অরুনিমা কাঞ্চি সুপ্রভা শাওন
প্রতিদিন ভোরে সূর্যমুখী বাগানের সকল গাছ অনেকটা প্যারেড দলের মতো পূর্বদিকে মুখ করে থাকে। ওই দিকে সূর্য দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে উপরে উঠতে থাকে। সূর্যের সাথে সাথে সূর্যমুখীগুলোও ধীরে ধীরে নিজেদের দিক পাল্টাতে থাকে। সূর্য যেদিকে যায় তারাও সেদিকে যায়। সবসময়ই এগুলো সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। সূর্য যখন পশ্চিম দিকে অস্ত যায় তারাও তখন পশ্চিমদিক বরাবর থাকে। অস্ত যাবার পরে তারা সারারাত ব্যাপী আবার উল্টো দিকে ঘুরে পূর্বমুখী হয়। নতুন একটা দিনে আবার সূর্যের মুখোমুখি হয়। এভাবে চক্রাকারে চলতেই থাকে। বুড়িয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের এই চক্র চলতেই থাকে।
সূর্যমুখীর কাণ্ড দিনের বেলায় সূর্যকে অনুসরণ করে এবং রাতের বেলায় বিপরীতমুখী হয়ে আবার সূর্যের জন্য অপেক্ষা করে।
উদ্ভিদের মাঝে সাধারণত এই চক্রের উপস্থিতি থাকে না। খুব অল্প সংখ্যক ব্যতিক্রমের মাঝে একটি হচ্ছে সূর্যমুখী। এই চক্রকে ব্যবহার করে সূর্যমুখী ফুল সবসময় সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে। সূর্যের দিকে মুখ করে থাকলে ফুল আকারে বড় হয় এবং পরাগায়ণের জন্য মৌমাছিকে আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে। এই বৈশিষ্ট্য সূর্যমুখীকে টিকে থাকতে সহায়তা করে। যে ফুল আকৃতিতে বড় হবে এবং পরাগায়ণের জন্য অধিক পরিমাণ মৌমাছি পাবে সেই ফুলের বীজ হওয়া তথা টিকে থাকার সম্ভাবনা অবশ্যই বেশি।
সূর্যমুখীর তেল কোলেস্টেরলমুক্ত, ভিটামিন ‘ই’, ভিটামিন ‘কে’ ও মিনারেল সমৃদ্ধ। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগীর জন্যও সূর্যমুখীর তেল নিরাপদ। আর চাষও লাভজনক। বারি তিন খাটো জাতের সূর্যমুখী, এর কান্ডও বেশ শক্ত। ফলে ঝড় ঝঞ্ঝায় ক্ষতি কম হয়।
সূর্যমুখী বীজের স্বাস্থ্য উপকারিতা :
অ্যাজমা ও বাতরোগ নিরাময় হয় :
সূর্যমুখীর বিচিতে রয়েছে উন্নতমানের ভিটামিন-ই, যা এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ও শরীরের বিভিন্ন অংশের জ্বালাপোড়া কমায়। নিয়মিত এটি খেলে অস্টিওআর্থারাইটিস, অ্যাজমা ও বাতরোগ নিরাময় হয়।
হাড় শক্তিশালী করে :
হাড়ের সুস্থতার জন্য ম্যাগনেসিয়াম ও ক্যালসিয়াম দুটোই খুব জরুরি। সূর্যমুখীর বিচি খনিজ পদার্থের খুব ভালো উৎস। তাই এটি সুস্থ হাড় গঠনে সহায়তা করে।
ক্যান্সার প্রতিরোধক :
এই বীজে আছে উচ্চমানের ফাইটোস্টেরল ও লিগন্যানস, যা ক্যান্সার প্রতিরোধক। এসব উপাদান শরীরে ক্যান্সারের কোষ তৈরি হতে দেয় না।
বয়সের ছাপ দূর করে :
এতে আছে এন্টি-এজিং প্রপার্টিজ, যা ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না। এর মধ্যকার ভিটামিন-ই ও বিটা ক্যারোটিন ত্বককে তারুণ্যদীপ্ত করে ও ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখে। বিটা ক্যারোটিন ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখে এবং ভিটামিন-ই ত্বকে বলিরেখা পড়তে দেয় না।
চুল পড়া রোধ করে :
সূর্যমুখীর বীজে রয়েছে ভিটামিন বি-৬, যা মাথার স্কাল্পে অক্সিজেন সাপ্লাই করে চুলপড়া রোধ করে এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও নতুন চুল জন্মাতে সাহায্য করে। এতে আরও রয়েছে কপার, যা চুলের স্বাভাবিক রং ধরে রাখে।
ত্বক কোমল রাখে :
সূর্যমুখীর বিচি ফ্যাটি এসিডের ভালো উৎস হওয়ায় ত্বকের এলাস্টিক ধরে রেখে ত্বককে মসৃণ ও কোমল রাখে।
দাগ দূর করে :
সূর্যমুখীর বিচির মধ্যকার ফ্যাটি এসিড ত্বকে কোলাজেন ও এলাস্টিন তৈরি করে দাগ দূর করে। এতে আরও রয়েছে এন্টিব্যাকটেরিয়াল প্রপার্টিজ, যা জীবাণুর সংক্রমণ থেকে বাঁচায়।
কোলেস্টেরল কমায় :
এই বীজে রয়েছে ফাইটোস্টেরল, যা রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়।
স্নায়ুতন্ত্রকে ভালো রাখে :
এর মধ্যকার ম্যাগনেসিয়াম নার্ভ সেলের অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের মাত্রা কমিয়ে স্নায়ুতন্ত্রকে সঠিকভাবে কাজ করাতে সাহায্য করে।
মানসিক স্বাস্থ্য :
সূর্যমুখীর বিচিতে রয়েছে ট্রিপটোফেন নামক এক প্রকার এমিনো এসিড, যা শরীরে সেরোটোনিন উৎপাদনে সাহায্য করে। সেরোটোনিন হচ্ছে এমন একটি উপাদান, যা ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও হতাশা দূর করে।
লেখক :
উপজেলা কৃষি অফিসার
তারাকান্দা, ময়মনসিংহ।
ছবি : বিসকা ব্লক থেকে তোলা।