মো. আব্দুল মান্নান :
দাঁড়ি নেই, টুপি নেই, বেনামাজি, বেআলেম, টাখনুর নিচে প্যান্ট পড়ুয়া ব্যক্তি দাওরা মাদরাসার সভাপতি নির্বাচিত হন কোন গুণে? শত শত সভার প্রধান অতিথি তারা যাদের কাছে নবীর সুন্নাত লাঞ্ছিত! জানতে ইচ্ছে করে তারা আসলে কি গুণে এসব পদ লাভ করে থাকেন? বড়ই পরিতাপের বিষয়, আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ যাদেরকে আলেম হিসেবে সবচেয়ে বেশি সম্মান করেন, মর্যাদা দেন তাদেরই একটি অংশ নাকি, বেনামাজি সুন্নাত বলি দেওনেওয়ালাদের দাওরায়ে হাদীস মাদরাসার সভাপতি বানান। কিন্তু কি গুণে? সভাপতি পদের জন্য আসলে কি কি গুণ থাকা দরকার? উনার কাজ কি? সভাপতি হবেন আমলদার ব্যক্তি। আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি। তিনি প্রতিষ্ঠানের পড়ালেখার মান, শিক্ষার্থীদের আমল আখলাকের মান ঠিক আছে কি না, তাদেরকে অর্থনৈতিক সাপোর্ট দিতে হবে কি না ইত্যাদি বিষয় দেখবেন। কার দ্বারা এসব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে? কিভাবে পোষানো সম্ভব? মসজিদ মাদরাসা কিভাবে সুন্দর হবে, উন্নত হবে? এসব বিষয়ে ইমাম বা শিক্ষকদেরকে উপদেশ দিবেন। শিক্ষকরা কোন জায়গায় ত্রুটি করলে তা ধরিয়ে দিবেন। সংশোধন করে দিবেন। কিন্তু আমরা যাদেরকে সভাপতি বানাচ্ছি তাদের কি এসব গুণ আছে? তারা কি পারবেন শিক্ষকদের ভুল ধরিয়ে দিতে? সময়মত ক্লাসে ঢুকেন কি না এসব বিষয়ে পারবেন তাদেরকে উপদেশ দিতে? একজন দাঁড়িকাটা, বেনামাজি মানুষ কি করে আলেমদের উপদেশ দিবেন? মসজিদ মাদরাসায় চলছে এসব উল্টাপাল্টা কাম। কিন্তু কেন? কিসের লোভে? অর্থ? ওটার দায়িত্ব আল্লাহই নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালার উপর পুরাপুরি ভরসা করতে হবে। তাহলে তিনি পথ খুলে দিবেন। নামাজের প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ওয়া’মুর আহলাকা বিসসালাতি ওয়াসত্বাবির আলাইহা। লা নাসআলুকা রিজকা নাহনু নারজুকুকা।’ বেনামাজি ব্যক্তি আল্লাহর দুশমন। যারা দাঁড়ি-টুপির আমল করে না সোজা কথায় বলতে গেলে তারা নবীর দুশমন। এ ধরনের ব্যক্তিকে দিয়ে মসজিদ মাদরাসা চালানোর নিয়ম, তাদের সভাপতি বানানোর নিয়ম কোথায় আছে? তাহলে ক্বওমী মাদরাসার উসূল থেকে সরে এসে যারা এরকম সভাপতি সেক্রেটারি বানিয়েছেন মূলতঃ জেনারেল শিক্ষিতদের দ্বারা আলেমদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়ার জন্য এরাই দায়ী। জানা মতে, অধিকাংশ জেনারেল শিক্ষিতরা এ পদটি চাননি। মাখলুকের উপর নির্ভরশীল কিছু আলেম তাদেরকে জোর করে এনে এ পদ দিয়েছেন। তাদের ধারণা তাকে সভাপতি বানালে মাদরাসার অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল হবে। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য দাঁড়িকাটা কোন ফাসেক ব্যক্তিকে দাওরা মাদরাসার সভাপতি বানানো যাবে কি? অথবা যিনি দান করেছেন তিনিও যদি এরকম নিয়তে দান করেন যে, আমাকে সভাপতি বানিয়েছে বলে দানটা করলাম। তানাহলে করতাম না। এতে সাওয়াব হবে কি? হবে না।
হ্যাঁ, ব্যতিক্রম কিছু ঘটনা থাকতে পারে। কিছু মানুষ কায়দা কৌশল করে সভাপতি সেক্রেটারি পদ বাগিয়ে নিতে পারেন। ওই ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম দায়ী নন। তারা জুলুমের শিকার। তাই বলে সবাই না। যারা কায়দা কৌশল করে ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ইসলামী জলসার প্রধান অতিথি হন বা মসজিদ মাদরাসার সভাপতি হন; পদ না দিলে সভা করতে দিবেন না। মসজিদ মাদরাসার সভাপতি না বানালে নিজেও দান করবেন না, অন্যদেরকেও দান করতে দিবেন না; মসজিদ মাদরাসাকে চাপে ফেলানোর হুমকি দিবেন এরকম পরিস্থিতির শিকার হয়ে যদি কোন আলেম তাদেরকে এসব পদ দিয়ে থাকেন তাহলে তারা দায়ী নন। তবে এসব পদলোভী ব্যক্তিদের ব্যাপারে ৫ নভেম্বর ২০২৪ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐতিহাসিক মহাসম্মেলন থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আপনারা এ কাজটা করবেন না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব আপনারা দিতে পারবেন না। এই যোগ্যতা আপনাদের নেই। যাদের আছে তারা দিতে পারবেন। মূলতঃ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিবেন উলামায়ে কেরাম। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক মহাসম্মেলনে বক্তারা বলেন, দুনিয়াবি কিছু বিষয় আছে এগুলোর ফায়সালা বা মাতব্বরি আপনারা জেনারেল শিক্ষিতরাই করেন এবং করবেন। যেমন- ঝগড়াঝাটি, মারামারি, কাটাকাটি হলে, সামাজিক বিবাদ হলে ফায়সালা দিবেন আপনারা, স্থানীয় মাতব্বররা। স্কুল কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সেক্রেটারি থাকবেন আপনারা, জেনারেল শিক্ষিতরা। কেননা, আপনারা এসব বিষয়ে দক্ষ কিন্তু কেউ বউ তালাক দিলে এর মাসআলা কে দিবে? আপনারা দিবেন? ওসি সাহেব দিবেন? এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বাররা দিবেন? এটা আপনাদের কাজ নয়। এ বিষয়ে আপনারা দক্ষ নন। দক্ষ হলে ভিন্ন কথা। মূলতঃ এর মাসআলা দিবেন উলামায়ে কেরাম। মসজিদ মাদরাসার নেতৃত্ব দিবেন উলামায়ে কেরাম। শুধু তাই নয়, ধর্মীয় যে কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবেন উলামায়ে কেরাম। প্রশাসনসহ এদেশের সর্বস্তরের জনতা তাদেরকে সহযোগিতা করবেন। উলামায়ে কেরামের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করবেন না। রাসূল (সা.) বলেন, আলেমদের সাথে বিদ্বেষ বা শত্রুতা পোষণ করা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। আলেমরা নবীদের ওয়ারিশান। একথাটা আমরা বহুবার শুনেছি কিন্তু এর অর্থ কি? পৃথিবীতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দামী যে মানুষটি আছেন তার সন্তান বা ওয়ারিশান হওয়ার কারণে কোন ব্যক্তি যে সম্মান লাভ করেন, এর চেয়েও বেশি সম্মান লাভ করবেন উলামায়ে কেরাম। আলেম হওয়ার সুবাদে। এ সম্মান তাদেরকে দিতে হবে। এটা তাদের মনগড়া কোন দাবি নয় বরং আল্লাহর রাসূল (সা.) বলে গেছেন। আল উলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। আলেমরা নবীদের ওয়ারিশান। যদি কেউ আলেমদের সম্মান না দেন তাহলে সে ইসলাম বিরোধী হিসেবে গণ্য হবেন। এমনকি তাকে কাফের হয়ে মরার সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে বর্তমানে যে ফেতনা দেখা দিয়েছে তা হলো, সাদিয়ানী ফেতনা। তারা আলেমদের মানেন না। আলেমদের না মানলে যত তাবলীগই করেন না কেন বেঈমান হয়ে মরার সম্ভাবনা রয়েছে। সাদপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে তাবলীগ করতে করতে নিজেদেরকে আলেম ভাবতে পারেন। আসলে এরকম ভাবা ঠিক নয়। এ বিষয়ে আল্লামা জুনাইদ আল হাবীব বলেন, তাবলীগ দীনী কাজ। এর নেতৃত্ব দিবেন উলামায়ে কেরাম। একজন নার্স যদি ৪০ বছরও কাজ করে তবু সে নার্স। সে ডাক্তার হয়ে যায় না বা তাকে কেউ ডাক্তার মনে করে না। ঠিক তেমনিভাবে একজন মানুষ যত বছরই তাবলীগ করুক না কেন, সে আলেম হয়ে যায় না বা তাকে আলেম বলা হয় না। আর কিছু আলেম যদি সাদপন্থীদের সাথে থাকেনও তবু আপনাকে ভেবে দেখতে হবে যে, এত বেশি আলেম কেন সাদ সাহেবকে সাপোর্ট করছেন না। তবে কি উনার কোন সমস্যা আছে? পৃথিবী বিখ্যাত মাদরাসা দারুল উলূম দেওবন্দ কেন উনার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিল? তবে কি উনার মধ্যে কোন সমস্যা আছে? এসব বিষয় নিয়ে ফিকির করলে বর্তমানে যেসব আলেমকে মানুষ বড় আলেম মনে করে তাদের নিকট গিয়ে যাচাই বাছাই করলেই সাদ সাহেব যে ভ্রান্তপথে রয়েছেন তা আশা করি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সাদপন্থী ভাইদের বলবো, আপনারা আমাদেরই ভাই। সাদ সাহেব সম্পর্কে আরও জানুন। গবেষণা করুন। সহজে বুঝবার জন্য বলবো, যেখানে বেশি উলামায়ে কেরাম সেখানে থাকুন। প্রকৃতপক্ষে যিনি যে পদের যোগ্য তাকে সেই পদে বা সেই জায়গায় রাখলে কাজ ভাল হবে। দেশ ও জাতি উন্নত হবে, উপকৃত হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুক।