মো. আব্দুল মালেক
‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমে’ বৃদ্ধদের সেবায় যে হাত দুটো সবসময় প্রসারিত ছিল সেই হাতে আজকে বিয়ের মেহেদী , আলহামদুলিল্লাহ । দুটো এতিম অসহায় ছেলেমেয়েকে বিয়ে দিয়ে আমি হলাম তাদের বড় ভাই । মেয়েকে দিলাম বৃদ্ধাশ্রমের পাশেই নিজের ৫ শতক জমি এবং ছেলেকে দিলাম আমার গ্রামে নিজের আরও ৫ শতক জমি। কারণ, তারা দুজনই অসহায় এতিম এবং ভূমিহীন । ছেলেটির নাম শান্ত। সে আমার নিজ গ্রামের এতিম ছেলে। সেও ছোট সময় তার মা’কে হারায় । এখন থেকে তারা স্বামী স্ত্রী বৃদ্ধাশ্রমেই থাকবে এবং বৃদ্ধদের সেবামূলক চাকরি করবে ।
মেয়েটির নাম রিয়া মনি। সে ছিল বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধদের এবং ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’ কর্তৃপক্ষের মধ্যমনি । বাংলা সংস্কৃতিতে একটি প্রবাদ আছে ‘গোবরে পদ্ম ফুল’। রিয়া মনি ছিল তেমনই একটি পদ্ম ফুল । রিয়ার বাবা ছিল ভূমিহীন এবং তার বাড়ি ছিল পঞ্চগড় জেলায় । জীবিকার তাগিদে রিয়ার বাবা পঞ্চগড় থেকে চট্টগ্রামে চলে আসেন। পরে চট্টগ্রামে থাকাবস্থায়ই তিনি হাতিয়ার এক মহিলাকে বিয়ে করেন। ওই ঘরেই রিয়ার জন্ম হয় ।
রিয়ার বয়স যখন ৬/৭ বছর তখন তার মা মার যান। বাবা করে দ্বিতীয় বিয়ে । হতদরিদ্র অশিক্ষিত পরিবার। রিয়ার সৎমা রিয়ার জীবনের জন্য হয়ে উঠে ডাইনি। সৎ মায়ের অত্যাচার ও অবহেলা সহ্য করতে না পেরে রিয়া চট্টগ্রাম থেকে চলে আসে ঢাকার একটি এতিমখানায় (সেন্টার হোমে)।
আমি যখন ঢাকায় অসহায় এতিম শিশুদের নিয়ে কাজ করতাম তখন থেকে তার সাথে আমার পরিচয় । ঢাকায় আমি শত শত এতিম শিশুদের নিয়ে কাজ করেছি কিন্তু শত হাজার এতিম ছেলে-মেয়ের ভেতর রিয়ার চাল চলন ছিল ভিন্ন। ঢাকার সেন্টার হোমগুলোতে আশ্রিত শিশু ছেলেমেয়েগুলো সাধারণত: খুব উশৃংখল হয়ে থাকে। কিন্তু রিয়া ছিল শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের। যা আমি সবসময় লক্ষ্য করতাম। ঢাকার সেন্টার হোমে রিয়া ৪/৫ বছর ছিল। ৪/৫ বছর সেন্টার হোমে থাকার পর রিয়ার বয়স যখন ১১/১২ বছর তখন রিয়াকে অনেক বুঝিয়ে তাকে নিয়ে যাই চট্টগ্রামে তার বাবার কাছে। রিয়ার বাবা থাকতো চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থানার চান্দগাও আবাসিকের পাশে এক বস্তিতে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রিয়াকে নিয়ে যখন তার ঘরে যাই তখন ভোর সাড়ে পাঁচটা । রিয়া তার বাবার ঘরে গিয়ে দেখে তার সৎমা তার বাবাকে ছেড়ে চলে গেছে।
৫ বছর পর রিয়াকে নিয়ে তার বাবার কাছে যাওয়াতে বস্তিবাসী কিছু লোকের রোষানলে পড়ি আমি। তারা আমাকে ভুল বুঝে একটি ঘরে আবদ্ধ করে রাখে। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই। এবং তাৎক্ষণিক আবদ্ধ ঘরের ঠিকানাসহ ছবি দিয়ে আমি আমার অসহায়ত্বের কথা বলে ফেসবুকে একটি পোস্ট করি। সাথে সাথেই আমার পোস্টটি নজরে আসে ঢাকায় পুলিশ হেডকোয়ার্টারের একজন ডিআইজি সাহেবের। তিনি দুইমাস পূর্বে চট্টগ্রাম রেঞ্জের এসপি ছিলেন। আমার কাজগুলো তিনি ফেসবুকে লক্ষ্য করে আসছিলেন। আমার ফেসবুক পোস্টটি দেখে তিনি বহদ্দারহাট থানার পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেন এবং দশ মিনিটের মধ্যে থানা পুলিশ আমাকে সেইভ করেন। পুলিশ আসার পর সকল ভুল বুঝাবুঝির অবসানও ঘটে ।
আমি রিয়াকে তার বাবার কাছে বুঝিয়ে দিয়ে তাকে বলে আসি তুই আর কখনো ঢাকায় যাবি না। তোর বাবার কাছেই থাকবি। মন খারাপ হলে আমার সাথে যোগাযোগ করবি। রিয়া তার বাবার কাছে ছিল ৬/৭ মাস। আমি যখন ঢাকা থেকে এসে ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলায় ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা করি তখন রিয়া তার বাবাকে নিয়ে চলে আসে আমার বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধদের সেবামূলক চাকরি করার জন্য ।
কিন্তু বৃদ্ধদের সেবা কেমনে করবে এই ছোট্ট মেয়েটি ? আমি যখন বৃদ্ধদের সেবার কাজগুলো করতাম তখন সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে চেয়ে দেখতো। আমার কাজগুলো একবার দেখার পর সে কাজগুলো আমাকে আর দেখিয়ে দিতে হতো না। সে শিখে নিতো। আমি সবসময় বলি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো বৃদ্ধদের সেবা করা। আর বৃদ্ধ মানুষগুলো যদি হয় মানসিক ভারসাম্যহীন তাহলে সেই কাজগুলো কঠিন থেকে আরও কঠিনতর হয়ে যায়। নিজের মা-বাবা মনে করে রিয়া নামক এই ছোট্ট মেয়েটি অবলীলায় করে যায় বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধদের সেবা ।
রাস্তায় পড়ে থাকা মানসিক ভারসাম্যহীন যেসকল বৃদ্ধগুলোর ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধশ্রমে’ আশ্রয় হয়েছে সেই ছোট্ট মেয়েটি অবলীলায় তাদের সেবা দিয়ে আসছে। আজকে সেই মেয়েটি তার নতুন সংসার জীবন শুরু করতে যাচ্ছে এই বৃদ্ধাশ্রমেই । মানসিক ভারসাম্যহীন এই বৃদ্ধ মানুষগুলো কি এই মেয়েটার সংসার সুখী হওয়ার জন্য দোয়া করবেন? তারা তো পাগল! তারা তো কিছুই বুঝে না। তবে মেয়েটি যে কাজ করে যাচ্ছে তার জন্য আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে এমনিতেই দোয়া চলে আসবে, ইনশাআল্লাহ।
এরপরও তার সুখী জীবনের জন্য আল্লাহর দরবারে আরও যদি দোয়ার দরখাস্তের প্রয়োজন হয় আমি তা অন্তর থেকে করবো। আমি নিজেও দোয়া করি এবং সবার কাছে দোয়া চাই আল্লাহ তায়ালা যেন এই দুঃখী মেয়েটার সংসার জীবনকে সুখী করে দেন।
রিয়া মনির বিয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন, ‘সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমের’ ভাইস চেয়ারম্যান মাইন উদ্দিন, বৃদ্ধাশ্রমের প্রধান উপদেষ্টা হাজী মোঃ শহীদুল ইসলাম শহীদ, বৃদ্ধাশ্রমের সদস্য সচিব শাহ শাকিলা ফ্রিসিয়া ও আমি আব্দুল মালেক ছিলাম রিয়া মনির জীবন পরিবর্তনের ১০ বছরের কারিগর হিসাবে।
* লেখক :
সাড়া মানবিক বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা
ও মানবাধিকার কর্মী