য হবে না।
এরে আল্লাহর বান্দা, তুমি যার পিছনে ঘুর চান্দাবাজ আর ধান্দাবাজ ছাড়া আর কিছু নয়। এই জাতিকে নিয়ে মাথা যতটুকু ঘামায়, চিন্তা করে তারা আলেম। আলেম উলামা ছাড়া কেউ এ জাতিকে নিয়ে ভাবে না। তাহলে ওরা কি করে? ওরা নিজের চেয়ার নিয়ে ভাবে। নিজের ঘর কেমনে আরও বড় করবে সেটা নিয়ে ভাবে। আর আলেম উলামারা হলো এমন যে, তাদের ইমামতি যাক আর থাক, ওয়াজ মাহফিল হোক আর না হোক, জালেমদের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার থাকে। জালেমদের জুলুম করার সুযোগ আর দেওয়া হবে না। এজন্যই তো ছাত্রজনতার বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে উলামায়ে কেরাম জীবনকে বাজি রেখে মাঠে নামছে তো সফলতা আসছে। কিন্তু এই আলেমরা কখনো বলে না যে, উপদেষ্টারা নেমে যাও, আলেমদের বসতে দাও। হুজুররা ক্ষমতা নিয়ে টেনশান করে না। তবে খবরদার, জুলুম করলে আবারও আন্দোলন হবে।
তিনি বলেন, এজন্য চরমোনাইর পীর বলেছেন যে, মুসলমান নাকে তেল দিয়ে ঘুমাইও না। মুসলমান তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবে সেদিন ইসলামের স্বাধীন হবে যেদিন। মুসলমান ঘুমাবে ওইদিন এদেশের মসজিদ মাদরাসার কমিটিতে ঘুষখোর ও সুদখোররা থাকবে না যেদিন। তিনি বলেন, এদের হাতে মসজিদ মাদরাসার দায়িত্ব দিয়ে লাভ নেই। শিয়ালের হাতে মুরগী দিলে যা হয় এদের হাতে মসজিদ মাদরাসার চাবি দিলে তাই হবে। এজন্য আর নয়। এখন থেকে মসজিদ মাদরাসা চলবে উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে।
যুবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ওরে যুবক, কত মনের জ্বাল মিটিয়ে আর গুনাহ করবে? আর কত আড্ডা দিলে তর মনের শখ মিটবে? আর কত নামাজ ছাড়লে তর শান্তি লাগবে, বল। জীবনে কম দাঁড়ি কাটনি, কম নামাজ ছাড়নি। এখনও কি ফিরবে না? পাও ধরলে ফিরবেনি, বল। আমি আইসা তর পাও ধরবো। আর না হলে বল যে, ভাই তোমাদের লাইন ঠিক নেই। কুরআন থেকে একটা ভুল বের করে দেখা। তাহলে তরও আমল করতে হবে না, আমরাও করবো না। প্যান্ট শার্ট পইরা নাচ-গানে নাইম্যা পড়ব। কারণ, আমরা যত পাওয়ার দেখাই সব পাওয়ারের ফাউন্ডেশন হলো আমাদের কুরআন। আল্লাহ সত্য, নবী সত্য, কবর সত্য, হাশর, মিজান, পুলসিরাত সত্য, জান্নাত জাহান্নাম সত্য। এগুলো সবই বলেছে কুরআন। কুরআনে যদি ভুল থাকে তাহলে সবই ভুল। এজন্য চ্যালেঞ্জ তো আল্লাহই দিয়েছেন। কিন্তু কই? এ পর্যন্ত পারেনি একটি ভুল ধরতে। তুমিও সারা জীবনে পারবে না। অতএব, তওবা করে নাও। ধান্ধাবাজি চান্দাবাজির পিছনে যেও না। উলামায়ে কেরামের সাথে থাক। উলামায়ে কেরামের দোয়া নিয়ে চলো।
এসময় আরও বয়ান করেন, মুফতী ফয়জুল্লাহ নোমানী, মাওলানা গাজী আল মাহমুদ, মুফতী সানাউল্লাহ বিন ইসমাইল, মাওলানা ক্বারী আবু হানিফ শিকদার, মুফতী আব্দুল্লাহ আনসারী, মুফতী হুমায়ুন কবীর মুক্তারী, হাফেজ মাওলানা ক্বারী আব্দুল্লাহ আল ফাহাদ, হাফেজ শাহজাহান সিরাজী, মাওলানা আব্দুস সামাদ, মাওলানা আকরাম হোসেন, মাওলানা আমজাদ হোসেন লায়ালপুরী, মৌলভী নজরুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল লতিফ, মাওলানা আবু রায়হান, বিশেষ অতিথি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান সরকার (হবি) প্রমুখ।