আজ
|| ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ২১শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
ব্যক্তি আক্রোশকে কেন্দ্র করে বালিয়া মাদরাসাকে খাট করা হচ্ছে, প্রয়োজন দ্বন্দ্ব নিরসন
প্রকাশের তারিখঃ ৩০ এপ্রিল, ২০২৪
মো. আব্দুল মান্নান :
ব্যক্তি আক্রোশকে কেন্দ্র করে শত বছরের পুরনো ময়মনসিংহের ফুলপুরসহ পুরো বিভাগের গর্ব ঐতিহ্যবাহী ক্বওমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়া'কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাট করা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে এমন সব মানহানিকর স্ট্যাটাস ও ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে যে কারণে অভিভাবকরা এতে শিক্ষার্থী দিতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। রমজানের পর ভর্তির সময় অতিক্রান্ত হলেও ভর্তি হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থী। অভিভাবকরা মনে করছেন এখানে আল্লাহওয়ালা মুখলিস ও আদর্শ শিক্ষকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যেসব শিক্ষক গীবত শেকায়েতে লিপ্ত একে অপরের দোষ চর্চায় ব্যস্ত তারা আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কি শিখাবেন?
ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যেসব প্রপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে এতে শুধু প্রতিষ্ঠানটি নিজে বা এর কার্যকরী কমিটির সাথে জড়িত কয়েকজন লজ্জিত হচ্ছেন তা নয় বরং ফুলপুরসহ পুরো ময়মনসিংহবাসী যারা এ প্রতিষ্ঠানকে ভালবাসেন মহব্বত করেন তারা সবাই যেন লজ্জিত ও অপমানিত বোধ করছেন।
বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মুহতামিম একটু চালু বেশি। তিনি কিতাবে যেমন পাকা বা দক্ষ তেমনই ক্লাসও করতে পারেন জমিয়ে, কথাবার্তায় সন্তুষ্ট করতে পারেন যে কোন মানুষকে, ওয়াজ নসীহতের মাঠেও রয়েছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা আর উপস্থাপনায় ও কালেকশনে বলতে গেলে অন্ততঃ বালিয়া মাদরাসায় তার সমকক্ষ কেউ নেই। এতসব গুণের অধিকারী মানুষটির কিছু দোষ ত্রুটি থাকা বিচিত্র ব্যাপার নয়। মানুষ হিসেবে থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে তার সবচেয়ে বড় দোষ হলো, তিনি একাই কেন এত কাজ করেন? তার এসব গুণকে কেউ কেউ নেগেটিভ হিসেবে নিচ্ছেন। ফলে তাকে সহ্য করতে পারছে না একটি মহল। কারণে অকারণে তার সামান্য ত্রুটিকে বড় করে ছড়ানো হচ্ছে। উনাকে ছোট করতে গিয়ে বদনাম হয়ে যাচ্ছে মাদরাসার ও কার্যকরী কমিটিরও। তবে বৃহৎ এ প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী কমিটির দৃষ্টিতে তিনি অত্যন্ত যোগ্য, দক্ষ ও অভিজ্ঞ। এ প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে এরকম ডায়নামিক মুহতামিমেরই দরকার। উনার বিকল্প নেই। যে কারণে তারা পুনরায় ৫ বছরের জন্য তাকে মুহতামিম নির্বাচিত করেছেন।
কেননা, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়ার বর্তমান মুহতামিম মাওলানা ওয়াইজ উদ্দিন দামাত বারাকাতুহুম ২০২০ সনের ১৬ ডিসেম্বর দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রচুর উন্নয়ন করেছেন। বলতে গেলে উপজেলার অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে এত উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়নি। জামিয়ার শিক্ষার্থীদের তালীম তরবিয়তের পাশাপাশি উন্নয়নমূলক যে অবদান তিনি রেখেছেন তা নিঃসন্দেহে স্মরণযোগ্য। অতীতকালের উলামা মাশায়েখের শ্রম ও ঘামের ফসল এই দ্বীনী মার্কাজ। বর্তমান মুহতামিম এ পদে আসার পূর্বেও শায়খে বালিয়া আল্লামা গিয়াছ উদ্দিন পাঠান (রহ.)কে সামনে রেখে অনেক উন্নয়ন করেছেন। তিনি মাদরাসার উত্তর পাশের ১৯০ ফুট লম্বা তিনতলা ভবনটির অর্ধেক অর্থাৎ ৯৫×২৮ ফুট ভবনের আর্থিক যোগান একজনের নিকট থেকে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই ডোনারের নাম লায়ন দেলোয়ার হোসেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি মৎস্যজীবী লীগের আহ্বায়ক। এছাড়া শায়খে বালিয়া (রহ.)-এর পরামর্শে ভবনের সকল কাজ সমাপ্তির ব্যাপারে তত্ত্বাবধান তারই ছিল। এমনকি জামিয়ার সুবিশাল জামে মসজিদের ফাউন্ডেশন শুরু হয়েছিল ময়মনসিংহের শিল্পপতি নূর হোসেন সাহেবের অর্থায়নে। তার সাথে যোগাযোগ ও তাকে বালিয়ায় নিয়ে আসার কাজটিও বালিয়ার বর্তমান এই মুহতামিমই করেছিলেন।
তিনি মাদরাসার উত্তরের ভবনের সামনের বিশাল অজুখানাটি পীর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর পরামর্শে নিজ অর্থায়নেই করে দিয়েছিলেন। দলমত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গেই তার রয়েছে সুসম্পর্ক। আর এসব প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে মানুষের সাথে সুসম্পর্কের কোন বিকল্প নেই।
জানা যায়, সাবেক সমাজকল্যাণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী বর্তমান সংসদ সদস্য শরীফ আহমেদের সাথেও তার রয়েছে অত্যন্ত আন্তরিক সম্পর্ক। বর্তমান মুহতামিম মাওলানা ওয়াইজ উদ্দিন এই এমপি মহোদয়ের অনুদানেই বালিয়ার জামে মসজিদের দ্বিতীয় তলার সম্পূর্ণ টাইলস এবং এস এস দ্বারা সিঁড়ির কাজ সমাপ্ত করিয়েছিলেন। এতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৮ লক্ষ টাকা। এছাড়া বর্তমান মুহতামিম হুজুর এমপি শরীফ আহমেদের অনুদানে ভাষা সৈনিক এম শামসুল হক ভবন নামে ৪ তলা ফাউন্ডেশনে ১৫০×৩৪ ফুট বিশিষ্ট বিশাল একটি ভবন মঞ্জুর করিয়েছিলেন। ৭৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ইতোমধ্যে ওই ভবনের নিচ তলার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
জামিয়ার মহিলা শাখার ঘরগুলো যখন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল তখন তিনি কমিটির পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সহযোগিতায় ৩ তলা ভবন নির্মাণ করেন এবং পূর্ব পার্শ্বে ১৩০ ফুট লম্বা টিন শেড ঘরটি পুনঃ নির্মাণ করেন। ছাত্রীদের সুবিধার্থে ভেতরে ১২টি এটাচড বাথরুমসহ গোসলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা হয়। এতে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া এই মুহতামিমের মাধ্যমে মন্ত্রী মহোদয়ের অনুদানে প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে মাদরাসার বার্ষিক বড় সভার সুবিধার্থে সামনের পরিত্যক্ত বিশাল পুকুরটি ভরাট করা হয় এবং ছাত্রদের অজু গোসলের প্রয়োজনে উত্তর পূর্ব কোণে ১০০×১২০ ফুট একটি পুকুরের ব্যবস্থা করা হয়।
জানা যায়, বিগত বড় সভার আগে মঞ্চের অসম্পন্ন কাজ তিনি সমাপ্ত করেন এবং জামিয়ার শিক্ষা অফিস, ইহতিমাম অফিস, হিসাব বিভাগ ও কুতুব খানাগুলোকে সুন্দর ও মান সম্পন্ন করেছেন। মাদরাসার পেছনে উপজেলার অর্থায়নে প্রায় ২২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে অজু গোসলের ব্যবস্থাসহ অত্যন্ত সুন্দর করে টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো বর্তমান মুহতামিম মাওলানা ওয়াইজ উদ্দিন সাহেবের বিশেষ অবদান।
জানা যায়, 'শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয় না' এ ধরনের একটি অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়ার মুহতামিম মাওলানা ওয়াইজ উদ্দিন বলেন,
তথ্যটা সত্য নয়। কারণ, গত ২০২৩ -এর জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সনের জানুয়ারি পর্যন্ত শিক্ষকরা মোট ৭২ লক্ষ ৬৭ হাজার টাকা নিয়েছেন। যার প্রমাণ জামিয়ার হিসাব বিভাগে লিখিতভাবে সংরক্ষিত আছে। এছাড়াও উনার বিরুদ্ধে শিক্ষকরা আরও বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এ বিষয়ে উনার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো তাদের অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ অবাস্তব। শুধুই হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, ব্যক্তি আক্রোশ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এ বিষয়ে ফুলপুর পাইলট মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মাদরাসার কোষাধ্যক্ষ, মজলিসে শূরা ও অডিট কমিটির সদস্য আবু রায়হান তালুকদার, মজলিসে শূরার সদস্য সাবেক ওসি হারুন অর রশিদ, মাদরাসার দুই শিক্ষক মাওলানা এনামুল হক ও মাওলানা মোখলেছুর রহমান মন্ডল এবং কাতুলী ফাযিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা হাবিবুর রহমানকে নিয়ে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর আগামী ১৫ জুন তারা মাদরাসার কার্যকরী কমিটির সভাপতি বরাবর রিপোর্ট পেশ করবেন। আশা করা হচ্ছে এ তদন্তে সঠিক ও সত্য বিষয়টি উদঘাটন হবে ও ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে যে বা যারা দুর্নাম ছড়াচ্ছে এর অবসান হবে। প্রতিষ্ঠানটি আবারও জাতির কাছে বুক টান করে দাঁড়াবে সগৌরবে, ইনশাআল্লাহ।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলাদেশ নিউজ. All rights reserved.