মো. আব্দুল মান্নান :
উস্তাদদের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বৃহত্তর বরিশালের পিরোজপুর জেলার নেছারাবাদ উপজেলার ছারছীনা দারুস সুন্নাত আলিয়া মাদ্রাসার সাবেক ৩ শিক্ষার্থী। এ মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তারকা ছাত্র ও সাবেক শিক্ষক লন্ডন প্রবাসী ড. মাহমুদ বিন সাঈদের নেতৃত্বে তারা তাদের প্রিয় মরহুম উস্তাদদের কবর জিয়ারত করতে মঠবাড়িয়ায় যান। বুধবার (১৭ এপ্রিল) বন্ধু আবুল কালাম ও শাহীনকে নিয়ে মাহমুদ ওই সফরে যান।

মঠবাড়িয়ায় গিয়ে প্রথমে তারা উস্তাজুল মুহতারাম মাওলানা আব্দুর রব বুলবুলী রহ.-এর কবর জিয়ারত করেন। এরপর তারা যান হাবীবুল্লাহর বাড়িতে। সেখানে মাহমুদের খালু কাজী আব্দুর রব রহ.-এর কবর জিয়ারত করেন। তারপর তারা যান প্রিয় উসতায মাওলানা হাবীবুর রহমান রহ – এর কবর যিয়ারতে। সেখানে গিয়ে তারা নিজেদেরকে সামলাতে পারেননি। হুযুরের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সবাই। উস্তাদ মাওলানা হাবীবুর রহমান রহ. ছারছীনা মাদরাসায় সপরিবারে থাকতেন। ১৯৯৩-৯৪ -এর দিকে মর্মান্তিক এক ঘটনায় উনার ৪-৫ বছর বয়সের ঔরসজাত সন্তানকে হারান তিনি। সে সময় এক বিকালে আসরের পর নিজের সন্তান ও পটুয়াখালী হুজুর মাওলানা রফিকুল্লাহ নেছারীর ছেলেকে হাতে ধরে ধরে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছিলেন। আম্মা হুজুর তাকে টুপি পায়জামা পাঞ্জাবি পরিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। মাদরাসার পশ্চিম পাশে সন্ধ্যা নদীর পাড়ে হুজুর তাদের নিয়ে ঘুরতে যান। লঞ্চ যেখানে ভীড়ে ওখানে তারা হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এসময় একজন ফেরিওয়ালা আসে বাদাম নিয়ে। হুজুর সন্তানের হাত ছেড়ে বাদাম কিনে প্রথমে পটুয়াখালী হুজুরের ছেলেকে দিচ্ছিলেন কিন্তু সে নিতে চাচ্ছিল না। কিন্তু হুজুর তাকে দিয়েই বাদাম খাওয়া শুরু করতে চাচ্ছিলেন। একটু পীড়াপীড়ি করার পর সে নেয়। এতটুকু সময় পর নিজের সন্তানকে বাদাম দিতে চেয়ে দেখেন সে নেই। হায়, হায়! নেই তো নেইই। একদম পরিষ্কার আকাশ ছিল। কিন্তু এই খোলা আকাশের নিচ থেকে সে যে কোথায় গেল? তাকে আর খোঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। লঞ্চ বাধার মোটা রশিতে ওষ্ঠা খেয়ে কখন যে নদীতে পড়ে ডুবে গেছে কেউ তা টের পায়নি। দ্রুত গতিতে ছারছীনা মাদরাসার ছাত্রদের মাঝে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে শত শত ছাত্র দৌড়ে এসে ঝাপিয়ে পড়েছিল সন্ধ্যা নদীতে কিন্তু তবু তাকে কোথাও পাওয়া যায়নি। ভরা হাতে ঘুরতে এসে হুজুরকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল বাসায়। আম্মা হুজুরের কাছে তিনি ওইদিন না জানি কি জওয়াব দিয়েছিলেন তা জানা নেই। তবে আম পাবলিকের মত বাসা থেকে কোন কান্নাকাটি ও চিল্লাচিল্লির আওয়াজ পাওয়া যায়নি। পরদিন বিকালে রাজাপুর এলাকায় জেলের জালে আটকা পড়ে হুজুরের প্রিয় সেই সন্তান। ওইদিনের ওই হৃদয়বিদারক ঘটনা হুজুর যে কেমনে সামাল দিয়েছিলেন তা চিন্তা করে কুলানো যায় না। ওই ঘটনা মনে হলে আজও কলিজায় চেৎ করে ওঠে। কিন্তু হুজুর অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে উহা মোকাবেলা করেছেন। এই ওলীর কবর দেখে ও জিয়ারত করে প্রাণে শান্তি অনুভব করেন মাহমুদ বিন সাঈদ। কবরের বাইরে ফুলবাগান। মনে হলো হুযুর জান্নাতের বাগানে শুয়ে আছেন।

এরপর তারা যান কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের সাবেক প্রফেসর প্রিয় উসতায ড. মুসতাফিজুর রহমান স্যারের বাড়িতে। সেখানে স্যারের রেস্ট হাউজ ও মাদরাসা পরিদর্শন করেন তারা।

সবকিছু দেখে মুগ্ধ হন ড. মাহমুদ বিন সাঈদ। সেখান থেকে তারা যান মরহুম সুফী আব্দুর রশিদ সাহেবের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে দেখেন এলাহী কাণ্ড! একদম যেন ছারছীনার কায়েম মোকাম। ওখানে তাদের সাথে যুক্ত হন বন্ধু হাবীবুল্লাহ। হুযুরের বড় ছেলে মুর্তজা ও মেঝ ছেলে তাদের সাথী ইয়াহইয়া তাদেরকে আন্তরিকতার সাথে অভিবাদন জানান ও আপ্যায়ন করেন। এরপর তারা চলে যান বেতমোড়ে তাদের প্রিয় তৈয়্যব, তাহের ও তায়েবদের বাড়িতে। সেখানেও তাদের মুহতারাম বাবা মরহুম মাওলানা আবদুল হাই সাহেব একটি চমৎকার মাদরাসা গড়ে তুলেছেন। মাদরাসাটি তারা পরিদর্শন করেন। ওইদিন আবহাওয়া অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ ছিল। তবু তারা এসব বুজুর্গদের কবর জিয়ারত করে এতটাই প্রশান্তি লাভ করেন যে কোন ক্লান্তবোধ করেননি। প্রাণ খুলে সকল মরহুমদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করেছেন। আল্লাহ তায়ালা উনাদেরকে জান্নাতে আলা মাক্বাম দান করুক।