মো. আব্দুল মান্নান
আমেরিকার নিউইয়র্কের অলবেনিতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এ কে সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টুর রূহের মাগফিরাত কামনায় ময়মনসিংহের ফুলপুরে কাজিয়াকান্দা কামিল মাদরাসা জামে মসজিদে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শুক্রবার (১ মার্চ) বাদ আসর ওই মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মরহুমের ছোট বোনজামাই ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান-২ গ্রামীণ মানবিক উন্নয়ন সংস্থা (গ্রামাউস)-এর নির্বাহী পরিচালক মো. আব্দুল খালেক অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। তিনি এ কে সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টুর পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মন্টু ভাই ছিলেন আমার বন্ধু ও সম্বন্ধি। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, নম্রভদ্র, অভিজাত ও শিক্ষক পরিবারের সন্তান ছিলেন।

তার বাবা আমার শ্বশুড় মরহুম হাফিজ উদ্দিন মাস্টার ও তার মা আমার শ্বাশুড়ি মরহুমা সুফিয়া খাতুন অত্যন্ত ভাল মনের মানুষ ছিলেন। হাফিজ উদ্দিন মাস্টারের ৫ ছেলে ও ২ মেয়ে ছিল। ভাইদের মধ্যে মন্টু ছিলেন দ্বিতীয়। তাদের সবার বড় বোন শামছুন্নাহার। তিনি ঠাকুর বাখাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এরপর প্রথম ভাই ডা. এ কে সালেহ আহমেদ (মুকুল)। তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক (কিডনি রোগ বিভাগ)। মুকুলের পরই ছিলেন এ কে সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টু। তিনি প্রথম জীবনে বাহাদুরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। পরে পিটিআই ইন্সট্রাক্টর ছিলেন। শিক্ষকদের ট্রেনিং করাতেন। তার স্ত্রী তাহমিনা বেগম ফুলপুর কাজিয়াকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তারা সবাই মেধাবী ছিলেন।

মন্টুর পরে তৃতীয় ভাই মেজবাহ উদ্দিন মামুন। তিনি ফুলপুরে আশা জেনারেল হাসপাতালের একজন শেয়ার হোল্ডার ও ওই হাসপাতালেই জব করেন। উনার দ্বিতীয় বোন বা ছোট বোন আশরাফুন্নাহার গ্রামাউসের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল খালেকের সহধর্মিণী। তিনিও একজন শিক্ষিকা। উনার পরে দুই ভাই। চতুর্থ ভাই আমেরিকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আর সবার ছোট ভাই আলমগীর মনসুর (মারুফ) একজন প্রকৌশলী। শেষের এই দুই ভাইও আমেরিকায় থাকেন। সব মিলিয়ে একটি বর্ণাঢ্য, ঐতিহ্যবাহী ও খান্দানী পরিবার। এসব বর্ণনা তুলে ধরে মন্টু ভাইকে স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ছোট বোন জামাই আব্দুল খালেক।
উনার পর বক্তব্য রাখেন, ফুলপুর সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক খলিলুর রহমান স্যার। তারপর ঈমান বিষয়ে বয়ান করেন পয়ারী আলিম মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুর রহমান হুজুর। উনার পর আমলের গুরুত্ব মৃত্যুর ছামানা তৈরি বিষয়ে বয়ান করেন ফুলপুর কাজিয়াকান্দা কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদীন। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক (কিডনি রোগ বিভাগ) ডা. এ কে সালেহ আহমেদ মুকুল। তিনি বলেন,

এ কে সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টু আমার সহোদর ছোট ভাই। সে সুঠাম দেহের অধিকারী ছিল। সুস্থ ছিল। এ সময় মরার কথা নয়। তার ৫২-৫৩ বছর বয়স হয়েছিল। তারপরও মারা যাওয়ার কারণ কি? কারণ হলো- তার আয়ু এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। যে কারণে তাকে চলে যেতে হয়েছে। এভাবে সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ ভোগ করতেই হবে। ইচ্ছায় হোক অথবা অনিচ্ছায়। তবে এর জন্য আমরা কে কতটুকু প্রস্তুতি নিয়েছি? সেই জিন্দেগীর জন্য যেসব আমল দরকার, এগুলো করা দরকার। তিনি আরও বলেন, আমরা সব ভাইবোন আল্লাহর রহমতে ছোট বেলায়ই কুরআন তেলাওয়াত শিখেছি। সর্বক্ষণই আমাদের আমলের মধ্যে থাকা উচিৎ। ছোটভাই মন্টু চলে গেল। মা ৬ মাস আগে ইন্তেকাল করেছেন। আর বাবাও ১২-১৩ বছর আগে মারা গেছেন। আমরাও যে কোন সময় চলে যেতে পারি। আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমার ভাইয়ের জন্য সবাই দোয়া করবেন। সে যেন বেহেশত লাভ করতে পারে। এজন্য সবাই তার জন্য দোয়া করবেন। তিনি আরও বলেন, ওখানে আরও দুই ভাই থাকতো। আমি বড় থাকলেও সে সেখানে বড়ভাই হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন।
এরপর গ্রামাউসের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল খালেক বলেন, এখানে অনেকেই এসেছেন। মন্টুর মামাতো খালাতো ভাইয়েরা এসেছেন। অনেক আত্মীয় স্বজন এসেছেন। উপস্থিত সবার প্রতি অনুরোধ আপনারা সবাই মন্টু ভাইয়ের রূহের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবেন। আমাদের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সবশেষে জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল উলূম বালিয়ার মুহতামিম পীরে কামিল শায়খুল হাদীস মাওলানা ওয়াইজ উদ্দিন দামাত বারাকাতুহুম মৃত্যুর জন্য ঈমান-আমল নিয়ে প্রস্তুত থাকা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনাশেষে অলবেনিতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এ কে সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টুর রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া পরিচালনা করেন।

এসময় অন্যদের মধ্যে ফুলপুর সরকারি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মোজাহারুল ইসলাম মাস্টার, আনন্দ মোহন কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আকবর আলী আহসান, দারুল ইহসান (এক্সিলেন্ট) মাদরাসার পরিচালক ও শেরপুর রোড মোড়ে বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. আব্দুল মান্নান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, এ কে সাইফুদ্দিন আহমেদ মন্টু বুধবার আমেরিকার নিউইয়র্কে তার রাতের শিফটে ডিউটিশেষে প্রাইভেট কারে অলবেনির বাসায় ফেরার পথে বাসার কাছে এসে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। পরে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সে দেশেই একটি মসজিদের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও ২ ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।