মো. আব্দুল মান্নান :
হাফেজ মাওলানা মুফতী আরিফ বিন মুফীজ। আমার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম একজন। সে শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফীজুদ্দীন দামাত বারাকাতুহুমের ছোট ছেলে। তার আব্বা জামিয়া ইসলামিয়া মোমেনশাহী-এর শায়খুল হাদীস ছিলেন। এছাড়া মাশরিকী জুট মিলস জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব ছিলেন। ওখান থেকে এসে শিকারীকান্দা মাদরাসার শায়খুল হাদীস হিসেবে খেদমত শুরু করেন। ময়মনসিংহ শহরে তাদের বাসা। স্থায়ী ঠিকানা গফরগাঁওয়ের রসুলপুরে।
তার ভাই হাফেজ মাওলানা বশির উদ্দিন আমাদের ফুলপুর বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব হাফেজ মাওলানা মাইন উদ্দিন হুজুরের মেয়ের জামাই।
বশিরের ছোটজন হাফেজ মাওলানা শরীফও আমার ছাত্র। শরীফ বর্তমানে দারুল কুরআন ইসলামিয়া মাদরাসা, মৈনারটেক, উত্তরখানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শরীফের বড়জন হাফেজ নাসির উদ্দিন ময়মনসিংহ কাচারী মসজিদ মাদরাসায় হিফজ বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ওই মাদরাসার নাজিমে তালীমাত হাফেজ মাওলানা মুফতী তানভীর আহমাদ আমার ছাত্র। আরিফের ভাগ্নে ঢাকা গুলশানের মাহমূদ, সাঈদ, সালিম ও রায়হান ওরা সবাই আলহামদুলিল্লাহ আমার নিকট পড়েছে। আরিফের বড়ভাই ফরিদ উদ্দিন তিনি কুয়েতে থাকেন। উনার ছেলে ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ইউসুফ এবং ভাগ্নে আব্দুল্লাহও আমাদের ছাত্র।
যাদের নাম বললাম এরা প্রত্যেকেই একেকজন তারকা আলেম। বেফাকের স্ট্যান্ড করা ছাত্র। আরিফের আব্বু শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফীজুদ্দীন দামাত বারাকাতুহুম উনার ছাত্র জীবনে কোনদিন দ্বিতীয় হননি। করাচীতে আল্লামা ইউসুফ বিন্নূরীর নিকট তিনি পড়েছেন। উনার সাথেও আমার খেদমত করার তাওফীক হয়েছে। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে ধরা পড়ে তিনি আল্লাহ তায়ালার একজন কাছের মানুষ। ওলী। আর যার কথা বলছি অর্থাৎ হাফেজ মাওলানা আরিফ সে অনেক আগেই ছোট বেলায়ই প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে স্বপ্নে দেখেছে।
তাকে একেবারে বলতে গেলে শিশু শ্রেণি থেকে পড়ানোর সৌভাগ্য হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে মাশরিকী জুট মিলস হাফিজিয়া মাদরাসায়। ওখানে হিফজের পাশাপাশি ইংলিশ মিডিয়ামের ডেস্ক ওয়ার্ক, ফান্ডামেন্টাল ইংলিশ, দ্য রেডিয়েন্ট ওয়ে, অ্যাক্টিভ ইংলিশ, জুনিয়র ইংলিশ ইত্যাদি অনেক ইংলিশ বই পড়ানো হতো। এরা শুধু আরবিতে নয় বরং বাংলা ইংলিশেও অনেক দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করেছে।
একবার ক্লাস টেস্ট চলাকালীন আরিফ কাঁদতেছিল। সে আস্তে লিখতো এবং অত্যন্ত চমৎকার করে লিখতো। যখন ঘোষণা দেওয়া হলো যে, আর ১০ মিনিট বাকি আছে। তাড়াতাড়ি শেষ কর। এরপর আর সময় দেওয়া হবে না। সবাই খাতা রিভিশন দাও। তখন এগুলো শুনে সে কান্নাকাটি শুরু করে। ওর চোখের পানিতে খাতা ভিজে যাচ্ছিল। বার বার জিজ্ঞাসা করার পর জানা যায়, তার তখনো ২০ নাম্বারের উত্তর লেখা বাকি। এজন্য সে কাঁদছে। আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রচন্ড। পড়ার জন্য তাদেরকে কখনো চাপ দিতে হয়নি। ওরা বরং আমাদের নিকট থেকে ক্লাস আদায় করে নিতো।
আরেকবার মাদরাসা ছুটি হলে বাসায় যায় আরিফ। নোটিশে আমরা লিখে দিয়েছি যে, প্রতিদিন সকাল বিকাল কমপক্ষে ১ পারা করে ২ পারা তিলাওয়াত করতে হবে। এছাড়া হাতের লেখা ও অন্যান্য হোমওয়ার্ক দেওয়া হয়েছিল। হোমওয়ার্ক করার সময় বা তিলাওয়াত করার সময় ওর ছোট বোন তামান্না বার বার তার কুরআন শরীফের পাতা উল্টিয়ে ফেলতো। তিলাওয়াতে ডিস্টার্ব করতো। পরে কেঁদে দিয়ে আরিফ তার আব্বুকে বলে যে, আব্বু, আমি আর বাসায় থাকবো না। মাদরাসায় চলে যাবো। এখানে থাকলে পড়ন যায় না। তামান্না আপু আমাকে তিলাওয়াত করতে দেয় না। বার বার আমার কুরআন শরীফের পাতা উল্টিয়ে ফেলে। পরে তার আব্বু তাকে সান্ত্বনা দেন। পরদিন খুশি প্রকাশ করে তার আব্বু আমাকে বললেন যে, আপনার ছাত্রের এই অবস্থা। পড়া ছাড়া সে আর কিচ্ছু বুঝে না।
আরিফ ছোট বেলায়ই ওলী হয়ে গেছে। নাশতার ছুটি হলে খানা রেডি করার আগ পর্যন্ত বা ঘুমানোর ছুটি হলে খাদেমরা বিছানা বিছিয়ে মশারী টানিয়ে রেডি করার আগ পর্যন্ত আমি টুকটাক ‘বড়দের ছোটবেলা’ বিষয়ে আলোচনা করতাম। পড়ালেখার পাশাপাশি সুন্নাতি আমলের প্রতি উৎসাহিত করতাম। অনেকেই আলোচনা শুনলেও অনেকেই কিন্তু এর উপর আমল করতো না। তবে আরিফ ছিল ব্যতিক্রম। তার ভাগ্নে সাঈদও একদম ব্যতিক্রম ছিল। ওরা অত্যন্ত প্রখর মেধাবী ও আমলদার উস্তাদভক্ত ছাত্র ছিল। ভুলতে পারবো না কখনো তাদেরকে। যা বলতাম তাই মনে রাখতো এবং সেভাবে আমলের চেষ্টা করতো। দেখা গেছে, আরিফ এমনভাবে অজু করতো যে কোন পানি অপচয় করতো না। এক সোল পানি হাতে নিয়ে টেপ বন্ধ করে দিতো। এটা ব্যবহার করা শেষ হলে পুনরায় টেপ ছেড়ে আরেক সোল পানি হাতে নিতো। পানি অপচয় না করে এভাবে সে অজু করতো।
ওদের আমল আখলাক দেখলে যে কেউ মুগ্ধ হবে। দীর্ঘদিন পড়ানোর কারণে ওদের সাথে আমার একটা আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ওদেরকে সময় দিতাম, আদর করতাম বলে ওরাও আমাকে শুধু উস্তাদ নয় বরং পিতার মত সম্মান করতো, মর্যাদা দিতো। আরিফের ভাগ্নে সাঈদ তো আজও আব্বু ছাড়া সম্বোধন করে না। যখন সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করে ‘আব্বু, তুমি কেমন আছ? আম্মু কি করেন? এক এক করে পরিবারের সবার খবর নেয়। তখন মনে চায় কলিজা কেটে ওদের দিয়ে দেই। হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে ওদের ভালবাসি। যাক, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জাযায়ে খায়ের দান করুক।
আজ বুধবার (২২ মে) সাংবাদিক সেলিম রানা এসে ডাক দিলে বাসা থেকে নিচে নামি। শেরপুর রোড মোড়ে রাজিন প্লাজার সামনে বিল্লাল ভাইয়ের দোকানে বসে চা পান করছিলাম আর সেলিম রানার একটা নিউজ এডিট করছিলাম। এসময় আমাদের পাশের টিউবওয়েল থেকে দুজন ছাত্র বোতল দিয়ে পানি নিতে আসে। বিষয়টি নজর কাড়ে।
পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারলাম তারা ময়মনসিংহ থেকে এসেছেন এবং দ্বারাকপুর যাচ্ছেন তাদের ছাত্র ভাইয়ের অসুস্থ বাবাকে দেখতে। সাথে কে আছেন? মাদরাসার নাম কি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করতেই ভেসে আসে প্রিয় ছাত্র আরিফের নাম। বললাম, তাকে আসতে বল। পরে সে গাড়ি থেকে নেমে আসে।
ওকে পেয়ে কী যে খুশি হয়েছিলাম তা বুঝাতে পারবো না। প্রায় ২০ বছর পর দেখা। মুসাফাহা মুয়ানাকা হলো। একজন ওলীর সাথে মুহূর্ত সময় কাটানো একশ বছর নফল ইবাদতের চেয়েও উত্তম। সে রকম আনন্দই যেন পেয়েছি। যাক, কথাবার্তার এক পর্যায়ে ওকে বিদায় দিলাম। বিদায় দিয়ে সেলিম রানার সাথে কথা বলছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আবারও আরিফ আসে। হাতে হাদিয়া। বাসস্ট্যান্ড থেকে নিয়ে এসেছে। দামি আতর, তাসবীহ, মিসওয়াক, কলম ইত্যাদি।
২০০৫-এর পর আজই মনে হয় আরিফের সাথে প্রথম দেখা হয়েছে। সে বর্তমানে ময়মনসিংহের দিগারকান্দায় দারুল হুদা আল ইসলামিয়া, বাংলাদেশ-এ শিক্ষকতা করছে। দোয়া করি, আল্লাহ তায়ালা তাকে ও তার পরিবারের সবাইকে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ দান করুক।