মুফতী মুহিব্বুল্লাহ রুশাইদ :
মুফতী আরিফ বিন হাবিব সাহেব একজন ইলমী ব্যক্তিত্ব। মুহাক্কিক আলেম। তাঁর অনেক সিফাত রয়েছে। তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসা ও ভালোলাগা রয়েছে। তবে মাওলানা ফরীদ সাহেব সম্পর্কে তিনি যা লিখেছেন তার কিছু বিষয়ে আমি একমত নই। তাই বিনয়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করে কিছু কথা বলছি।
তিনি লিখেছেন:
//প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের যে কয়জন আল্লামা আছেন, তাদের মধ্যে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ সাহেব একজন “আল্লামা”\\
তো কী হয়েছে? আল্লামা হলেই কি অন্ধের মতো তার সকল মুনকার ও বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করতে হবে? অথবা আল্লামার কাছ থেকে সুস্পষ্ট শরীয়তের তাহরীফ প্রকাশিত হলেও কি চুপ থেকে গ্রহণ করতে হবে?
আর আল্লামার মানদন্ড কী? শরীয়তের দৃষ্টিতে “আল্লামা” এর গুরুত্ব বেশি? নাকি “আলেম” এর গুরুত্ব বেশি? শরীয়তে “আল্লামা” হতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে? নাকি আলেম হতে?আল্লামা হওয়ার জন্য তো ইমান থাকাও জরুরী নয়। কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে আলেম হওয়ার জন্য তো (অন্যান্য শর্তের সাথে)ইমানের পাশাপাশি খাশয়াতে খোদাওয়ান্দী থাকাও জরুরি। যেমনটা সূরা ফাতেরের ২৮ নং আয়াত থেকে বোঝা যায়।
তিনি লিখেছেন:
//তিনি কথা বলেন কম যিকির করেন বেশি, তার মুনাজাত আপনাকে কাদাবে।এটার সাক্ষী আমি নিজেই\\
তিনি বেশি যিকির,ভালো ইবাদত ও মুনাজাত করেন তো কী হয়েছে? সেজন্য কি তার ভুলগুলো গ্রহণ করতে হবে? অধিক এবাদত তো খারেজিরাও করতো অথচ নবী সাঃ তাদের ব্যপারে কঠিন শব্দ প্রয়োগ করেছেন। নবীজী সা: বলেছেন:
يَحْقِرُ أَحَدُكُمْ صَلَاتَهُ مع صَلَاتِهِمْ، وصِيَامَهُ مع صِيَامِهِمْ، يَقْرَؤُونَ القُرْآنَ لا يُجَاوِزُ تَرَاقِيَهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ كما يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ،
তোমাদের কেউ স্বীয় নামাযকে তাদের নামাযের সাথে এবং নিজের রোযাকে তাদের রোযার সাথে তুলনা করলে(নিজের নামায ও রোযাকে) তুচ্ছ মনে করবে। তারা কুরআন পাঠ করে। কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করে না। তারা দ্বীন ইসলাম হতে এমনভাবে বের হয়ে পড়বে, যেমন তীর শিকার ছেদ করে বের হয়ে পড়ে।(সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)
সুতরাং অধিক যিকির,তেলাওয়াত ও ভালো মুনাজাত ব্যক্তির ভালো গুণ কিন্তু ব্যক্তির হকের দলিল হতে পারে না।
তিনি লিখেছেন
//তার কিছু বক্তব্যের সাথে ওলামায়ে কেরামগন দ্বিমত পোষণ করে থাকেন, সেসব বক্তব্যের যৌক্তিক সমালোচনা করার অধিকার রাখে তার সমপর্যায়ের ব্যক্তিরা, সবাই না।\\
উনার বক্তব্যগুলো কি নিছক বক্তব্যই ছিলো? নাকি অন্য কোন দল বা গোষ্ঠীর ইচ্ছা পূরণ ছিলো?
আর কোন ব্যক্তি ভুল করলে সমালোচনা সবাই করবে না ঠিক আছে কিন্তু সমপর্যায়ের বলতে কী বুঝিয়েছেন? সমান ইলমের অধিকারী নাকি
সমবয়স্ক? যদি প্রথমটা হয় তাহলে প্রশ্ন হলো ইলম তো মা’নুবী জিনিস।সেটা কীভাবে পরিমাপ করা হবে?আর যিনি সত্যিকার ইলমের অধিকারী তিনি কি ইলমের দাবি করতে যাবেন?
আর যদি উদ্দেশ্য হয় সমবয়স্ক।তাহলে তো বাস্তবতা বিবর্জিত শর্ত হয়ে গেলো। কারণ হাদীস শাস্ত্রের যেসকল মুহাদ্দিস অন্যদের উপর নকদ করেছেন সবাই কি সময়বস্ক ছিলেন? বরং দ্বীনি দায়িত্ব আদায় করতে গিয়ে (বয়সে)অনেক ছোটরাও (বয়সে) বড়’এর উপর নকদ করেছেন।আর যদি কোন (বয়সে) বড়’র কাছ থেকে দ্বীনের তাহরীফ হয় আর অন্য কোন (বয়সে) বড় ব্যক্তি তার রদ না করেন তাহলে কি(প্রয়োজনীয় ইলমের অধিকারী)বয়সে ছোটরা ঐ তাহরীফের রদ করবে না?
আর হ্যাঁ, বাংলার এই “আল্লামা”র ব্যপারে একজন বড়’এর (সম+আলোচনা) সমালোচনা আরো ৫/৬ বছর আগে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছে।সেটা হলো
২৮ জুমাদাল উলা ১৪৪০ হিজরী, মঙ্গলবার মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা. আমার উস্তায মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. এর স্মারকগ্রন্থে লিখা দিয়েছেন।যা স্মারকগ্রন্থের ৬৭–৭০ পৃ: পর্যন্ত ছাপা হয়েছে। মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.এর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে লেখার ৬৯ ও ৭০ পৃষ্ঠায় মাওলানা ফরীদ উদ্দিন মাসউদ সাহেব সম্পর্কে মুহাদ্দিসুল আসর মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা. মূল্যায়ন করেন এভাবে….
অবশেষে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের আলোচনা করা অত্যন্ত জরুরী মনে হচ্ছে। তা এই যে, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ ছাহেব তাঁর খাস উস্তায কিন্তু আমার যতটুকু জানা আছে ফরীদ ছাহেবের কোনো শায ও বিচ্ছিন্ন মত, মুনকার ও ভিত্তিহীন কোনো কাজ ও চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি তার সঙ্গ দেননি, বরং তাঁর এটাও জানা ছিল যে, ফরীদ ছাহেবের দ্বীনি মেজায পরিবর্তন হওয়ার পিছনে কোন ব্যক্তি বা কাদের সুহবতের প্রভাব ছিল।
শুধু মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ, নয়; বরং অন্যান্য উলামায়ে কেরাম যারা ফরিদাবাদ মাদরাসা অথবা মালিবাগ মাদরাসার তালিবে ইলম হওয়ার কারণে তার শাগরিদ হয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো আলেম ফরীদ ছাহেবের কোনো শুযুয ও বিচ্ছিন্ন মতামতের সাথে একমত নন। মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন ছাহেব,মাওলানা আবুল বাশার ছাহেব, মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ ছাহেব, মাওলানা আব্দুল মতীন ছাহেব ও মাওলানা আবদুল গাফফার ছাহেব।তাদের কেউ ফরীদ ছাহেবের
স্পষ্ট কোনো বিভ্রান্তিকর চিন্তার সাথে একমত পোষণ করা তো দূরের কথা কোনো শায মতের সাথেও একমত নন। এটা তাদের ফাকাহাত ও তাকওয়ার প্রমাণ।ফাকাহাতের কারণে তারা তার বাক্যনৈপূণ্যের ধোঁকায় পতিত হননি। আর তাকওয়ার কারণে তারা অন্যায় পক্ষপাত ও আসাবিয়্যাত থেকে মুক্ত ছিলেন এবং প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তারা তার শায ও মুনকার মত থেকে সম্পর্কহীনতা ও বারাআত প্রকাশ করেছেন
উস্তাযের প্রতি সম্মান প্রদর্শন তিনি যেমনই হোন বাঞ্ছনীয়। কিন্তু উস্তায হওয়ার কারণে কারো ভুলকে সঠিক বলা এবং তার গোমরাহীকে তাবীল করতে থাকা নিকৃষ্টতম আসাবিয়্যাত। যা অনেক বড় ও অনেক মারাত্মক কবীরা গোনাহ। আল্লাহ তাআলা উম্মতকে, বিশেষভাবে উলামায়ে কেরামকে আরো বিশেষভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে সম্পৃক্ত উলামায়ে কেরামকে এই ব্যাধি থেকে সবসময় নিরাপদ রাখুন। আমীন!……..
মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা.এর আলোচনা থেকে যা পেয়েছি…
১.মাওলানা ফরীদ সাহেবের দ্বীনি মেজায পরিবর্তন হয়েগেছে।
২.তার দ্বীনি মেজায পরিবর্তন হওয়ার পিছনে
(দেশি-বিদেশি)বিশেষ ব্যক্তি বা দলের সুহবতের প্রভাব ছিল।
৩.তার শায ও বিচ্ছিন্ন মত রয়েছে।
৪.তিনি বিভ্রান্তিকর চিন্তা লালন করেন।
৫.তিনি মুনকার ও ভিত্তিহীন চিন্তা লালন করার পাশাপাশি মুনকার কাজ করেছেন ও করেন।
৬.তার মুহাক্কিক ও মুহাদ্দিস ছাত্ররা তার এসকল মত ও কর্মকান্ডের সাথে একমত না বরং তারা
তার শায ও মুনকার মত থেকে সম্পর্কহীনতা ও বারাআত প্রকাশ করেছেন যেমন:-
মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন সাহেব,মাওলানা আবুল বাশার সাহেব, মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ সাহেব, মাওলানা আব্দুল মতীন সাহেব ও মাওলানা আবদুল গাফফার সাহেব প্রমুখ।
৭.তার বাকনৈপূণ্য রয়েছে যার কারণে বহু আলেম ও সাধারণ মানুষ ধোঁকায় পতিত হয়।
৮.তাকওয়ার কারণে আমাদের উচিত অন্যায় পক্ষপাত ও আসাবিয়্যাত থেকে মুক্ত থেকে তার শায ও মুনকার মত থেকে সম্পর্কহীনতা ও বারাআত প্রকাশ করা।
৯.বাস্তবতার আলোকে গঠনমূলক সমালোচনা করা যাবে তবে তার প্রতি মৌলিক সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন।
এই আল্লামার ব্যপারে সকলের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি রিজাল শাস্ত্রবিদ মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা. ৫/৬ বছর আগে বাস্তবতা পরিস্কার করেছেন। কিন্তু আরিফ বিন হাবিব সাহেব সেটা না খোঁজে আল্লামাকে তাওসিক করে দিলেন।
তাই আমার জানতে ইচ্ছে হয় মুফতী আরিফ বিন হাবিব সাহেব কি মাওলানা ফরীদ উদ্দিন মাসউদ সাহেবের বাক্যনৈপূণ্যের ধোঁকায় পড়েছেন?
* অনলাইন থেকে সংগৃহীত।
লেখক :
মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়া, ফুলপুর, ময়মনসিংহ।
১৯.০৯.২০২৪ ঈ.
বৃহস্পতিবার