আজ
|| ১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ১লা জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
ইমাম নামাজে কখন কোথায় কিভাবে কি করবেন
প্রকাশের তারিখঃ ১৮ এপ্রিল, ২০২৪
মো. আব্দুল মান্নান :
নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা'দ, মুহতারাম দোস্ত বুজুর্গ, কুরআন হাদীসের বয়ান অনুযায়ী ঈমানের পর নামাজই মুসলমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নামাজ ছাড়া কোন উপায় নেই। ইচ্ছাকৃতভাবে কেহ নামাজ ছেড়ে দিলে দীন থেকে সে বের হয়ে যায়। আর নামাজকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করলে বা অস্বীকার করলে কাফের হয়ে যায়। হাদীসে বলা হয়েছে, 'যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ গুরুত্বের সাথে আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা নিজ জিম্মায় তাকে জান্নাতে পৌঁছে দিবেন।'
সূরা ত্বহার ১৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, '(হে মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনি আপনার পরিবার পরিজনকে নামাজের আদেশ করুন এবং নিজেও নামাজ পড়তে থাকুন। আমি আপনার নিকট রিজিক চাই না বরং রিজিক তো আপনাকে আমিই দিব। আর উত্তম পরিণতি পরহেজগারীর জন্যই।'
আরেক হাদীসে আছে, 'যে ব্যক্তি নামাজের এহতেমাম করে আল্লাহ তায়ালা তাকে পাঁচ প্রকারে সম্মানিত করেন। প্রথমতঃ তার উপর হতে রুজি রোজগারের অভাব দূর করে দেওয়া হয়। দ্বিতীয়তঃ তার উপর হতে কবরের আযাব হটিয়ে দেওয়া হয়, তৃতীয়তঃ কিয়ামতের দিন তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। চতুর্থতঃ ওই ব্যক্তি পুলসিরাতের উপর দিয়ে বিদ্যুতের গতিতে পার হয়ে যাবে এবং পঞ্চমতঃ তাকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে।'
একজন বুজুর্গ বলেছেন, নামাজ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত যে, এটি আদায় করার জন্য আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে তার ঘরে ডেকে নিয়ে যান।
বলা হয় যে, নামাজ মুমিনের জন্য মেরাজস্বরূপ। নামাজ মানুষকে আল্লাহ তায়ালার কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। যদি নামাজটা আল্লাহর বিধি মোতাবেক আদায় হয়ে থাকে। বুজুর্গানে দীন সবসময় নামাজকে বিধি মোতাবেকই আদায় করে থাকেন এবং ওইভাবে আদায় করেই তারা বুজুর্গ হয়েছেন। যারা বিধি মোতাবেক আদায় করেন না তারা যুগ যুগ ধরে নামাজ পড়েও বুজুর্গ বনতে পারেন না। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের বুজুর্গরা এমনভাবে নামাজ আদায় করেছেন যে, তারা নামাজের স্বাদ ভোগ করতেন। স্বাদ সম্পর্কে অবগত হয়ে নামাজ আদায় করতেন।
প্রশ্ন হলো, তাদের জন্য যা সম্ভব ছিল রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল উম্মতের জন্যে কি এটা সম্ভব নয়? -অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু আমরা গাফিলতির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছি। নামাজের মধ্যে আমরা গাফিলতি করি। যে কারণে আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। নামাজে আমাদের তাছির হয় না।
সাহাবায়ে কেরাম ও আগেকার বুজুর্গরা নামাজের মাধ্যমে সব কিছুর সমাধান নিতেন। নামাজের বরকতে তারা একটি বিপ্লবী দলে পরিণত হয়েছিলেন। পাল্টে গিয়েছিল দুনিয়ার চেহারা। মাশাআল্লাহ এখন যে সে রকম বুজুর্গ নেই তা নয় বরং আছেন, তবে কম। কিন্তু বর্তমানে নোংরা বস্তুবাদী সভ্যতার সংস্পর্শে এসে আমরা ইবাদতকে একটি রুসমে পরিণত করে ফেলেছি। লোক দেখানো ও সামাজিক নামাজই বেশি হয়ে থাকে।
ফলে নামাজ আদায় করলেও আমাদের নামাজে অ্যাকশান হয় না। সঠিকভাবে নামাজ আদায় না করার কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তায়ালা আমাদের নিকট থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়েছেন। চিন্তা চেতনা ও মননশীলতায় এসেছে দৈন্যতা। জ্ঞান প্রজ্ঞা ও রূহানিয়াত দূরে চলে গেছে। নামাজের মধ্যে বিনয় নম্রতা, আল্লাহ ভীতি, নিজেকে ভুলে যাওয়ার আত্মদর্শন আমরা ভুলে গেছি।
নামাজে যদি খুশুখুজু তথা বিনয় নম্রতা না থাকে তবে সে নামাজ হয় রূহ ছাড়া বা মরদেহের মত। ফলে ওই নামাজ দিয়ে আমাদের কোন ফায়দা হয় না। মুছে না দুঃখ কষ্ট। আসে না সফলতা। প্রকৃতপক্ষে নামাজের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। সাহাবাওয়ালা ধ্যান খেয়াল নিয়ে নামাজ আদায় করতে হবে। কেননা, নামাজ মানুষকে সকল মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। দুনিয়া ও আখেরাতের সকল দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তি দেয়। কিন্তু আমাদের নামাজ ভিতরগতভাবে ইখলাসের সাথে হবে দূরের কথা বাহ্যিকভাবেই তো হচ্ছে না। বাহ্যিক রুকু, সিজদা, উঠা-নামা, বসা এগুলো কি সঠিকভাবে হচ্ছে? কোন অঙ্গ কখন মাটিতে পড়বে, কখন কোনটা আগে উঠবে, কোথায় কতটুকু দেরি করতে হবে, সূরা ফাতিহা জোরে পড়লে সময় বেশি লাগে তাহলে আস্তে পড়লে কম লাগে কেন? এসব বিষয় সঠিকভাবে আদায় না করার কারণে নামাজ রূহবিহীন হচ্ছে। ফলে তা দ্বারা আমরা উপকার নিতে পারছি না। এ নামাজ কোথাও কোন প্রভাব ফেলতে পারছে না। এ রকম প্রভাববিহীন নামাজ দ্বারা যেহেতু দুনিয়ার উপকারই হচ্ছে না, তাহলে উহা দ্বারা আখেরাতের উপকার কতটুকু আশা করা যায়, বলুন?
এজন্য দোস্ত, নামাজে সময় দিতে হবে। নামাজকে সুন্দর করতে হবে। যারা সুন্দর করে নামাজ আদায় করেন তাদের অনুসরণ করতে হবে। বিশেষ করে নামাজ যিনি পরিচালনা করবেন অর্থাৎ ইমাম, তাকে গুরুত্ব সহকারে নামাজ আদায় করতে হবে। কেননা, তাদেরকে তো সবাই ফলো করেন। এজন্য যেখান থেকে যে কাজ শুরু হওয়ার কথা, যেখানে গিয়ে যে কাজ শেষ হওয়ার কথা তাদেরকে তা সেভাবে যথাযথভাবে শুরু এবং শেষ করতে হবে।
নামাজ শুরুর সময় আল্লাহু আকবার বলে আমরা শুরু করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হাত আগে কতটা উঠিয়ে পরে আল্লাহু আকবার বলবো নাকি আল্লাহু বলার সাথে সাথে হাত উঠানো শুরু করবো? হ্যাঁ, মনে রাখতে হবে, আল্লাহু বলা শুরু করার সময় হাত উঠানো শুরু হবে এবং আকবার বলার পর হাত বাধা শেষ হবে।
কাউকে কাউকে দেখা যায়, কান পর্যন্ত হাত উঠিয়ে বা একদম নাভির উপর হাত বাধার পর আল্লাহু আকবার বলে থাকেন। কিন্তু এটা সঠিক তরিকা নয়।
এছাড়া কোন কোন ইমামকে দেখা যায়, রুকু থেকে কোন কিছু না বলে সোজা হচ্ছেন। সোজা হওয়ার পর অথবা অর্ধেক পথ যাওয়ার পর সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ বলছেন। এমনও আছেন যারা সোজা না হয়েই সিজদায় চলে যাচ্ছেন। ফলে নামাজ আদায় হচ্ছে না। কিন্তু এক্ষেত্রে সহীহ তরিকা কি? সামিয়াল্লাহর 'সা' বলার সাথে সাথেই রুকু থেকে সোজা হওয়া শুরু করতে হবে। এমনিভাবে কেউ কেউ সিজদা থেকে কোন কিছু না বলে একা একা অনেকটা উঠার পর আল্লাহু আকবার বলা শুরু করেন। কিন্তু এগুলো সহীহ তরিকা নয়। সহীহ তরিকা হলো, আল্লাহু শব্দের 'আ' বলার সাথে সাথে উঠা শুরু করতে হবে। তবে কোন ইমাম বা মুসল্লীর ওজর থাকলে এর মাসআলা ভিন্ন হবে। আল্লাহ তায়ালা চাইলে তাদেরটা হয়ে যেতে পারে কিন্তু বিনা ওজরে এসব গাফিলতির সাথে নামাজ আদায় করলে ওই নামাজ আদায় হবে না এবং উহা দ্বারা পরিপূর্ণ সাওয়াব হাসিল করার আশা করা যায় না।
'মুফতি রিয়াজুল ইসলাম বিক্রমপরী' উনার ফেইসবুক আইডিতে লিখেছেন,
'আহলে হাদীসের একজন আলেম আসাদুল্লাহ আল গালিব ঈদের নামাজে ইমামতি করছেন। ছবিতে দেখা যায়, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন আর উনার মুসুল্লিরা সবাই তখনো সিজদা করছেন। এটা কোন সহীহ্ হাদীসে আছে কি?' এর সঠিক উত্তর আহলে হাদীসের ভাইয়েরা দিতে পারবেন।
তবে আমাদের সবাইকে নামাজের ব্যাপারে আরও চৌকান্না হতে হবে। ইমাম মুয়াজ্জিন ও মুসল্লী সবাইকে সহীহ তরিকায় নামাজ আদায়ের ব্যাপারে যত্নশীল হতে হবে। তাহলেই আমাদের দুনিয়া ও আখেরাত অর্থাৎ উভয় জাহানের সফলতা অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুক।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলাদেশ নিউজ. All rights reserved.