মো. আব্দুল মান্নান :
মানবসেবামূলক ওয়াকফকৃত একটি দীনী প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহের ফুলপুরের ‘আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলাম’। এ প্রতিষ্ঠানটি আমাদের সকলের। এর মাধ্যমে প্রতি বছর আমরা দীনী বিভিন্ন সেবা পেয়ে আসছি।
এ প্রতিষ্ঠানের নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। ফুলপুরের প্রবীণ দীনদার কিছু সংখ্যক মুরুব্বি প্রতিষ্ঠানটির গোড়া পত্তন করে গেছেন।

জানা যায়, আজ থেকে প্রায় কয়েক যুগ আগে ফুলপুর বাসস্ট্যাণ্ড এলাকায় অজ্ঞাত একটি লাশ পাওয়া যায়। হয়তো কোন ওলীর লাশ হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও ওই লাশের কোন আত্মীয় স্বজন খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে দাফন করার জন্য উদ্যোগী হন তখনকার পরোপকারী মানবিক গণ্যমান্য কিছু ব্যক্তি। তাদের সবার নাম সিরিয়ালি জানা নেই বলে এখানে উল্লেখ করছি না। তারা অবশ্য নামের জন্য এগুলো করেননি। যে কারণে আজও পর্যন্ত আঞ্জুমানের প্রতিষ্ঠাতাদের কোন নেম প্লেট আমাদের চোখে পড়েনি। যাক, উনারা মিলে বর্তমান কাজিয়াকান্দা কামিল মাদরাসা সংলগ্ন স্থানে অজ্ঞাত ওই বুজুর্গকে কবরস্থ করার জন্য কিছু জমি ক্রয় করেন।

এই জমিতে অজ্ঞাত ওই বুজুর্গের লাশ দাফন করা হয়। এর আগে তার দাফনের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় ও অন্যান্য সামগ্রীরও ব্যবস্থা করেন তারা। তারপর মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন ওইসব মুরুব্বিরা যারা কবরস্থান করেছিলেন তারা জায়গাটাকে এমনভাবে ওয়াকফ করেন যাতে ধনীদের লাশও সেখানে দাফন করা যায়। যে কারণে আমরা দেখছি, এ কবরস্থানে অত্র এলাকার বিশিষ্ট ধনীদেরকেও কবরস্থ করা হচ্ছে। ওই কবরস্থানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘আঞ্জুমান কবরস্থান’। এই কবরস্থানকে ঘিরে পরবর্তীতে গড়ে উঠেছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।

তখন তাদের মনে অজ্ঞাত ওই লাশটিকে কেন্দ্র করে যে দরদ বা মহব্বত জন্মেছিল ওই দরদ থেকেই তারা এতিম অসহায় ও গরিবদের জন্য কিছু করে যেতে বা সবসময় তাদের পাশে থাকতে সংকল্পবদ্ধ হন।
আরও নতুন নতুন সেবা দেওয়ার ইচ্ছে জাগ্রত হয়েছিল কবরস্থান প্রতিষ্ঠাতাদের। যে কারণে পরবর্তীতে তারা আরও ক্যাশ ক্যাপিটাল সংগ্রহ করে ফুলপুর বাসস্ট্যাণ্ড এলাকায় ও ব্রিজ এলাকায় বেশ কিছু জমি ক্রয় করেন। সব মিলিয়ে আনুমানিক ৩ একরের কাছাকাছি জায়গা জমি ‘আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলাম’ নামে মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নামে ক্রয় করে যান তারা।

এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন অত্র এলাকার বিশিষ্ট জ্ঞানী গুণী ধনাঢ্য ও সৎ ব্যক্তিরা। সাবেক এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক নেতা, সমাজনেতা, আলেম উলামা, শিক্ষক, সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার গুণী মানুষ ছিলেন কমিটিতে। তাদের সুষ্ঠু পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি ফুলপুরের টপ ক্লাসের একটি মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। ফুলপুর বাসস্ট্যাণ্ডে গড়ে ওঠে অত্যাধুনিক সুবিধা সম্পন্ন সেরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আঞ্জুমান সুপার মার্কেট’। দুইতলা বিশিষ্ট এ মার্কেটে ন্যাশনাল ব্যাংকসহ নানা ধরনের ৪০-এর অধিক উন্নতমানের দোকানপাট রয়েছে। মাশাআল্লাহ ভালভাবে চলছে এসব প্রতিষ্ঠান। তবে হ্যাঁ, যে কোন প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে লাভ লস থাকে। সুনামের নিয়তে কাজ করতে গেলেও অপ্রত্যাশিতভাবে দুর্নামও হয় অনেক সময়। সে রকম কিছু আমার জানা নেই। যতটুকু জানি, তেমন কোন সমস্যার কথা শোনা যায়নি।

বর্তমান যে কমিটি আঞ্জুমান পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন এতে সাবেক এমপি, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ রয়েছেন অনেক গুণীজন। তাদের নেতৃত্বে চলছে মানবসেবামূলক এ প্রতিষ্ঠানটি।
উনারা দায়িত্ব নেওয়ার পর আঞ্জুমান সুপার মার্কেটের উত্তর-পূর্ব পাশে খালি জায়গায় প্রথমে হকার্স মার্কেট পরে নিউ মার্কেট নাম দিয়ে একটি মার্কেট করেছেন। মার্কেটটি মাশাআল্লাহ উন্নতির দিকেই আছে।

এর আগের কমিটি আঞ্জুমানের সরাসরি পেছনে বিশাল জায়গায় আরও জাঁকজমকপূর্ণ মার্কেট করার পরিকল্পনা নিয়ে অনেকের নিকট থেকে এডভান্স টাকা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। নিচতলার ছাদ করতে যতটুকু লাগে ততটুকু পিলার করা হয়েছিল। এরপর অজ্ঞাত কারণে বেশ কয়েক বছর যাবৎ কাজ বন্ধ রয়েছে। ওখানে দোকান করার বা ব্যবসা করার আশায় যারা টাকা দিয়েছিলেন তারা কখন কত বছর পর সেখানে দোকান পাবেন তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছেন না।

আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলামের প্রায় ২ একর জমি রয়েছে ব্রিজ সংলগ্ন বাসস্ট্যাণ্ড এলাকায়। ওই জায়গাটা নিয়ে মামলা ছিল। ফুলপুর পৌরসভাও এর দাবিদার ছিল। এ বিষয়ে এখনো মামলা চলমান। পরবর্তীতে আঞ্জুমানের বর্তমান কমিটি ওই জায়গাটিকে দখলে নেওয়ার লক্ষ্যে ও কিছু ব্যবসায়ী চিন্তা ভাবনায় সেখানে অনেক টাকা খরচ করে মাটি ভরাট করান। মাটি ভরাট করানোর পর টিন দিয়ে চালাঘর করে আনুমানিক ২০ টি দোকান করা হয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, রান করেনি এসব দোকান। এর রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বশীল কোন লোকও মনে হয় নেই। ফলে এসব দোকান এখন বাসস্ট্যাণ্ড ব্যবসায়ী ও পথচারীদের পেশাবখানায় পরিণত হয়েছে। কেউ কেউ ওখানে ময়লা আবর্জনা নিয়ে ফেলছেন। এতে একটি বিশ্রী পরিবেশের অবতারণা হয়েছে আঞ্জুমানের ব্রিজ সংলগ্ন জায়গায়।

লাখ লাখ টাকা খরচ করে যে মাটি ভরাট করানো হয়েছিল তাও প্রতি বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে খড়িয়া নদীতে। সংরক্ষণের উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। বিষয়টির প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলামের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতঃ সাধারণ মানুষের মাঝে এর সেবা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়াও প্রয়োজন বলে মনে করেন সুধীমহল। শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণ, গরমকালে পাখা বিতরণ, ঠাণ্ডা পানি, শরবত সাপ্লাই, বৃক্ষ রোপণ, গরিবের মেয়ে বিয়ে দেওয়ায় সহযোগিতা, এতিম ও মেধাবী শিশুদের পড়ালেখার খরচ যোগানো, তাদের মাঝে ঈদবস্ত্র বা খাবার বিতরণসহ নেওয়া যেতে পারে নানা উদ্যোগ।
আমি এ ব্যাপারে নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানসহ আঞ্জুমানে হেমায়েতে ইসলাম পরিচালনা কমিটির নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।