মো. আব্দুল মান্নান :
ময়মনসিংহ জেলার নতুন ডিসি মুফিদুল আলম প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, জনগণের সাথে মিশতে হবে, পালস্ বুঝতে হবে। মানুষ আসলে কি চায় তা উপলব্ধি করতে হবে। সোমবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১টা ৫৪ মিনিটের সময় ফুলপুরে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ময়মনসিংহে ৩৯ জন মানুষ শহীদ হয়েছেন। আহতের সংখ্যা অনেক। বিগত সরকার মেকানিজম করে ক্ষমতাকে প্রলম্বিত করেছিল। নির্যাতন ও জুলুমের কারণে মানুষের পিত্ত ফেটে গিয়েছিল। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। অবশেষে কি হয়েছে? প্রকাশ্যে তাদেরকে পালিয়ে যেতে হয়েছে।

ছাত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তাদের জন্য আজ আমরা সুন্দরভাবে কথা বলতে পারছি। চেতনা চেতনা করতে করতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এখন খাই খাই ভাব দূর করতে হবে। খাই খাই ভাব থাকলে দেশটা সুন্দর হবে না। জনগণের সাথে মিশতে হবে। পালস্ বুঝতে হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ. বি. এম. আরিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান ফারুকের সঞ্চালনায় এসময় আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে ছাত্ররা বিআরটিসি বাস চালু, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও উৎসব উপলক্ষে ভাড়া না বাড়ানোর দাবি জানান। সাংবাদিক নাজিম উদ্দিন কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের ও সাংবাদিক নুরুল আমিন দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা প্রদানসহ বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ সাইফুলের নামে হলরুমের নামকরণের দাবি জানান। জামাত নেতা গোলাম কিবরিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজে ৪ তলা ভবন ও নিজ এলাকা রহিমগঞ্জের রাস্তা পাকাকরণের দাবি জানান। ইসলামী আন্দোলন নেতা সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা একেএম জালাল উদ্দিন বলেন, অর্জিত স্বাধীনতা যাতে ছিনতাই না হয়ে যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এসময় তিনি মুসলিম মৌলবাদ ও দুর্দিনে হিন্দু ভাইদের মন্দির পাহারাসহ ইত্তেফাকুল উলামার অবদান তুলে ধরেন। বিএনপি নেতা সিদ্দিকুর রহমান ডিসির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, আপনার সহযোগিতায় ফুলপুরকে আমরা ফুলের মত সাজাতে চাই। সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা এড. আবুল বাসার আকন্দ আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, সুঁড়সুড়ি দিলে পরিণাম ভাল হবে না। এছাড়া পালিয়ে থাকা আসামিদের ধরার জন্য তিনি ওসির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সমন্বয়কদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবুল বাসার আকন্দ বলেন, যারা আনে তাদের কষ্ট হয়; যারা খরচ করে তাদের কষ্ট হয় না। অতএব, অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তোমাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। পরবর্তীতে ব্যানারে বিসমিল্লাহ লেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই সত্য কথা বলতে শিখেছে। যে ছাত্রটি বোবা ছিল সেও কিন্তু এখন কথা বলার সাহস অর্জন করেছে। এসময় ফুলপুর মহিলা কামিল মাদরাসার দুর্নীতির অভিযোগের প্রতি ইঙ্গিত করে গাফলাযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। বওলা ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুব আলম ডালিম তার এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ির দাবি জানান। নতুন ওসি মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামানও চেয়ারম্যানের বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বওলায় একটি পুলিশ ফাঁড়ির দাবি জানান। এ ব্যাপারে নব যোগদানকারী জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুফিদুল আলম বলেন, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা ও টিআর কাবিখাসহ সকল ভাতা কার্ড যাচাই বাছাই করে ভূয়াদের বাদ দিয়ে প্রকৃত হকদারদেরকে দিতে হবে। এছাড়া তিনি উপজেলার বওলায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন, ফুলপুর রোডে বিআরটিসি বাস চালুকরণ, আসন্ন দুর্গা পূজায় নিরাপত্তা বিধান করণ, বিতর্কিতদের ফুলপুর থেকে বদলিকরণ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শহীদ সাইফুল ইসলামের বাড়ির রাস্তা পাকাকরণ ও শহীদ সাইফুল সড়ক নামে সড়কের নামকরণ করাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের আশ্বাস দিয়ে বলেন, আমারও দুইটি দাবি আছে। আর তা হলো, আপনারা নিজেরা কোন বিবাদে লিপ্ত হবেন না এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিবেন না। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।
এসময় সাবেক মেয়র উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য আমিনুল হক, পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমরান হাসান পল্লব, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হুমায়ুন কবীর, উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রেজ্জাক, উপজেলা কৃষি অফিসার ফারুক আহম্মেদ, বওলা ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুব আলম ডালিম, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি পরিতোষ দত্ত, উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি দেবল কুমার সাহা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
অতিথি হিসেবে এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, ক্যাপ্টেন জুবায়ের, সাব-রেজি: অফিসার স্বপ্না বিশ্বাস, উপজেলা সমাজসেবা অফিসার শিহাব উদ্দিন খান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আশীষ কর্মকার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নাসরিন আক্তার, উপজেলা শিক্ষা অফিসার শাহনাজ বেগম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ফুলপুর উপজেলা শাখার ফিল্ড সুপার ভাইজার সাদেকুল ইসলাম, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আরমানা হক, ফুলপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রওশন আরা বেগম, সিনিয়র সাংবাদিক খলিলুর রহমান, মোস্তফা খান, সেকান্দর আলী, তোফাজ্জল হোসেন, এম এ মান্নান প্রমুখ।
উপজেলায় এ প্রোগ্রামের পর জেলা প্রশাসক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ৪ জন (মো: সাইফুল ইসলাম, মো: মাসুম শেখ, মো: আনারুল ইসলাম ও মো: মাহিন মিয়া) শহীদের পরিবারের সাথে দেখা করে সেলাই মেশিন বিতরণ করেন এবং শহীদ পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে এ ব্যাপারে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এছাড়া তিনি আন্দোলনে শহীদদের কবর যিয়ারত করে তাঁদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
এসময় ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ.বি.এম. আরিফুল ইসলাম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান ফারুকসহ অনেকেই তার সাথে উপস্থিত ছিলেন।