মো. আব্দুল মান্নান :
ময়মনসিংহে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কোতোয়ালি থানা পুলিশের অভিযানে লোমহর্ষক বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর মস্তক বিচ্ছিন্নকৃত ৪ খণ্ড লাশের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং লাশের পরিচয় সনাক্ত ও অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রথমে ঢাকা থেকে প্রধান আসামির শ্যালক ফারুককে গ্রেফতার করা হয় ও পরে তার নিকট থেকে তথ্য নিয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া এলাকা থেকে প্রধান আসামি অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য ইলিয়াছ আলীকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া খুনের কাজে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার জব্দ এবং কারের চালক আব্দুল হান্নানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতিতে মঙ্গলবার (৪ জুন) ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার মাছুম আহাম্মদ ভূঞা এক ব্রিফিং দিয়েছেন।
তিনি জানান, ২ জুন সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে কোতোয়ালি মডেল থানার মনতলাস্থ সুতিয়াখালী নদীর ব্রীজের নিচে পানিতে ভাসমান অবস্থায় একটি লাগেজ ও এর পাশে স্থলভাগে একজন মানুষের মাথা দেখতে পাওয়া যায়। পরে স্থানীয়রা থানা পুলিশকে সংবাদ দেয়। সংবাদ পেয়ে থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। এরপর সেখান থেকে মানুষের একটি মাথা ও পাশেই পানিতে ভাসমান একটি লাগেজ উদ্ধার করা হয়। লাগেজ খুললে যা চোখে পড়েছিল তা ছিল আঁতকে উঠার মত লোমহর্ষক একটি দৃশ্য! ওখানে একজন পুরুষ মানুষকে ৪ টুকরো করা অংশগুলো পাওয়া যায়।

এসময় শুধু থানা পুলিশ নয় বরং থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশের অন্যান্য বিশেষায়িত ইউনিট তথা পিবিআই ও সিআইডি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং লাশের পরিচয় সনাক্তের চেষ্টা করেন। কিন্তু তাৎক্ষণিক লাশের পরিচয় সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে লাশের পরিচয় সনাক্তের জন্য বিভিন্ন ইলেট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ জেলা পুলিশের অফিসিয়াল ফেইসবুকে সংবাদ পোস্ট করা হয়। ঘটনাস্থলে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতসহ আনুষাঙ্গিক অন্যান্য কার্যাদি সম্পন্ন করা হয়। এরপর লাশের ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ মর্গে উপস্থিত হয়ে ভিকটিমের মুখমন্ডল, পরনের কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে পরিচয় সনাক্ত করেন। সনাক্তকৃতদের পরিচয় থেকে জানা যায়, ভিকটিমের নাম ওমর ফারুক সৌরভ (২৪)। সৌরভ ঢাকার প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার পিতার নাম মোঃ ইউসুফ আলী ও মাতার নাম মাহমুদা আক্তার পারুল। স্থায়ী ঠিকানা ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার তারাটি গ্রামে। তবে বর্তমানে তারা ঢাকার মতিঝিল থানার পোষ্টার কলোনী এলাকায় বসবাস করেন। এ পরিচয় সনাক্তের পর ভিকটিমের পিতা ইউসুফ আলী বাদি হয়ে কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা রুজু করা হয়। মামলা দায়েরের পর ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি পুলিশের একটি চৌকস টিম এ ঘটনার রহস্য উন্মোচন ও আসামি গ্রেফতারের জন্য মাঠে নামেন।

তথ্য প্রযুুক্তি ও নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে এ হত্যাকাণ্ডের মূল হত্যাকারী ইলিয়াছ আলী (৫৫)সহ আহাদুজ্জামান ফারুক (৩০) ও চালক আব্দুল হান্নান আকন্দ (৬৫)কে গ্রেফতার করা হয়। ইলিয়াছ আলী ঈশ্বরগঞ্জের তারাটি গ্রামের মৃত হাসেম আলীর পুত্র। তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার গোহাইলকান্দি (প্রাইমারী স্কুল সংলগ্ন) এলাকায় বসবাস করেন। আর ফারুক ঈশ্বরগঞ্জের চর হোসেনপুর এলাকার মৃত আক্তারুজ্জামান ও মাহবুবা বেগম রিনার পুত্র। এছাড়া লাশ বহনকারী গাড়ির চালক আব্দুল হান্নান আকন্দ নান্দাইলের চান্দুরা বিরাজ প্রফেসরের বাড়ি সংলগ্ন মৃত মীর হোসেন আকন্দ ও মৃত আছিয়া খাতুনের পুত্র। তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহের বলাশপুর এলাকায় হাক্কানী পশ্চিম মসজিদের মোড় আব্দুল হান্নানের বাসার ভাড়াটিয়া। গ্রেফতারকৃত এসব আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ইলিয়াছ ও ভিকটিম ওমর ফারুক সৌরভ পরস্পর আপন চাচা ভাতিজা। আসামি ইলিয়াছের মেয়ে ইভা আক্তারকে ভিকটিম ওমর ফারুক সৌরভ গোপনে বিবাহ করেন। ইভার সৌরভের সাথে বিবাহের পূর্বে প্রায় ৩ বছর আগে অন্যত্র আব্রাহাম নামে কানাডায় স্টুডেন্ট ভিসায় প্রবাসী একজনের সাথে বিবাহ হয়েছিল। বিষয়টি পরবর্তীতে ইভার বাবা মা জানলে ইভার প্রতি এতটা রাগ না হয়ে বিশেষ করে সৌরভের প্রতি চরম ক্ষীপ্ত হন এবং এ বিবাহ কোনক্রমেই তারা মেনে নিবেন না বলে জানান। এ ঘটনা নিয়ে ইলিয়াছের আপন ভাই ভিকটিমের বাবা ইউসুফের সাথে তাদের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। দুইজনের মধ্যে বাক বিতণ্ডা হয় এবং ওমর ফারুক সৌরভকে মেরে ফেলার হুমকি দেন ইলিয়াছ। এদিকে, আসামি ইলিয়াছ তার কন্যা ইভাকে মে মাসের মাঝামাঝি পড়াশুনার জন্য কানাডায় পাঠিয়ে দেন। এরপর ঘটনাক্রমে ২ জুন বিকালে ভিকটিম ওমর ফারুক সৌরভ ময়মনসিংহে আসেন এবং চাচাতো ভাই মৃদুল (১৭) অর্থাৎ আসামি ইলিয়াছের ছেলেকে ফোন দেন। এরপর মৃদুল সৌরভকে তাদের গোহাইলকান্দির বাসায় আসতে বলে। সৌরভ বিনা দ্বিধায় বাসায় গেলে চাচা ইলিয়াছ বাসার নিচ তলায় তাকে একটি ভাড়া করা কক্ষে নিয়ে হাত পা বাঁধে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ইলিয়াছের শ্যালক আহাদুজ্জামান ফারুককে ফোন করে বাসায় ডেকে নিয়ে আসে এবং এক পর্যায়ে দুজন মিলে সৌরভকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে মাথায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে লাশ বাথরুমে রাখে। এরপর লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা মাফিক ময়মনসিংহ গাঙ্গিনারপাড় হতে ট্রলি ব্যাগ (লাগেজ), পলিথিন ও হ্যান্ডগ্লাভস কিনে বাসায় নিয়ে যায়। বাথরুমে রাখা সৌরভের মৃত দেহের শরীর হতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা এবং দুই পায়ের ঊরু বিচ্ছিন্ন করে পলিথিনে প্যাকেট করে লাগেজের মধ্যে রাখে। মাথাটি স্বচ্ছ পলিথিনে মুড়িয়ে একটি শপিং ব্যাগে রাখে। ২ জুন রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার সময় লাগেজ ও শপিং ব্যাগে রাখা মৃতদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে আসামি ইলিয়াছ আলী ও আহাদুজ্জামান ফারুক একটি প্রাইভেটকার ভাড়া করে। পরে প্রাইভেটকারে করে সৌরভের লাশ কোতোয়ালি মডেল থানার মনতলা ব্রিজের উপর হতে সুতিয়াখালী নদীতে ফেলে দেয়। পুলিশ সুপারের প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।