মো. আব্দুল মান্নান
শ্বাসকষ্ট ও ঘনপেশাব সমস্যায় ভুগছেন কুরবান আলী (৯০) কাকু। তিনি আমাদের ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ৮নং নড়াইল ইউনিয়নের মধ্য নড়াইল গ্রামের একজন বিশিষ্ট মুরুব্বি। উনার আব্বার নাম মৃত অসমত আলী আর আম্মার নাম মৃত উমরজান বিবি।
উনার বাবা এত আগে মারা গেছেন যে তিনি বাবার চেহারাটুকু মনে করতে পারেন না। উনার মা অবশ্য কাকুর দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার পর ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন।
কুরবান আলী কাকুর স্ত্রী, আমার চাচী আছেন। খুবই পর্দানশিন মহিলা। বর্তমানে তিনিও অসুস্থ বলে জানিয়েছেন কাকু। কাকুর ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ে। সবারই বিয়ে শাদী হয়ে গেছে। উনার বড় ছেলে আব্দুল হাকিম আমার ক্লাসমেট। আর আব্দুল হাকিমের বড় ছেলে হারুনুর রশিদ আমার ছাত্র। কাকুর ছেলেরা সবাই অসচ্ছল। কোনমতে ওদের দিন চলে।
কুরবানী আলী কাকু আমাদেরকে ছোটবেলা থেকেই নিজের সন্তানের মত করে আদর করেন ও ভালবাসেন। শুধু তাই নয়, আমরা মাদরাসায় লেখাপড়া করেছি বলে কাকু কিন্তু আমাদেরকে মুরুব্বির মত সম্মান করেন। যদিও আমরা এর উপযুক্ত না।
আমরা উনাকে শ্রদ্ধা করি। কারণ, তিনি খুবই আল্লাহওয়ালা মানুষ। বিনয়ী ও নম্রভদ্র। সৎ। কুরবানী আলী কাকুর বাড়ি মসজিদ থেকে বর্তমানের জন্য বেশ খানিকটা দূরে। এতটা দূর থেকে সাধারণত কেউ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন না। কিন্তু কুরবান আলী কাকু ওখান থেকে ফজরসহ নিয়মিত এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। মুয়াজ্জিন না থাকলে আযানও দেন তিনি।
কাকুর আযান সহীহ। মাশাআল্লাহ নামাজও সহীহ এবং তিনি খুব ধীর স্থিরভাবে নামাজ আদায় করে থাকেন। বিশেষ করে ফজরের নামাজ মাসেও কোন একদিন তার কাজা হয় কি না, আমার জানা নেই।
কাকু খুবই সরল সোজা মানুষ। খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেন। উনার পরনের কাপড় চোপড় বা ঘরের আসবাবপত্র দেখলে বুঝতে পারবেন আসলে কাকু কতটা কষ্টে আছেন। উনার বাড়ি ভিটা ছাড়া ফসল করার মত মাত্র ৬ কাঠা জমি আছে। তা দিয়ে ছেলেমেয়ে ও আত্মীয় স্বজনসহ বহু কষ্ট করে তার সংসার চলে।
আগে কাকু ছোট একটা ব্যবসা করতেন। অল্প পুঁজির একটা দোকান ছিল উনার। ছোট বেলায় আমরা মাদরাসায় যাওয়ার পথে কাকুর দোকান থেকে প্রায়ই এক ছটাক করে হক বিস্কুট কিনে নিয়ে খেতাম। কাকু খুব বেশি মাল উঠাতে পারতেন না। অল্প পুঁজি থাকায় অল্প অল্প করে মাল উঠাতেন। প্রত্যেক শুক্রবার ও সোমবার বিকালে উনাকে দেখতাম ধারা বাজারে পায়ে হেঁটে যেতেন দোকানের মাল আনতে। অল্প অল্প মাল আনতেন। এগুলো বিক্রি শেষ হলে আবার এই টাকা দিয়ে মাল আনতেন। এভাবে চলতো কাকুর দোকান। কাকুর অসুখ বিসুখে ডাক্তার দেখানো ও নিয়মিত ওষুধ কিনতে গিয়ে টাকা খরচ হয়ে বর্তমানে ওই দোকানটি আর নেই।
কাকুর প্রতিদিন ওষুধ লাগে। তিনি বলেন, একবারেই গেছেগা ১৫ হাজার টাকা। গত কিছুদিন ধরে তিনি কিন্তু মসজিদে যেতে পারছেন না। ইমাম আব্দুল হালিম জানালেন যে, তিনি এখন শুধু জুমার দিন মসজিদে আসেন। আর বাকি ওয়াক্তের নামাজ পড়তে মসজিদে আসতে পারেন না। ঘরেই কোনমতে আদায় করে নেন। মসজিদে যেতে না পারার কষ্টে কাকু কখনো কখনো কেঁদে দেন বলে জানান স্থানীয় মুসল্লীরা।
আজ রবিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) কাকুকে দেখতে উনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমার সাথে ছিলেন আমাদের মধ্য নড়াইল আরাফাত জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব ক্বারী আব্দুল হালিম। কাকুর হালাত জেনে কষ্ট পেলাম।
তিনি বলেন, বাবা, কতক্ষণ পরে পরে পেশাব করতে যাওন লাগে। রাতে ঘুমাইতে পারি না। কমপক্ষে ৭-৮ বার পেশাব করতে যাওন লাগে।
আর মসজিদেও তিনি যেতে পারেন না একই কারণে। কাপড় নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া শ্বাসকষ্ট থাকার কারণে এখন তিনি আর হাঁটতে পারেন না। অল্প হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। এর আগে কাকুর চোখে ছানি অপারেশন হয়েছে। চোখের সমস্যা রয়ে গেছে।
কুরবান আলী কাকু খুব লাজুক মানুষ। তিনি কষ্ট করলেও কারো কাছে বলেন না। সওয়াল করেন না। এমনকি সওয়ালের বাহানাও তিনি করেন না। বর্তমানে উনার ওষুধ কিনে খাওয়ারও টাকা নেই। তারপরও তিনি কিন্তু কোন সাহায্যপ্রার্থী হননি। তবে কুরআন হাদীসের দৃষ্টিতে এ ধরনের সৎ দীনদার গরিবদেরকে দান করা উত্তম বলা হয়েছে। আমাদের সমাজে যারা এরকম আছেন তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা কাকুকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করুক।
সবাই আমার কাকুর জন্য দোয়া করবেন। তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও নিয়মিত মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারেন।