মুনিরুস সালেহীন :
কয়েক দিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রধান শিরোনাম ছিল “ভয়ংকর এপ্রিল”। তীব্র দাবদাহ যখন বয়ে যাচ্ছে সারা দেশ জুড়ে, যখন জারি হয়েছে হিট এলার্ট, সেই সময়টা আসলেই ভয়ংকর। টিএস এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যাণ্ডের সূচনা লাইন- এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ- পড়লে মনে হয় কবি বোধহয় আমাদের এই এপ্রিলের কথাই বলেছেন! (কবিতার পাঠকরা ভাল করেই জানেন, ইংরেজ কবি পরিহাস করেই এপ্রিলকে “নিষ্ঠুরতম মাস” বলেছেন। প্রকৃতপক্ষে, এপ্রিল হচ্ছে ইংল্যান্ডের স্প্রিং বা বসন্ত যখন প্রকৃতি সবুজ হয়ে ওঠে, ভরে ওঠে ফুল, ফল আর সৌরভে। এই সময়টি কী করে “নিষ্ঠুরতম” হয়? হয়, পোড়োজমির বাসিন্দার কাছে, যেমন পূর্ণিমার চাঁদকেও কখনো মনে হয় ঝলসানো রুটি!)
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের এপ্রিল মাসের সাথে মিলিয়ে বঙ্গাব্দের চৈত্র- বৈশাখ। বিশেষ করে বৈশাখের দুই বৈপরীত্য- ধ্বংস ও সৃষ্টি – পাশাপাশি এসেছে বাংলা কবিতায়। চার শতক আগে কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বৈশাখের দাবদাহ আর প্রাকৃতিক বিক্ষুব্ধতার আলেখ্য তুলে ধরেছেন এভাবে: ‘বৈশাখে অনলসম বসন্তের খরা/তরুতল নাহি মোর করিকে পসরা।’ বৈশাখের এই ক্রুরতার পাশাপাশি তার নবসৃষ্টির বন্দনা মোটেই কম নেই। রবি ঠাকুর এই বৈশাখ মাসেই “মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা,/অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা” র প্রার্থনা করেছেন; জাতীয় কবি নজরুল তো কাল বৈশাখের ঝড়েই দেখেছেন ‘নতুনের কেতন’।
কিন্তু এপ্রিলের ক্রুরতা নিয়ে ইংরেজ কবিদের খুব কম কবিতাই আছে। বন্দনাই আছে বেশি।
যাক, কবিতার কচকচানি থাকুক। এবার যে এপ্রিলকে আমরা দেখছি তা সত্যিই ভয়ংকর। এই নিষ্ঠুরতা অবশ্য বাহ্যিক। প্রকৃতির বাহ্যিক রূপে। অন্তর্গত বা মনস্তাত্ত্বিক যে নিষ্ঠুরতার কথা কবি বলেন তার উপলব্ধি সবার সমান না। নিজের কথা বলি- এপ্রিল মাস এখন পর্যন্ত আমার কাছে হাজির হয়েছে তার দ্বৈততা নিয়ে। এপ্রিলের নিষ্ঠুরতার ছোবল যেমন খেয়েছি, তেমনি উল্লসিত হয়েছি তার উদার উপহারেও।
জগতের রহস্যের কতটুকুই বা জানি! এসব রহস্যকে কাকতালীয় বলে উড়িয়েও দিতে পারেন অতি যুক্তিবাদীরা। এমন তো অনেক সময়ই দেখা যায়- কারুর জীবনে স্মরণীয় কত কিছুই ঘটছে কোনো বিশেষ দিন বা তারিখ বা বিশেষ কোনো মাসে। এখন পর্যন্ত আমার জীবনে এমনি একটি মাস এপ্রিল। এ মাস আমার জীবনে কাইন্ডনেস আর ক্রুয়েলটির এক অভূতপূর্ব সমন্বয়।
এপ্রিলের কাইন্ডনেসের কথাটাই আগে বলি।
জীবনের প্রথম চাকরি- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছিলাম এপ্রিলে। ১৯৮৯ সালের পহেলা এপ্রিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন ছুটি ছিল। ক্লাস বন্ধ। তারপরও কেন জানি কর্তৃপক্ষ ওই সময়েই নিয়োগ দিয়েছিলেন আমিসহ আরো চারজন লেকচারারকে। গুগল করে বের করলাম সে বছরের রমজানের প্রায় পুরোটাই ছিল এপ্রিলে। তার মানে জীবনের প্রথম চাকুরির প্রথম বেতনের সাথে ঈদের বোনাসও পেয়েছিলাম।
চাকরি জীবনে অন্তত দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রমোশন পেয়েছি এই এপ্রিল মাসে।
প্রথমটি পেয়েছি যুগ্ম সচিব হিসেবে। ২০১৫ তে।
আর অপরটি সচিব হিসেবে, ২০২০ এ। মহামারী করোনার প্রারম্ভিক সময়ে। লক ডাউনের জন্য গৃহবন্দী জীবন। সে সময় একটা পোস্টে ব্যক্ত করেছিলাম এমন অনুভূতি :
“”অচেনা বৈশাখ । ভাবিনি কখনো দেখতে হবে এমন পহেলা বৈশাখ। কেউই ভাবেনি। কানে বাজে কোন সুদূরের ঢোলের শব্দ। বৈশাখী মেলার। মনে হয়, আসলেই কী তেমন সময় ছিল! সেই সময়, না এই সময়, এই অমারজনীর পথে দীর্ঘ হাটা- কোনটা বেশি অলীক!….
ঘরে বসে। জানালায় চোখ। বাইরের ফাঁকা খেলার মাঠ। শুন্য রাজপথ। ঘরে খবরের হরেক উৎস। করোনার বিস্তার। আরো মৃত্যু। মেঘাচ্ছন্ন মন।”
তারপর মেঘের কোলে রোদ হাসার মতো এসেছিল সচিব হিসেবে পদোন্নতির খবর। ৩০ এপ্রিল ২০২০। এবারের ৩০ এপ্রিল পূর্ণ হলো আমার সচিব হওয়ার চার বছর। আলহামদুলিল্লাহ।
জীবনের অবিস্মরণীয় আরেক ঘটনা- সেটিও ঘটেছে এই এপ্রিলেই। আমার বিয়ে। ফেবু বন্ধুদের কয়েক দিন আগেই বলেছি তার কথা।
এখন পর্যন্ত জীবনের পথপরিক্রমায় সবচেয়ে কষ্টের ঘটনার কথা ভাবলে মনে হয়- কবির কথাই ঠিক। আমাদের মাকে হারানোর মাস এই এপ্রিল- নিষ্ঠুরতম মাস নয় তো কী!
এ মাসেই হারিয়েছি আমাদের এক ভাইকে। সেই করোনাসময়ে, ২০২১ এ।
পত্রিকার পাতায়, অন্যান্য গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এপ্রিলের দাবদাহ নিয়ে বিস্তর আলোচনার সুবাদেই মনে পড়লো নিজের ব্যক্তিগত এপ্রিলকে।
উড়ে যাওয়া পাখি কখনো ফেলে যায় তার পালক। সময় বয়ে যায়, কেটে যায় কিংবা উড়ে যায়- কিন্তু সবসময়ই সময় রেখে যায় তার ছায়া। মনের পর্দার ভাজ সরালেই দেখা যায় তাকে। কখনো কোমল পেলব সবুজ সময়, কখনো রৌদ্রকঠিন। এপ্রিল বা যে কোন মাস, কাল মহাকাল জড়িয়ে থাকে জীবনে একটি চরিত্র হিসেবে, ছায়াসঙ্গীর মতো। আনন্দ-বেদনার এক অনিবার্য সঙ্গী হয়ে।
প্রকৃতির সাময়িক বিরূপতা কেটে যাবে। প্রকৃতির নিয়মেই। তারপরও প্রকৃতির রুদ্র সময় কারুর জন্য হবে নববসন্তের ছোয়ায় উদ্ভাসিত, আবার প্রকৃতির বসন্ত সময়ও কারুর জন্য হয়তো হবে গ্রীস্মের নিদাঘ দুপুর- আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায়, আমাদের অন্তর্গত বাস্তবতায়।
প্রার্থনা করি এপ্রিল, মে, জুন কিংবা যে কোন মাস যে কোনো সময় সুন্দর হোক সবার জীবনে। এই শুভকামনার ভিত্তি আরো মজবুত হয় যখন পড়ি পবিত্র কোরআনের বরাভয়- “ফা ইন্না মা’আল উসরি উসরা/ ইন্না মা’আল উসরি।” (নিশ্চয় কষ্টের পর স্বস্তি রয়েছে/ নিশ্চয় কষ্টের পর স্বস্তি রয়েছে।)
লেখক : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব।
* অনলাইন থেকে সংগৃহীত।