• বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন
Headline
ময়মনসিংহ-১ আসনের এমপি রুবেলের রত্নগর্ভা মা আর নেই, জানাজা মঙ্গলবার ফুলপুর থেকে ওয়ালটনের টিভি কিনে ৫০ হাজার টাকা সুরক্ষা সহায়তা পেলেন ধোবাউড়ার শিল্পী খাতুন ফুলপুরে মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ব্যক্তির ৩ মাসের কারাদণ্ড প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ফুলপুরে দুস্থদের মাঝে শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ আমার উস্তাদ মাওলানা মাছুম বিল্লাহ হুজুর আর নেই উদ্দেশ্য মহৎ কিন্তু পদ্ধতি ভুল — ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ‘আমি তো কোনোদিন স্বপ্নও দেখিনি, আমি একজন সংসদ সদস্য হবো’ ফুলপুরে মসজিদের ইমামকে মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত কাউসার আটক ফুলপুরে বাশুয়া কবিরপুর মাদরাসায় ইকরা বোর্ডের ৪৫ দিনব্যাপী নূরানী মুয়াল্লিম প্রশিক্ষণ শুরু ১০ অক্টোবর মিরাছ শুধু সম্পত্তি ভাগের বিষয় নয়; এটি আমানত

মিরাছ শুধু সম্পত্তি ভাগের বিষয় নয়; এটি আমানত

Reporter Name / ১০৪ Time View
Update : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

হাফেজ মাওলানা মুফতী জুনাইদ রহমান :

মিরাছের সম্পদ—হকের হিসাব, ন্যায়ের পরীক্ষা
মিরাছ শুধু সম্পত্তি ভাগের বিষয় নয়; এটি আমানত, ন্যায়বিচার এবং মানুষের হক আদায়ের বিষয়। অথচ সমাজে এখনো এমন বহু পরিবার রয়েছে, যেখানে বোনের প্রাপ্য আটকে রাখা হয় নানা অজুহাতে। কেউ বলেন, ‘বাবার ভিটা ছেলেদের কাছেই থাকবে’; কেউ বলেন, ‘মেয়েরা তো ভাইদের কাছেই থাকে’; আবার কেউ মূল্যবান সম্পত্তি নিজের দখলে রেখে তুলনামূলক কমমূল্যের অংশ অন্য উত্তরাধিকারীর হাতে তুলে দিয়ে বলেন—‘তোমার তো অংশ দেওয়া হয়েছে।’
কোথাও আবার বণ্টনের বৈঠকেই শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়—‘অমুক সম্পত্তিতে দাবি করা যাবে না; এই শর্ত মানলেই বণ্টন হবে।’
এসব কখনো পারিবারিক সমঝোতা, কখনো সামাজিক রীতি, আবার কখনো আবেগের আড়ালে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আল্লাহর নির্ধারিত হকের সামনে মানুষের তৈরি রীতির অবস্থান কোথায়?
মেয়ের উত্তরাধিকার দয়া নয়, নির্ধারিত হক
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পুরুষদের জন্য পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে অংশ রয়েছে এবং নারীদের জন্যও অংশ রয়েছে—অল্প হোক বা বেশি—নির্ধারিত অংশ।’
—সূরা আন-নিসা: ৭
অতএব, মেয়ের উত্তরাধিকার কোনো পারিবারিক দয়া বা ভাইয়ের অনুগ্রহ নয়; এটি আল্লাহ নির্ধারিত হক।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের তাদের নির্ধারিত অংশ দিয়ে দাও।’
—সহিহ আল-বুখারি: ৬৭৩২
তাই মিরাছ বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘আমার সুবিধা কোথায়?’ নয়; বরং ‘আল্লাহর বিধান কী?’
সামাজিক রীতি নয়, আল্লাহর বিধানই চূড়ান্ত
‘সমাজে এমনই চলে’, ‘সবাই এভাবেই করে’, ‘মেয়েরা বাবার সম্পত্তি নেয় না’—এ ধরনের প্রচলিত কথা শরিয়তের দলিল নয়।
কোনো সামাজিক রীতি শরিয়তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু কোনো রীতি যদি আল্লাহর নির্ধারিত অধিকারের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তাহলে সংশোধনের প্রয়োজন রীতির—শরিয়তের নয়।
তাই একজন মুসলমানের কাছে প্রশ্ন হওয়া উচিত—‘সমাজ কী বলবে?’ নয়; ‘আল্লাহ কী বলেছেন?’
ছেলের অবদান এক বিষয়, মেয়ের মিরাছের হক আরেক বিষয়
কোনো ছেলে বাবা-মায়ের দেখাশোনা করেছেন, তাদের সঙ্গে থেকেছেন, ব্যবসায় কাজ করেছেন কিংবা পরিবারের দায়িত্ব বহন করেছেন—এগুলো অবশ্যই তার মূল্যবান অবদান। তার কোনো বৈধ পাওনা থাকলে সেটি যথাযথভাবে হিসাব করতে হবে।
কিন্তু সেই অবদানের কারণে অন্য উত্তরাধিকারীর নির্ধারিত অংশ বাতিল হয়ে যায় না।
‘ছেলে বেশি করেছে, তাই মেয়ের মিরাছ কমবে’—এটি মিরাছের বিধান নয়। প্রত্যেকের হক নির্ধারিত হবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী।
শুধু জমির পরিমাণ নয়, মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ
মিরাছের বণ্টনে শুধু জমির পরিমাণ দেখলেই ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয় না। সম্পত্তির অবস্থান, ব্যবহারযোগ্যতা, বাজারমূল্য ও আয়-উৎপাদনের সক্ষমতাও বিবেচনায় আসতে পারে।
কেউ যদি মূল্যবান অংশ নিজের কাছে রেখে অন্য উত্তরাধিকারীকে কমমূল্যের সম্পত্তি দিয়ে বলেন, ‘তোমার অংশ তো দেওয়া হয়েছে’, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—ন্যায্য মূল্যায়ন কি হয়েছে?
সম্পত্তির বিনিময় বা সমঝোতা অবশ্যই হতে পারে। তবে তা হতে হবে প্রকৃত মূল্যায়ন, পূর্ণ জ্ঞান এবং স্বাধীন সম্মতির ভিত্তিতে।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’
—সূরা আল-বাকারা: ১৮৮
যৌথ সম্পত্তি এককভাবে ভোগ করার সুযোগ নেই
মৃত ব্যক্তির সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বণ্টন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তি অনেক ক্ষেত্রে যৌথ অবস্থায় থাকে। এ অবস্থায় দীর্ঘদিনের দখল, বসবাস বা ব্যবহার নিজে থেকেই একক মালিকানা সৃষ্টি করে না।
বিশেষ করে কোনো সম্পত্তি ভাড়া, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনো বৈধ ব্যবহারের মাধ্যমে আয় করলে সব উত্তরাধিকারীর স্বার্থ বিবেচনায় তার ব্যবস্থাপনা করা উচিত। পারস্পরিক সম্মতিতে একজন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারেন, সম্পত্তি ভাড়া দিতে পারেন এবং আয়ের যথাযথ হিসাব রাখতে পারেন।
কিন্তু অন্যদের বৈধ অধিকার অগ্রাহ্য করে যৌথ সম্পত্তি এককভাবে ভোগ করা ন্যায়সংগত নয়।
‘বাবা আমাকে দিয়ে গেছেন’—দাবির প্রমাণ কী?
অনেক সময় কোনো উত্তরাধিকারী দাবি করেন—‘বাবা জীবিত অবস্থায় এই সম্পত্তি আমাকে দিয়ে গেছেন।’
এ ক্ষেত্রে দেখতে হবে, সেটি সত্যিই বৈধ হিবা ছিল কি না, মালিকানা যথাযথভাবে হস্তান্তর হয়েছিল কি না, নাকি শুধু বসবাস বা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এসব এক বিষয় নয়। তাই মৃত্যুর পর শুধু মৌখিক দাবি তুলে অন্য উত্তরাধিকারীদের অধিকার বাতিল করা যায় না। দাবির প্রকৃতি ও প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।
জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও নবী ﷺ ন্যায়বিচারের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
—সহিহ আল-বুখারি: ২৫৮৭; সহিহ মুসলিম: ১৬২৩
‘বোন তো এমনিতেই ছেড়ে দেবে’—এই মানসিকতা বদলাতে হবে
কোনো বোন নিজের হক সম্পূর্ণ জ্ঞান ও স্বাধীন সিদ্ধান্তে ছেড়ে দিলে সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু আবেগ, পারিবারিক চাপ বা সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে তাকে তার অধিকার ছাড়তে বাধ্য করা ন্যায়সংগত নয়।
‘তুমি তো মেয়ে’, ‘ভাইদের কাছেই রেখে দাও’, ‘সম্পর্ক নষ্ট করো না’, ‘বাবার ভিটা কি বোনেরা নেয়?’—এ ধরনের কথার মাধ্যমে কারও ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে তা প্রকৃত স্বেচ্ছাসম্মতি হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন।
স্বেচ্ছা আর চাপ এক জিনিস নয়।
অন্যের হক নষ্ট করার সহযোগিতাও অন্যায়
মিরাছের অন্যায় শুধু সেই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, যিনি সরাসরি অন্যের সম্পদ দখল করেন। কেউ যদি জেনে-শুনে অন্যের হক আটকে রাখতে উৎসাহ দেন, চাপ সৃষ্টি করেন, অন্যায় দখলকে সমর্থন করেন কিংবা কাউকে তার অধিকার ছেড়ে দিতে প্ররোচিত করেন—তাহলে তিনিও অন্যায়কে শক্তি জোগান।
আল্লাহ বলেন, ‘সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অন্যকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অন্যকে সহযোগিতা করো না।’
—সূরা আল-মায়িদা: ২
তাই প্রশ্ন শুধু—‘আমি কি কারও সম্পত্তি নিয়েছি?’ নয়; বরং—‘আমি কি অন্য কারও হক নেওয়ার কাজে সহযোগিতা করেছি?’—এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
বাপের ভিটা কি শুধু ছেলেদের?
‘এটা বাবার ভিটা, তাই ছেলেদের কাছেই থাকবে’—এই আবেগ অনেকের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু বোনও তো সেই বাবার সন্তান। বাবার ঘর, উঠান, গাছপালা ও স্মৃতির সঙ্গে তারও সম্পর্ক রয়েছে।
বাবার স্মৃতি রক্ষার সুন্দর পথ বোনের হক নষ্ট করা নয়; বরং তার হক অক্ষুণ্ণ রেখে ঐতিহ্য রক্ষা করা।
কেউ চাইলে ন্যায্য মূল্যে অন্য উত্তরাধিকারীর অংশ কিনে নিতে পারেন, সম্পত্তি বিনিময় করতে পারেন কিংবা যৌথ মালিকানা বজায় রাখতে পারেন। তবে সবকিছুর ভিত্তি হতে হবে ন্যায্য মূল্যায়ন ও প্রকৃত সম্মতি।
মা জীবিত থাকলে সেটি মিরাছ নয়
মিরাছ কার্যকর হয় মৃত্যুর পর। মা জীবিত থাকলে তার সম্পত্তি তারই মালিকানাধীন। সন্তানরা ভবিষ্যতে কী পাবে, সেটিকে এখনই মিরাছ হিসেবে ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ নেই।
মা জীবদ্দশায় বৈধভাবে হিবা করতে পারেন। তবে সেটি মিরাছ নয়, হিবা। আর সন্তানের চাপ বা ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে মায়ের সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া ন্যায়ভিত্তিক আচরণ নয়।
মিরাছ শুধু সম্পত্তির হিসাব নয়—এটি আমানত
মৃত ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর নিজের সম্পত্তির পক্ষে কথা বলতে পারেন না। তিনি বলতে পারেন না—কোন অংশ মেয়ের, কোন অংশ স্ত্রীর কিংবা কার কত পাওনা।
তাই তার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের হাতে শুধু সম্পত্তি আসে না—একটি আমানতও আসে।
আল্লাহ মিরাছের বিধান বর্ণনা করার পর বলেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।’
—সূরা আন-নিসা: ১৩
এই সীমা অতিক্রম করার অর্থ শুধু পারিবারিক বিরোধ তৈরি করা নয়; এটি মানুষের হক নষ্ট করারও শামিল।
ন্যায়সঙ্গত মিরাছ বণ্টনের পথ
মিরাছ বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির প্রকৃত সম্পত্তি নির্ধারণ করতে হবে। এরপর প্রাসঙ্গিক দাফন-কাফনের খরচ, ঋণ ও বৈধ ওসিয়তের বিষয় নিষ্পত্তি করে প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের নির্ধারণ করতে হবে। তারপর শরিয়ত অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ হিসাব করতে হবে।
সম্পত্তির মূল্য, অবস্থান, ব্যবহার ও আয়-উৎপাদনের বিষয়ও যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
সমঝোতা হতে পারে—কিন্তু জোর করে নয়।
বিনিময় হতে পারে—কিন্তু অন্যায় মূল্যায়নে নয়।
কেউ সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারেন—কিন্তু অন্য উত্তরাধিকারীর বৈধ অধিকার অস্বীকার করে নয়।
শেষ কথা
একদিন আমরা সবাই চলে যাব। জমি থাকবে, বাড়ি থাকবে, টাকা থাকবে। কিন্তু থেকে যাবে একটি প্রশ্ন—যে সম্পত্তি তোমার হাতে আমানত হিসেবে এসেছিল, তুমি কি তা ন্যায়ের সঙ্গে আদায় করেছিলে?
যে মূল্যবান অংশটি নিজের জন্য রেখে দিতে চান—একবার থামুন।
যে বলেন, ‘এই শর্ত না মানলে আমি বণ্টনে বসব না’—একবার ভাবুন।
যে যৌথ সম্পত্তি একা ভোগ করছেন অথচ অন্য উত্তরাধিকারীরা তাদের অধিকারের কথা বলছেন—নিজের অবস্থানটি আবার যাচাই করুন।
কারণ দখল মালিকানার একমাত্র প্রমাণ নয়। ক্ষমতা হকের প্রমাণ নয়। সামাজিক রীতি শরিয়তের দলিল নয়। আর কারও নীরবতা তার হক ত্যাগের প্রমাণ নয়।
মিরাছের ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন—কে ছেলে, কে মেয়ে, কে বড়, কে ছোট—তা নয়।
বড় প্রশ্ন হলো—কে আল্লাহর বিধানের সামনে নিজের স্বার্থকে থামাতে পেরেছে।
মিরাছের সম্পদ—হকের হিসাব, ন্যায়ের পরীক্ষা।
যার হক, তাকে তার হক দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি আমাদের দায়িত্ব।

* অনলাইন থেকে সংগৃহীত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা