• সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বীর মুক্তিযোদ্ধা মুখলেছুর রহমান ছিলেন একজন সৎ দানবীর ও ভালো মনের মানুষ ফুলপুরে দেশীয় অস্ত্র ও মাদকসহ পৃথক অভিযানে আটক ২ ১১ দলীয় ঐক্য জোটের অন্যতম নেতা মামুনুল হকের তারাকান্দা ও ধোবাউড়া সফর সাংবাদিক ইমনের বাবার জানাজা সম্পন্ন : দোয়ার দরখাস্ত ‘একই বুথে দুইজনের বেশি সাংবাদিক প্রবেশ করতে পারবেন না’- ইউএনও, ফুলপুর মাত্র দুই ঘন্টার ব্যবধানে মারা গেলেন ফুলপুরের দুই মুরুব্বি ময়মনসিংহে নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা ময়মনসিংহ-২ আসনে কারাগারে আটক পিতার পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় নেমেছেন কন্যা কাশফী ময়মনসিংহ-২ আসনে হাতপাখার পক্ষে পথসভায় বক্তব্য রাখেন পীর সাহেব চরমোনাই ময়মনসিংহ-২ আসনে ১০ দলীয় ঐক্য জোট প্রার্থী মুফতী মুহাম্মাদুল্লাহর রিকশা প্রতীকের পক্ষে বিশাল মিছিল

প্রথম আলোর শুভলগ্নে আমার যুক্ত হওয়া ও দুটি না বলা কথা

Reporter Name / ১২৭ Time View
Update : সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৪

গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু :

প্রথমেই শুভ জন্মদিন প্রথম আলোকে।

সম্ভবত ১৯৯৮ সালের সেপ্টেস্বর মাস। সেদিন ঢাকায় গেলাম, ইত্তেফাক অফিসে। ইত্তেফাকে তখন কাজ করেন  সাংবাদিকতার ‘বাতিঘর’ খ্যাত পরম শ্রদ্ধেয় হাবিবুর রহমান মিলন। মাত্র কিছুদিন আগে এই মিলন ভাই তখনকার এমপি মরহুম আবদুল লতিফ ভাইয়ের আমন্ত্রণে নবীনগরে এসেছিলেন। তখনই মিলন ভাইয়ের মতো বাতিঘরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। সেসময় এমপি লতিফ ভাই সাংবাদিক মিলন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ওইরাতে নৌকায় চড়ে বড়িকান্দি দয়াল বাবা গণি শাহর দরবারে গিয়েছিলেন। আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমিও তাঁদের সফরসঙ্গী ছিলাম। গণি শাহ বাবার দরবারে তখন বাউল গান করছিলেন দেশের প্রখ্যাত বাউল শিল্পী আরিফ দেওয়ান। সেই রাতে মিলন ভাই আরিফ দেওয়ানের অসাধারণ ক্ল্যাসিকেল কণ্ঠে গান শুনে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলেন। আর সেই মঞ্চে বাউল গান ও ক্ল্যাসিকেল মিউজিকের উপর আমার বিশ্লেষণধর্মী বক্তৃতা শুনে মিলন ভাই আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে প্রাণভরে আশীর্বাদ করেছিলেন। আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে প্রকাশিত স্থানীয় প্রাচীন আঞ্চলিক দৈনিক প্রজাবন্ধু’তে ‘নবীনগর প্রতিনিধি’ হিসেবে কাজ করি। মিলন ভাই পরদিন ঢাকায় ফেরার সময় ডাক বাংলোতে আমাকে বললেন, ‘অপু, ঢাকায় গেলে, আমার অফিসে (ইত্তেফাক) এসো।’ এরপরই আমি ঢাকায় শ্রদ্ধেয় মিলন ভাইয়ের অফিসে যাই। মিলন ভাই আমাকে ইত্তেফাক অফিসে দেখেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। আমি তাঁর পা স্পর্শ করে প্রণাম করলাম। কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলেন,’কি খবর তোমাদের? সবাই ভালো আছো তো?

‘জ্বি, আপনার আশীর্বাদে আমরা সবাই ভালো আছি। আবার কবে আসবেন নবীনগরে?’ মিলন ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে বিনয়ের সঙ্গে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিলাম।
এক পর্যায়ে বললেন, ‘ঢাকায় কেন এসেছো? কোন দরকারি কাজে? এবার বুকে সাহস নিয়ে বললাম, ‘মিলন ভাই, আমি একটি জাতীয় দৈনিকে কাজ করতে চাই। শুনেছি, খুব শিগগীর নাকি ‘প্রথম আলো’ নামে একটি বিগ বাজেটের বড় পত্রিকা বাজারে আসবে?

আমি নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি হিসেবে এই বড় কাগজটাতে (প্রথম আলো) কাজ করতে চাই। আপনি একটু সুযোগ করে দিন মিলন ভাই, প্লিজ।’
আমার সব কথা শোনার পর তিনি একটা ছোট্ট চিরকুটে ৪/৫ লাইন লিখে আমার হাতে সেটি ধরিয়ে দিলেন।
আমার যেটুকু মনে আছে, চিরকুটে তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রিয়ভাজনেষু আলমগীর, ছেলেটির নাম গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু। তোর কাছে পাঠালাম। ভালো ছেলে। লেখার হাতও ভালো। বলেও বেশ ভালো। তোর নবীনগরের ছেলে। যদি সম্ভব হয়, অপুকে নবীনগর প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম আলোতে কাজ করার সুযোগ করে দিস্।
ভালো থাকিস। — হাবিবুর রহমান মিলন। চিরকুটের শব্দগুলো পড়েই আমার মনে তখন আনন্দের বন্যা বইছিলো।

মিলন ভাই তখন আমাকে বললেন, প্রথম আলোতে যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছে শাহ আলমগীর। তোমাদের নবীনগরে যার জন্ম। তুমি প্রথম আলো অফিসে গিয়ে আমার এই চিঠিটা আলমগীরের হাতে দিয়ে বলবে, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি।
বিশ্বাস করুন, খুশিতে আমার তখন কী যে মনের অবস্থা! সেটি লিখে বুঝাতে পারবো না।
মিলন ভাইয়ের চরণে হাত রেখে আবারও তাঁকে প্রণাম করে চিরকুট’টা পকেটে ভরে সোজা কাওরান বাজারের দিকে রওয়ানা হলাম।
প্রথম আলোর নান্দনিক বিশাল অফিসে ঢুকেই শাহ আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলাম। এরপর চিরকুট’টা তাঁর হাতে ধরিয়ে আমার পরিচয় দিয়ে তাঁর পায়ে হাত রেখে প্রণাম করলাম।
আলমগীর ভাই চিরকুট’টা পড়ে আমার সঙ্গে বেশ খানিকটা সময় নবীনগরের নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বললেন। আমি তন্ময় হয়ে তখন সদা হাস্যোজ্বল এ মানুষটির কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম। জানতে পারলাম, ধীরগতিতে ও আস্তে কথা বলা খুবই মিষ্টভাষী এই মানুষটির জন্মভূমি নবীনগরের বিটঘর ইউনিয়নের দুরুইল গ্রামে।
এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আপনি কি এর আগে অন্য কোন জাতীয় দৈনিকে কাজ করেছেন?
বললাম, না। (তবে আমাকে আপনি বলে সম্বোধন করায় খুবই অস্বস্তি লাগছিলো)
ঠিক আছে। মিলন ভাই যেহেতু আপনাকে পাঠিয়েছেন, আপনি বাড়ি ফিরে গিয়ে নিউজ পাঠাতে থাকুন। প্রথম আলোতে আপনার নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি আমি দেখবো।
এরপর প্রথম আলোর কিছু ছোট ছোট স্টিকার ও কাগজপত্র আমাকে দিয়ে কিভাবে কোন ফ্যাক্স নম্বরে নিউজ পাঠাতে হবে, সেসব বুঝিয়ে দিলেন।
এরপর আমাকে লাঞ্চ করানোর জন্য খুবই চেষ্টা করলেন। কিন্তু আলমগীর ভাইয়ের অমায়িক ব্যবহার ও তাঁর কথায় মহা আনন্দে আমার ক্ষিদে যে তখন কোথায় চলে গেছে, বুঝতেই পারিনি।
আলমগীর ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রথম আলো অফিস থেকে বের হয়ে নবীনগরের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা হই।
বন্ধুগণ,
প্রথম আলোতে যুক্ত হওয়ার এই স্মৃতি আমার জীবনের এক ঐতিহাসিক দৃশ্যপট। সবচেয়ে খুশীর খবর শাহ আলমগীর ভাইয়ের কল্যাণে ৪ নভেম্বর প্রথম আলো বের হওয়ার পরদিন ৫ নভেম্বরই প্রথম আলোর বিশাল বাংলায় ‘নবীনগরে কষ্টি পাথরের মূর্তি উদ্ধার’ শিরোনামে নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা দিয়ে আমার প্রথম নিউজ ছাপা হয়। সেদিন ওই নিউজটি নিয়ে আমি নবীনগরে একা একাই যেন আনন্দ মিছিল করেছি। রাস্তায় যাকে পেয়েছি, নিউজটি তাকেই দেখিয়েছি—।

এভাবে প্রথম আলোতে যুক্ত হওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যেই অফিস (প্রথম আলো) থেকে একটি চিঠি পেলাম। সাথে মনি অর্ডারে নগদ ৫০০/ টাকাও।
চিঠির ভাষাটা ছিলো অনেকটা এরকম- আপনার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে প্রথম আলো আপনাকে স্থায়ীভাবে ‘নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি’ হিসেবে নিযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনাকে অভিনন্দন। আপনি এখন থেকে প্রতি মাসে ৫০০/ টাকা করে পারিতোষিক পাবেন। পাশাপাশি লাইনেজসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও পাবেন।
বিশ্বাস করুন, কোন পত্রিকা অফিস থেকে সাংবাদিকদের কাজের বিনিময়ে টাকা পয়সা দেয়া হয়, হাতে নগদ ৫০০/ টাকা পাওয়ার পরই সেটি প্রথম বুঝতে ও জানতে পারি।
এরপর আমার আর পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রথম আলো আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে ২০০৬ সালে একজন উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে আমাকে ৫ম ওয়েজবোর্ডের অন্তর্ভূক্ত করে। পরবর্তীতে যা অষ্টম ওয়েজবোর্ডের আওতায় আমি প্রথম আলো থেকে বেতন ভাতাদিসহ সব সুযোগ সুবিধা পেয়েছি। একজন উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম আলো থেকে এতবড় স্বীকৃতি পাওয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
অথচ সেই প্রথম আলোর মানব সম্পদ বিভাগ থেকে ২০১৫ সালের কোন একদিন হঠাৎ কল করে বলা হলো- ‘গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু বলছেন?’
বললাম, জ্বি বলছি।
টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো- ‘দু:খের সঙ্গে জানাচ্ছি, প্রথম আলোর এবারের সাংবাদিক ছাটাইয়ের তালিকায় যে কজনের নাম আছে, তার মধ্যে আপনার নামও আছে। অর্থাৎ আপনি আর প্রথম আলোতে নেই।’
আমি বললাম, ‘আমার অপরাধ কি, সেটি জানতে পারি?
তিনি বললেন, ‘সেটিতো অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত। আমি এ নিয়ে কিছু বলতে পারবো না। আপনি অফিসে এসে আপনার পাওনা বুঝে নিয়ে যাবেন, প্লিজ’– বলেই ফোনটা রেখে দিলেন!

বন্ধুগণ,
এরপরও আমার মনে আজ তেমন কোন কষ্ট নেই। কারণ, আজ আমার যেটুকু অর্জন, স্বীকৃতি তার সবটুকুই প্রথম আলোর কল্যাণে।
আজ ৪ নভেম্বর। প্রথম আলোর ২৬ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। খুব মিস করি প্রাণের চেয়ে প্রিয় দেশের সংবাদপত্র জগতের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত প্রথম আলোকে। কারণ, এটি আজ আর শুধু পত্রিকা নয়, রীতিমত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত।

গর্বের সঙ্গে আজ বলতে পারি–
আমাকে আজকের ‘গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু’ হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে তথা একজন সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত করার মূল ভূমিকাই পালন করেছে এই ‘প্রথম আলো’। মানুষ আজ আমাকে যেটুকুই চেনে, জানে, মূল্যায়ণ করে, তার সবটুকু অবদান-ই আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো’র।
কারণ, পত্রিকাটি সৃষ্টি হওয়ার প্রথম দিন থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রথম আলোতে একাগ্রচিত্তে কাজ করে এ জীবনে অনেক কিছু শেখার, জানবার সুযোগ পেয়েছি।
আজ তাই ২৬ তম জন্মদিনে প্রথম আলোর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকলকে অনেক অনেক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
পাশাপাশি জন্মদিনে প্রণাম জানাচ্ছি পত্রিকাটির ‘প্রাণপ্রদীপ’ তুল্য পরম শ্রদ্ধেয় প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান মতি ভাইকে।
ঈশ্বর সবার মঙ্গল করুক।

লেখক :
সম্পাদক, নবীনগরের কথা
বর্তমানে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায়
নবীনগর প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত।
মোবাইল : ০১৭১১-৪৪৫৭৯১


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা