মো. আব্দুল মান্নান :
গরিবরা মেধাবী ও সৎ হলেও কিছু লোক তাদের দাবিয়ে রাখতে চায়। তাদের যথাযথ সম্মান ও কদর তারা দিতে চায় না। তারা অর্থ সম্পদ ও জনবলে সমৃদ্ধ। অর্থ সম্পদ ও জনবলে সমৃদ্ধ লোকদের একটা অংশ নিজেদেরকে আল্লাহর প্রিয়পাত্র মনে করেন। নামাজ আদায় না করেও, সুন্নাতের ইত্তেবা না করেও এমনকি নানা অন্যায়ে জড়িত থেকেও তারা মনে করেন, আল্লাহ তায়ালা যদি আমাদের আচার-আচরণ ও কার্যকলাপ পছন্দ না করবেন তাহলে আমাদেরকে এত ধন সম্পদ দিতেন না। পার্থিব মান সম্মান ও শাসন ক্ষমতায় সমৃদ্ধ করতেন না। এরকম মনোভাব পোষণ করে গরিবদেরকে তারা হেয় ভাবেন। গরিব লোক মেধাবী হলেও, সৎ হলেও তার যথাযথ মূল্যায়ণ তারা করতে পারেন না। তারা মনে করেন সম্মান শুধু তাদের। তারা ধনী। এ কারণে তারা আল্লাহর প্রিয়। অথচ পার্থিব ধন-সম্পদ ও সম্মান আল্লাহ তায়ালার প্রিয়পাত্র হওয়ার কোন দলীল নয় বরং এটা একটা ধোঁকা মাত্র।
গরিব অসহায় দীনদার মেধাবী ও সৎলোকদের প্রতি ইঙ্গিত করে ওইসব প্রভাবশালীরা বলেন, এরা কেডা? এডি তো মানুষই না। এরা পাগল, পাপিষ্ঠ। যদিও রাজাকার নন তবু বলে, এরা রাজাকার। যদিও কোন দল করেন না তবু বলে, এরা বিএনপি, জামাত বা এরা আওয়ামী লীগ। এদের বাড়ি ভিটা নেই। এরা বাউইল্যা। এদের কথা শোনে কে? আমরা এলাকার কৃতি সন্তান। আমাদেরকে হকের দাওয়াত দেওয়ার এরা কারা? ভাল কথা বললেও ভাল কাজের প্রতি দাওয়াত দিলেও তাচ্ছিল্য করে বলেন যে, এ কথা বলার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে? আল্লাহ বুঝি আর লোক পাইছিন না! আমরা তোমাদের কথা মানি না। তোমার দাওয়াত প্রত্যাহার করলাম। ছুঁড়ে ফেলে দিলাম ইত্যাদি বলে তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়। পাত্তা দেওয়া হয় না। অসম্মান করা হয়। বিভিন্ন সময় অকারণে লাঞ্ছিত করা হয়। কারণ, তারা গরিব। এরকম জুলুম করার পরও তারা মনে করেন যে, তারা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত। তা নাহলে আল্লাহ তাদের শাস্তি দিত।
এ বিষয়ে সূরা সাবার ৩৪ ও ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কোন জনপদে সতর্ককারী প্রেরণ করা হলে এর বিত্তশালী অধিবাসীরা বলতো, তোমরা যে বিষয়ে প্রেরিত হয়েছ আমরা তা মানি না। তারা আরও বলতো, আমরা ধনে জনে সমৃদ্ধ, সুতরাং আমরা শাস্তিপ্রাপ্ত হব না।’ তাফসীরে ইবনে কাসীরে ৩৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যখনই আমি কোন রাসূল প্রেরণ করেছি তখনই ধনৈশ্বর্য্য ও ভোগ বিলাসে লালিত পালিত লোকেরা কুফর ও অস্বীকারের মাধ্যমে তাঁর মোকাবেলা করেছে। ৩৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আমরা ধনেজনে সবদিক দিয়েই তোমাদের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ। সুতরাং আমরা আযাবে পতিত হবো না। আল্লাহ তায়ালার কাছে আমরা যদি শাস্তিযোগ্য হতাম তাহলে তিনি আমাদেরকে এত ধনৈশ্বর্য্য দিতেন? ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এর জওয়াব দিয়েছেন। যার সারমর্ম হলো, দুনিয়াতে ধন-সম্পদ, মান-সম্মান ও প্রভাব প্রতিপত্তির হ্রাসবৃদ্ধি আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রিয় বা অপ্রিয় হওয়ার কোন দলীল নয়। বরং সৃষ্টিগত সুবিবেচনার ভিত্তিতে দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা অগাধ ধন-সম্পদ দান করে থাকেন এবং যাকে ইচ্ছা কম দেন। কিন্তু কেন? -এর রহস্য একমাত্র তিনিই জানেন। ধন-সম্পদের প্রাচুর্যকে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হওয়ার দলীল মনে করা মুর্খতা। আল্লাহ তায়ালার প্রিয় হওয়া নির্ভর করে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার আনুগত্যের উপর, ঈমান ও সৎকর্মের উপর। ঈমান ও আমল না বানিয়ে ধন সম্পদ ও জনবলের প্রাচুর্য গড়ে তুললেও আল্লাহ তায়ালার প্রিয়পাত্র হওয়া সম্ভব নয়। যারা এরকম ধারণায় ঈমানদার ও সৎকর্মশীলদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছেন তারা মূলতঃ ভুলের মধ্যে আছেন। আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ধন-সম্পদ দিয়েছেন দুনিয়া কামাইয়ের জন্য নয়, এ ধন-সম্পদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে দমনের জন্য নয় বরং এ দিয়ে আখেরাত বানানোর জন্য। এ সম্পদ আপনি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে, এ সম্পদের প্রতাপে উত্তপ্ত হয়ে সৎ নিরীহ গরিব মানুষের উপর টর্চার করলে এটা আপনার জন্য বিপদ ডেকে আনবে। এ ব্যাপারে অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আইয়াহসাবু আন্নামা নুমিদ্দুহুম মিম মালিও ওয়া বানিনা নুসারি লাহুম ফিল খাইরাত। বাল লা ইয়াশউরূন।’ অর্থাৎ তারা কি মনে করে যে, আমি ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তাদেরকে যে সাহায্য করি তা তাদের জন্যে পরিণাম ও পরকালের দিক দিয়েও মঙ্গলজনক? (কখনোই নয়) বরং তারা আসল সত্য সম্পর্কে বে-খবর। অর্থাৎ যে ধন-সম্পদ ও জনবল মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়, যে সম্পদ পেয়ে সে আল্লাহওয়ালা হতে পারে না, হক পথে সম্পদ ব্যয় করতে পারে না, তা তার জন্যে শাস্তিস্বরূপ। এ সম্পদ তার বিপদের কারণ হবে।
সম্পদ আমাকে নাজাত দিবে, সম্মান দিবে, এটা ভুল। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ইন্নাল্লাহা লা ইয়ানজুরু ইলা সুয়ারিকুম ওয়া আমওয়ালিকুম। ওয়ালাকিই ইয়ানজুরু ইলা কুলুবিকুম ও আ’মালিকুম।’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা সূরত বা মাল সম্পদের দিকে তাকান না বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান। অতএব, সম্পদের পাহাড় না গড়ে, সম্পদ নিয়ে বড়াই না করে আমল ঠিক করতে হবে। আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত প্রিয়জন তারাই যারা তাদের ঈমান ও আমলকে বানাইছে। এজন্য মুমিনরা ধনসম্পদ বানানোর পেছনে নয় বরং ঈমান ও আমল বানানোর কাজে নিজেদেরকে ব্যপৃত রাখেন। মেহনত করে নিজের ঈমান ও আমলকে বানাতে পারলে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানেই সম্মান ও ইজ্জত দান করবেন। ঈমানদার ব্যক্তিকে বিনা অপরাধে গালিগালাজ করে মনে করা হয় যে, উনার ইজ্জত নষ্ট করে ফেলেছে। আসলে এতে ঈমানদার ব্যক্তির ইজ্জত নষ্ট হয় না বরং যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে গালিগালাজ করলো তার ইজ্জত নষ্ট হবে। ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার কাছে অনেক দামী, অনেক প্রিয়। আসমান ও জমিনের চেয়েও বেশি প্রিয়। দুনিয়াবাসী কেউ তাদের মূল্য বুঝুক আর না বুঝুক। এজন্য বলবো, মানুষের মূল্যায়ণ সম্পদ দিয়ে নয় বরং আমল দিয়ে। গরিব বলে সৎ ও আল্লাহওয়ালা মানুষকেও তাচ্ছিল্য করতে হবে, কায়দা কৌশল করে, সিন্ডিকেট করে তাকে দাবিয়ে রাখতে হবে, এরকম নোংরা মনোভাব থেকে আমরা বিরত থাকবো। কেননা, কারো টাকা পয়সা ও ক্ষমতা যেমন তার একটা অ্যাসেট বা সম্পদ, গরিবের গরিবী হালত ও সততাও তার জন্য তেমনই একটা অ্যাসেট বা সম্পদ। বিনা অপরাধে সেই অ্যাসেট কেউ নষ্ট করতে চাইলেই তা সম্ভব নয়। এটা একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব; তিনি চাইলেই সম্ভব। আর আল্লাহ তায়ালা তো এটা কখনোই চাইবেন না। যেহেতু তিনি তাকে দিয়ে সে কাজই করাচ্ছেন যা তিনি পছন্দ করেন। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে বুঝার তাওফীক দান করুক।