মো. আব্দুল মান্নান :
মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলে জীবন দেওয়া প্রবীণ সাংবাদিক স্বপন ভদ্রের প্রশ্ন, এবার দেশ মাদক আর দুর্নীতিমুক্ত হবে কি? মাদক কারবারি সাগর গংদের দায়ের কোপে নিহত সাংবাদিক স্বপন ভদ্র মৃত্যুর মাত্র ৩ দিন আগে তার ফেইসবুক আইডিতে স্ট্যাটাস দিয়ে একথা বলে যান তিনি। এর তিনদিন পর তাকে জীবন দিতে হয়।
ওইদিন তিনি তার বিশ্বাস থেকে আরও বলছিলেন, সততার কাছে দুর্নীতি কখনো জয়ী হতে পারে না। কিন্তু তা কি সত্য হয়েছে? হ্যাঁ, সত্য হয়েছে। স্বপন ভদ্র জীবন দিয়েছেন তবু সততা বিসর্জন দেননি। দুর্নীতি করেননি। যে বিষয় নিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তা থেকে পিছপা হননি। এটাই ছিল তার বিজয়। ৪ দিন আগে সমাজের মানুষকে তিনি সজাগ করে গেছেন। তিনি বলেন, যারা প্রকাশ্যে নেশা বিক্রি করে এদের বিরুদ্ধে সমাজের সচেতন মানুষের সজাগ হওয়ার সময় এসেছে। মাদক কারবারিদের দাপটে মানুষ ভীত, সন্ত্রস্ত ও অতিষ্ঠ। তাই প্রশাসনের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এসব মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হোক। কিন্তু সৎ নিরীহ সাংবাদিকদের কথা কে শোনে, বলুন? প্রশাসন কি শুনতে পেয়েছিল স্বপন ভদ্রের কথা? আমার জানা নেই। আমার এটুকু জানা আছে যে, এ ধরনের সৎ নিরীহ সাংবাদিকদের স্ট্যাটাস অধিকাংশরা পড়েনই না। তাহলে আমলে নেবেন কেমনে? তারা অনেক সময় দেখেও না দেখার ভান করেন। লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। তাহলে যেসব মজলুম ব্যক্তি লেখাপড়া জানেন না, যাদের কোন লোক নেই তারা সুবিচার পাবেন কেমনে?
আমরা জানি, প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। তবে যুদ্ধে কতটুকু আয় উন্নতি হয়েছে তা আমাদের জানা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়দিন পর পর দেখি, একের পর এক সারি সারি মদের বোতল, গাঁজার বস্তা ধরা পড়ছে। একেবারে গ্রাম পর্যায়ে উঠতি বয়সের যুবক কিশোরদের হাতে চলে গেছে মাদক। এতে সমাজে অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অস্থিরতা বাড়ছে। সমাজ কলুষিত হচ্ছে। ফলে ওইসব যুবক নয় শুধু বরং ওদের মা-বাবাসহ আমরা প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এজন্য সবাইকে এ ক্ষতি থেকে, মাদকের থাবা থেকে রক্ষা করতে, সমাজকে কলুষমুক্ত রাখতে স্বপন ভদ্র মূলতঃ মাদকের বিরুদ্ধে যু্দ্ধে নেমেছিলেন। অবশেষে মাদক কারবারির হাতেই তাকে জীবন দিতে হলো।
মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় নেওয়ার জন্য দাবি জানিয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর স্বপন ভদ্র নিজেই বলে গেছেন, মাদক কারবারি, লুটেরা ও দুর্নীতিবাজরা কোন দলের নয়। এদেরকে আইনের আওতায় আনা উচিৎ। এসব বলার পর তার উপর চাপ বেড়েছিল মাদক কারবারিদের পক্ষ থেকে। যে কারণে ৪ দিন আগে তিনি বলেন, খারাপ লোকদের অত্যাচার বেড়ে গেছে। আমি ভাল নেই। এদের অত্যাচার থেকে ভাল থাকার উপায় কি? এরা বেপরোয়া হয়ে গেছে। এ ধরনের স্ট্যাটাস স্বপন ভদ্র দিয়েছিলেন। এসব স্ট্যাটাস প্রমাণ করে সাংবাদিক স্বপন ভদ্র আনইজি ফিল করছিলেন। এজন্য আরেক জায়গায় তিনি দাবি জানিয়েছিলেন যে, এসব দুর্নীতি দূর করুন। দুর্নীতিমুক্ত নিরাপদ বাংলাদেশ চাই আমরা।
এভাবে সবসময় কথা বলতেন স্বপন ভদ্র। সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে লড়তেন। মাদক ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে তাদের চোখের কাঁটায় পরিণত হন তিনি। শেষ পর্যন্ত ১২ অক্টোবর সকাল ১১টার দিকে মাদক কারবারি চক্রের সদস্য সাগরদের দায়ের এলোপাতাড়ি কোপে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় নিজ বাসার সামনে তিনি নিহত হন।
স্বপন ভদ্র অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, তাকে হয়তো দুশমনরা দুনিয়াতে আর রাখবে না। এজন্য ৭ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, সময় আমার শেষ দ্বারপ্রান্তে। আসুন, সবাই শান্তির পথে চলি। জীবনে তিনি বহু কষ্ট করে গেছেন। সৎ সাংবাদিকরা তেমন কিছু করতে পারেন না। দুঃখ কষ্টেই চলে তাদের জীবন। ২০১৮ সনের ১ অক্টোবর তিনি বলেন, জীবন কোন ফুল শয্যা নয়। জীবন একটা কঠিন যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিনিয়ত আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তবে মনে রাখবেন, ষড়যন্ত্র করে কেউ ভালো থাকে না। চলতি বছর ৭ আগস্টে তিনি বলেন, সমস্যা নেই। এই সুন্দর পৃথিবী একদিন ছেড়ে চলে যেতেই হবে। ২৮ সেপ্টেম্বর তিনি বলেন, সময় চলে যায়। কারো জন্য অপেক্ষা করে না। তবে মনে থাকবে, অসময়ে দেওয়া আঘাতগুলো। তখন আমার জন্য কে কি করেছিলেন?
স্বপন ভদ্র একজন দেশপ্রেমিক সাংবাদিক ছিলেন। মৃত্যুর ৪দিন আগে তিনি বলেন, আমি দেশকে ভালবাসি। সৎ মানুষকে ভালবাসি। বাবা-মা ও সন্তানকে ভালবাসি। কিন্তু অন্যায়কারীকে ভালবাসি না, পছন্দ করি না।
তিনি সমাজ ও দেশ সচেতন সাংবাদিক ছিলেন। কথা বলতেন তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, চাল, ডাল ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য নিয়েও। এসব বলতে গিয়ে অনেকের চোখের শূলেও পরিণত হয়েছিলেন। চতুর্মুখি প্রতিভার অধিকারী এই সাংবাদিকের নির্মম মৃত্যুতে সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা জানানো হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রশাসনের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট স্বপন ভদ্র হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি এবং স্বপন ভদ্র যে প্রশ্ন রেখে গেছেন এর সাথে সুর মিলিয়ে আমিও বলতে চাই, সিনিয়র সাংবাদিক স্বপন ভদ্রের জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশ এবার মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত হবে কি?