অনলাইন ডেস্ক :
ঈদুল আজহাকে আমাদের দেশে কুরবানির ঈদ বলা হয়। এ দিনের প্রধান আমল হলো কুরবানি করা। কুরবানি ইসলামের অন্যতম নিদর্শন। কুরআন মজিদ ও হাদিস থেকে তা স্পষ্টভাবে জানা যায়। এজন্য কুরবানিকে ‘সুন্নাতে ইবরাহিমি’ নামে অভিহিত করা হয়।
ঈদ মুসলমানদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহোৎসব। মুসলিম মিল্লাতের সবচেয়ে বড় আনন্দের দিন। মনের সব কালিমা দূর করে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে, মান-অভিমান বিসর্জন দিয়ে একতা, সমদর্শিতা, ভ্রাতৃত্বতা ও সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের দিন। যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজের পবিত্রতা ঘোষণা করার পবিত্র উপলক্ষ।
ঈদুল আজহার দিন মহানবী (সা.) বিভিন্ন আমল করতেন। সেগুলো অনুসরণ করা আমাদের জন্য সুন্নত। পাশাপাশি এসব আমল প্রত্যাশিত আনন্দঘন ঈদকে প্রাণময় করে তুলবে। আসুন, ঈদ সত্যিকারার্থে আনন্দময় করে তুলতে মহানবী (সা.)-এর জীবনঘনিষ্ঠ সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো জেনে নেওয়া দরকার :
এক. গোসল করা ও পবিত্রতা অর্জন করা। মিসওয়াক করা সুন্নাত। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতর ও আজহার দিন গোসল করতেন। (বুখারি, হাদিস : ১/১৩০)
দুই. সুন্দর ও উত্তম পোষাক পরিধান করা।
মুসলমানদের প্রধান দুই ধর্মীয় উৎসব তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন সুন্দর ও সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম পোষাক পরিধান করা সুন্নত। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহিমাল্লাহ বলেন- নবীজি দুই ঈদের দিন সবচেয়ে সুন্দর ও উত্তম জামা পরিধান করতেন। তার একটা বিশেষ জামা ছিলো, যা তিনি দুই ঈদে ও জুমাতে পরিধান করতেন।
হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে— জাফর ইবনু মুহাম্মদ তার পিতা থেকে, তার পিতা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, নবী করিম (সা.) প্রতিটি ঈদে ডোরা-কাটা পোষাক পরিধান করতেন। (সুনানে বায়হাকি, হাদিস : ৬৩৬৩)
তিন. ঈদগাহে যাওয়ার আগে পানাহার না করা।
ঈদুল আজহার দিন পানাহার ব্যতীত ঈদগাহে গমন করা ও নামাজের পর নিজের কুরবানির গোশত দিয়ে প্রথম খাবার গ্রহণ করা সুন্নত। হাদিস শরিফে এসেছে, আল্লাহর রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন কোনো কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যেতেন না। আর ঈদুল আজহার দিন নামাজ না পড়ে কিছু খেতেন না। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৫৪২)
চার. ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবির বলা।
ঈদগাহে যাওয়ার সময় ঈদুল আজহার দিন উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। তাকবির পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে বেশি বেশি স্মরণ করা সুন্নত। পুরুষরা এ তাকবির উঁচু আওয়াজে পাঠ করবে, মেয়েরা নীরবে। এ তাকবির জিলহজ মাসের ৯ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত পাঠ করবে। (ফাতহুল বারি : ২/৫৮৯)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘যাতে তোমরা গণনা পূরণ করো এবং তোমাদের হেদায়াত দান করার দরুণ আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৫)
পাঁচ. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করা। কেউ কেউ তার গাড়ি আছে এটা দেখানোর জন্য বাড়ির কাছে এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় প্রাইভেট কার নিয়ে যায় ঈদের নামাজ পড়তে। এসব লৌকিকতা না করা।
কোনো ধরনের অপারগতা না থাকলে, পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া করা সুন্নত। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন করতেন এবং পায়ে হেঁটে ঈদগাহ থেকে প্রত্যাগমন করতেন। (তিরমিজি, হাদিস : ১২৯৫)
ছয়. ঈদগাহে আসা-যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করা।
ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক রাস্তা দিয়ে গমন করা আর বাড়িতে ফেরার সময় অন্য রাস্তা দিয়ে ফেরা। এটা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সুন্নাত। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.) ঈদের দিন ঈদগাহে আসা-যাওয়ার রাস্তা পরিবর্তন করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৯৮৬)
সাত. ঈদগাহে যেতে শিশুদের সঙ্গে নেওয়া।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) দুই ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার সময় ফজল ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্বাস, আলী, জাফর, হাসান, হোসাইন, উসামা ইবনে জায়েদ, জায়েদ ইবনে হারেসা, আয়মান ইবনে উম্মু আয়মান (রা.)-কে সঙ্গে নিয়ে উচ্চস্বরে তাকবির ও তাহলিল পাঠ করতে করতে বের হতেন। অতঃপর তিনি কামারদের রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে উপস্থিত হতেন এবং প্রত্যাবর্তনের সময় মুচিদের রাস্তা দিয়ে ঘরে আসতেন। (সুনানে কুবরা বায়হাকি, হাদিস : ৬৩৪৯)
আট. ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা।
ঈদের দিন একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাত। জুবাইর ইবনে নুফাইর (রা.) বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজী (সা.)-এর সাহাবায়ে কেরাম ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাৎ হলে বলতেন ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিন কুম’। আল্লাহ আমার এবং আপনার যাবতীয় ভাল কাজ কবুল করুক। (ফাতহুল কাদির, খণ্ড : ০২, পৃষ্ঠা : ৫১৭)
নয়. ঈদের খুতবা শোনা।
ঈদের নামাজ শেষে খুতবা মনোযোগ সহকারে শোনা। আবদুল্লাহ ইবনে সায়িব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে আমি ঈদগাহে উপস্থিত হলাম। এরপর তিনি আমাদের নামাজ পড়িয়েছেন। অতঃপর তিনি বলেন: আমরা নামাজ শেষ করেছি। যার ইচ্ছা সে খুতবা শুনার জন্যে বসবে আর যার চলে যাওয়ার ইচ্ছা সে চলে যাবে।’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ১০৭৩)
দশ. ঈদের নামাজের পর কুরবানি করা।
বারা ইবনে আজিব (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাদের উদ্দেশে খুতবা দিলেন। তাতে বললেন, আমাদের এই দিবসে প্রথম কাজ নামাজ আদায় করা। এরপর কুরবানি করা। সুতরাং যে এভাবে করবে তার কাজ আমাদের তরিকা মতো হবে। আর যে আগেই জবেহ করেছে (তার কাজ তরিকা মতো হয়নি অতএব) তা পরিবারের জন্য প্রস্তুতকৃত গোশত, (আল্লাহর জন্য উৎসর্গিত) কুরবানি নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৬৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯৬১; সহিহ ইবনে হিব্বান : ৫৯০৭)
* অনলাইন থেকে সংগৃহীত।