মো. আব্দুল মান্নান :
আমাদের ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাটের কৃতি সন্তান বোয়ালজানা গ্রামের রত্ন মাওলানা আব্দুল গফুর হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহি এক ওয়াজ মাহফিলে একথা বলেন। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। বেশ কয়েক বছর হলো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি হালুয়াঘাটের একজন রত্ন ছিলেন; সম্পদ ছিলেন। উনার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ উপকৃত হয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় হালুয়াঘাটের গুডউইল বা সুনাম সুখ্যাতি বৃদ্ধি পেয়েছে; পরিচিতি বেড়েছে। তিনি অত্যন্ত নম্র ভদ্র ও মিষ্ট ভাষায় বয়ান করতেন। ছন্দাকারে কুরআন হাদীসের আলোকে আরবী ফার্সী ও গ্রাম্য মধুর ভাষায় বয়ান করতেন। মানুষকে আনন্দ দিতে পারতেন। যুক্তির সাথে কথা বলতেন। এজন্য উনাকে যুক্তিবাদীও বলা হতো। নিজে মনখোলে হাসতেন ও অন্যদেরকেও হাসাতে পারতেন। বয়ান শুনে মানুষ তৃপ্তি পেতেন। আমলদার আল্লাহওয়ালা মানুষ ছিলেন। উনারা যে আমলে বয়ান করেছেন সেই আমলে তখনও ভিডিও, ফেইসবুক এগুলোর ব্যপ্তি ঘটেনি। যে কারণে উনার প্রচুর ওয়াজ কিন্তু ফেইসবুক বা ইউটিউবে নেই। হয়তো জীবনের শেষের দিকে কিছুটা ফেইসবুক যুগ পেলেও উনারা এগুলো পছন্দ করতেন না। যে কারণে তিনি অসংখ্য বয়ান করে গেলেও তা কিন্তু ফেইসবুকে বা ইউটিউবে নেই। লুকিয়ে হয়তো কেউ দুয়েকটি বয়ান রেকর্ড করেছেন এবং ফেইসবুকে ছেড়েছেন। ওই ফেইসবুক থেকে পাওয়া একটি বয়ান সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো :
হজরত মাওলানা আব্দুল গফুর হুজুর বলেন, এক বেডা তাবলীগ কইরা পাগল অইছে। আল্লাহর পাগল। কলমার দাওয়াত ছাড়া আর কিছু বুঝে না। এরকমভাবে আরেক বেডার কথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, এক বেডা সহাল বেলা ঘরের দুয়ারের মধ্যে বইয়া রইছে। বইয়া ছাগলের কানে ধইরা কয়, এ ছাগল, ক ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। ছাগলে ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ায়। যেই ছাইড়া দিছে ছাগলে ‘না’ সূচক মাথা নাড়াইতাছে। অহন কয়, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কইতে না? কিরে! এতক্ষণ বুঝাইলাম তরে। অহন দেহি কছ না। আবার তারে কানে ধইরা কলমা তলকীন করাইলে কয়। ছাইড়া দিলেই না করে। তিনি বলেন, আমরার মধ্যেও কিছু মানুষ আছি বাবা, ওয়াজে আইলে সুবহানাল্লাহ। বাড়িতে গেলে আগের মত থাইক্কা যাই। ফার্সী বায়াত পড়ে তিনি বলেন, ওয়াজ শুনতে সময় বলবা সুবহানাল্লাহ। বাইরে বাইরইয়া পড়লেই আগের মত থাইক্কা যাইবা। বাবা, নাউজুবিল্লাহ আউজুবিল্লাহ এক কইরালাই। কত রকমের খারাপ করি হিসাব থাকে না। এইখানে বসবেন দিলের কান দিয়া শুনবেন। এইখানের ওয়াজগুলো কিন্তু বাবা শৃগাল কুকুরেও শুনতেছে। ফার্সী বায়াত পড়ে আবার বলেন, হে আব্দুল গফুররে, তোর মতন সবাই বুঝতেছে। তুইও বুঝ। তরে আমি একটা দিলের কান লাগাইয়া দিছি। এইডা দিয়া তুমি শুনবা। আমল তুমি করবা। তুমি নিয়ত করছো বাড়িতে যাইবা। রাস্তায় যাইয়া তোমার মৃত্যু অইয়া গেছে। আজরাইলে ধরছে। তোমার সময় মিলতো না। আমার আল্লাহ বলেন, ইয়া ইবাদিয়াল্লাজীনা —- মিররাহমাতিল্লাহ। আবারও ফার্সী বায়াত পড়ে বলেন, আমার আল্লাহ বলেন, আমার দরবার খালি না। বান্দা হুঁশ অইয়া আমার দরবারে আইছে। তওবা কইর যহন আমার কাছে মাফ চাইছে, জমিনে বইসা চোখের পানি ছাইড়া দিয়া গুনাহের দিকে লক্ষ্য কইরা কয়, আসতাগফিরুল্লাহ। আমার আল্লাহ বলেন, আমি বানাইছি একটা মিজানের পাল্লা। যেদিন উঠবে তুমি হাশরে, দেখবে নজরে। নেকী বদী ওজন করবো যেদিন তোমার, সেদিন তুমি দেখবে দুনিয়াতে আমল করছি, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’। আল্লাহ বলেন, তোমার গুনাহগুলো মাফ কইরা আমি নেকী ভাউ কইরা রাখছি। এই নেকীগুলো দিয়া তোমার মিজানের পাল্লা ভইরা দিব। তোমাকে আমি জান্নাত দিয়া দিব। তুমি যদি আমার বেহেশত চাও, আমার দোস্তের রঙে রঙিন হইয়া যাও। এরপর তিনি বলেন, মা আতাকুমুর রাসূলু ফাখুজুহু, ওয়ামা নাহাকুম আনহু ফানতাহু। বয়ান হবে হাদীস কুরআন, এইখানে বইসা হবেন আল্লাহর মেহমান। লক্ষ লক্ষ ফেরেশতারা দন্ডায়মান, একজনের কান্ধে আরেকজন পাড়া দিয়া আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছে যান। ওইখানে যাইয়া বলে মাবূদ! ও আল্লাহ ! তোমার কতগুলো বান্দা, নইমুদ্দীন সাইমুদ্দীন আব্দুল্লাহ, তোমারে কইতাছে আলহামদুলিল্লাহ। তোমার শুকরিয়া আদায় করতাছে। আমার আল্লাহ কয়, তোমরা না করছিলা বানাইবার। আজকে দেখ তোরা তাদের আমলের কারবার। সবগুলি মানুষ আইসা বইছে, আমি আল্লাহ খুশি অইয়া গেলাম। এই মানুষগুলি যহন আমারে আল্লাহ কইয়া ডাক মারে, আমি আর থাকি না দূরে। হাজিরা দেই বান্দার গাড়ে। আইসা জিজ্ঞাসা করি, বান্দা, তুমি আমারে ডাকছ কেরে? আমার আল্লাহ বলেন যে কথা কইয়া বান্দা আমারে ডাক মারছে, বান্দায় কয় মাবূদরে, আমার কিছু অভাব আছে দূর করবা। আল্লাহ কয়, আমি এগুলো পূরণ করবার লাইগ্যাই তো আল্লাহ। সবাই জোরে কইন, সুবহানাল্লাহ। তিনি বলেন, অসুবিধা লাগতাছে? ভাইজানরা দো দাঁড়ায়া রইছুইন। জাগা নাই? বাজান, ধর্ম সভাত আইলে দাঁড়ায়া থাহন এইডা কোন সুন্নাতে পাইছি না। এই যে হুজুর, খাড়ায়া রইছুইন। ও, হেইলা না। হেইলা তো মনে অয় কোন লোকটুকের লাইগ্যা খাড়ায়া রইছে। হুজুররারে কইতাম না। পরে বেআদবি অইবো। কিচ্ছু কইতাম না। আপনেরারে দেখলে বাবা, গুনাহ থাকে না। আল্লাহর রাসূল সা. বলেন, আল উলামাউ ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। নবী আর দুনিয়াতে আইতো না। আলেমরা অইলো নবীর ওয়ারিস। একটা হক্কানি আলেম যদি কোন এলাকা দিয়া হাইট্যা যায়, তাহলে ওই এলাকার ৪০ দিনের কবরের আযাব বন্ধ অইয়া যায়। কবরবাসী বলছে, মানুষ, মিছে তুমি করছো আশা, দুদিন পরে ভাঙবে স্বপ্ন আমার মত ঘটবে দশা। আমার পরে এই বাড়িতে বাস করেছে অনেকজন, তারা গেছে তুমিও যাবে কেউ রবে না বেশিক্ষণ। ঠিক না বেঠিক? সবাই বলে ঠিক। তিনি প্রশ্ন করেন, কেডা কেডা মরতাইন না? হাত তুলেন। কেউ হাত তুলেনি। মরণ একদিন লাগবেই। কি কন? দন্ত পড়িবে, চুল পাকিবে, যৌবনে পড়ে যাবে ভাটি, ক্রমে ক্রমে খুলিয়া পড়িবে তোমার রঙিলা দালানের মাটি। কার আশায় বানাইলাম ঘরবাড়ি? এরপর বায়াত পড়ে বলেন, একদিন প্রত্যেককেই যেতে হবে। পান্থ শালার বন্ধুরা সব শুনরে পেতে দুটি কান, যাওয়ার বেলায় বলবো আমি কি দুঃখে মোর কাঁদে প্রাণ। হুজুর শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ঘুমায়ে গেছেন? অসুবিধা লাগে? প্রধান বক্তা হিসেবে অনেক রাইতে দিছে। অহন তো বুড়া বয়স। আমার থাইক্কা বয়সাইল্যা বক্তা একটাও আইছে না। এই দিক দিয়া আমি প্রধান। উলামায়ে কেরাম অনেক পাছে আর কেউবা সামনে আছেন। বেআদবি করতাছি। এলাইগ্যা মাফ চাই। উচাত বইছি। আর উচাত না বইলেও তো ওয়াজ শুনবেন না। এজন্য উচাত বইছি। উচাত বইছি দেইখ্যা দাম বাইড়া গেছে না। কি কন? রিকশাওয়ালাও ত উচাত বয়। চেয়ারম্যান সাহেব রিকশাওয়ালার পিছনে নিচাত বয়। এলাইগ্যা কি অইছে? উচা নিচার কাম বাজছে না। নিচে থাকলেই দাম কমে না। ও মিয়া, আলেমের দাম কত? আলেমকে দেইখ্যা যদি কেউ নাক ছিটকায়; ও ভাইয়েরা হুইন্যা যাইন, হুইন্যা যাইন। একটা কথা হুইন্যা যাইন। আমি গাড়র দেশের মানুষ। এক্কেরে হালুয়াঘাট বর্ডারের শেষ সীমানায়। আমার পরে আর বাংলাদেশ নাই। এই দেশের আমি একজন ভাই। আমি গাড়র দেশের মানুষ তবে আমি গাড় না। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমারে গাড় বানাইতে পারতো। আমি ত দরখাস্ত দিছলাম না যে, আল্লাহ তুমি আমারে গাড় বানাইও না। আল্লাহ যদি কয়, তরে আমি মানুষ বানাইছি, জাতির সেরা বানাইছিলাম। মুসলমান বানাইছিলাম। আমার দোস্তের উম্মত বানাইছিলাম। তোর দাম কত? তুই কি একবারও চিন্তা করছিলে? আমার দোস্তের রঙে রঙিন অইছিলে? আমার আল্লাহ বলেন, আমার বেহেশত যদি চাও, তাহলে আমার দোস্তের রঙে রঙিন হইয়া যাও। আমার দোস্ত কে? চিন? মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা হুজুরের এ বয়ান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের জীবনকে সুন্নাতের রঙে রঙিন করার তাওফীক দান করুক।
* অনলাইন থেকে সংগৃহীত।