মো. আব্দুল মান্নান
তানজিম মুনতাকা শর্বা মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় সারা দেশে প্রথম হয়েছেন। সোমবার (১২ ফেব্রুয়ারি) মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলে এ খবর জানা যায়। ১০০ থেকে তিনি পেয়েছেন ৯২.৫ নম্বর। এত নম্বর পেয়ে জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম হয়ে যাবেন তা তানিজমের নিজের কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল বলে তিনি জানান।
সবই মাওলার ইচ্ছা। আল্লাহ চাইলে মৃতকে জীবিত করতে পারেন এবং জীবিতকে মৃত।
জানা যায়, এবার ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ৫ হাজার ৩৮০টি আসনে এবং ৬৭টি অনুমোদিত বেসরকারি কলেজে ৬ হাজার ২৯৫টি আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এসব আসনের বিপরীতে আবেদন করেছে ১ লক্ষ ৪ হাজার ৩৭৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১ লক্ষ ২ হাজার ৩৬৯ জন শিক্ষার্থী। বাকিরা অংশ নেয়নি। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৪৯ হাজার ৯২৩ জন। তন্মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৫%, পশ্চাদপদ ৫৬৯ জন ও সংরক্ষিত আসনে ৩৯ জনকে ভর্তি করা হবে। এই সবাইকে ছাড়িয়ে তানজিম এবার সারাদেশে প্রথম হয়েছেন।
তানজিম এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেন, জাতীয় মেধায় প্রথম হয়ে যাবো এটা কখনো ভাবি নাই। আমি ছোট ছোট স্বপ্ন দেখতাম। আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর রহমত ও সবার দোয়া আমার উপর ছিল। যে কারণে এরকম একটা পজিশন আমি গেইন করতে পেরেছি। জানা যায়, অন্য ৮/১০ জন যেভাবে আদাজল খেয়ে নামে তানজিম সেভাবে পড়াশোনা করেননি। তিনি বলেন যে, আমি স্বাভাবিকভাবেই পড়েছি। এত লোড নেইনি। লোড আমি নিতে পারি না। প্রতিদিন ১৫-১৬ ঘন্টা করে পড়া হয়নি আমার।
তবে তানজিমের ছোট বেলা থেকে একটা অভ্যাস ছিল, যে চ্যাপ্টার তিনি ধরতেন তা শেষ না করে ক্ষান্ত হতেন না। একই কথা বলেছেন তানজিমের রত্নগর্ভা মা জিনিয়া শারমিন। তিনি বলেন যে, ছোট বেলা থেকেই আমার মেয়ের অভ্যাস ছিল, পড়া শেষ না করে সে পড়ার টেবিল থেকে উঠতো না৷ তানজিম কলেজ জীবনে সকল সিলেবাস শেষ করেছিলেন। যা পড়তেন সব বুঝে পড়তেন। ডেইলি ফিক্সড টাইম মেইনটেইন না করলেও ধরাবাধা সময়ে না পড়লেও তিনি টার্গেট নিয়ে পড়তেন। তিনি একজন অধ্যাবসায়ী ছাত্রী।
তিনি বলেন, আমি সব কোচিংয়েই এক্সাম দিয়েছি। এতে কুয়েশ্চন প্যাটার্নের সাথে নিজেকে পরিচিত করতে পেরেছি। মোটিভেশন ছিল। তাছাড়া মা-বাবা ও শিক্ষকদের দোয়া আমার পক্ষে ছিল। তানজিম অনেক কথা বলেছেন তার সফলতার গল্প বলতে গিয়ে কিন্তু তার মুখ থেকে শোনা যায়নি যে, তার ফাউন্ডেশন বা মূল ভিত কার হাতে গড়ে উঠেছিল? জাতীয় পর্যায়ে যারাই যান আমরা লক্ষ্য করছি সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় তারা কিন্তু পেছনের সেই ছোটবেলার টিচারদের স্মরণ করেন না; তাদের নাম তারা মুখে নেন না। যারা তার বেসিক ঠিক করে দিয়েছিলেন। যার উপর ভর করে এত উঁচুতে উঠা সম্ভব হয়েছে। আমার মনে হয় উনারাই মেইন। কারো ফাউন্ডেশন যখন ঠিক হয়ে যায় তখন তার পেছনে আর এত বেগ পেতে হয় না। উপরের ক্লাসের টিচারদেরও এত সময় তাদের পেছনে দিতে হয় না। তারা ইশারায় বুঝে নিতে পারেন সবকিছু। তানজিম মুনতাকা শর্বা ঢাকা হলিক্রস কলেজে ও ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়েছেন। কিন্তু উনার প্রাইমারি এজুকেশন কোথায় বা কার কাছে হাতে খড়ি হয়েছে তা জানা যায়নি। জানতে পারলে ভাল হতো।
তানজিমের ফলাফলে মুগ্ধ আজ সারাদেশ। তার সাথে শিক্ষক শিক্ষার্থী সবাই সেলফি তুলছেন। বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হচ্ছে। তানজিমের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। তার এ ফলাফলে মুগ্ধ হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হোসেন আব্দুল মান্নান তাকে অভিনন্দন জানিয়ে তার ফেইসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি বলেন,
আমি অভিভূত ও আনন্দিত !
হোসেন আবদুল মান্নান
মেয়েটির অর্জন আমাদের জেলার জন্য গর্বের বিষয়। শুনেছি আমার জন্মস্হান কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলাতেই তাদের পৈত্রিক ভিটা। এতে আরও বেশি গর্ববোধ করছি। আজকের বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত ছোট্ট সংবাদটি অনেকের মত আমারও নজর কেড়েছে। নাম তানজিম মুনতাকা সর্বা। সে আসলেই সর্বেসর্বা। মেডিকেলের চলতি শিক্ষাবর্ষের (সরকারি- বেসরকারি মেডিকেল কলেজ) এমবিবিএসে’র ভর্তি পরীক্ষায় সে সেরাদের সেরা হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম হয়েছে। যেখানে পাশের হার মাত্র ৪৭.৮৩ শতাংশ। সে পেয়েছে ৯২.৫ শতাংশ নম্বর। উল্লেখ্য, দু’বছর আগের পরিসংখ্যান মতে দেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ১০৭ টি।
ঢাকার নামকরা দুটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে ভিকারুননিসা নূন এবং হলিক্রস স্কুল এন্ড কলেজে থেকে তার পড়াশোনা দেখেও আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।
সর্বার জন্য আমাদের নিরন্তর প্রার্থনা। আমার দেশ তার দিকে তাকিয়ে। নারীদের জয়জয়ন্তীর এ পৃথিবীতে সর্বাদের স্হান হোক বরাবরই শীর্ষে।
লেখক: সাবেক সচিব, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ।
মঙ্গলবার রাতে তানজিম তার ফেইসবুক আইডি থেকে একটি চিঠি পোস্ট করেন। সেখানে তিনি বলেন,
আলহামদুলিল্লাহ
আমি তানজিম মুনতাকা শর্বা,
মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমতে ২০২৩-২৪ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় ১ম স্থান অর্জন করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আমার এই সাফল্যের পেছনে সর্বপ্রথম আমার মা-বাবা, আমার শিক্ষকদের দোয়া সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
জুনিয়র ভাইয়া আপুদের জন্য উপদেশ হলো যে, সব সময় মানসিকভাবে খুশি থাকবা তোমরা।
আমাদের জীবনের অনেক কিছুই নির্ভর করে আমাদের মানসিক অবস্থার উপর। ইন্টার লাইফের শুরু থেকে মানসিকভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সকল দিক দিয়ে ।
প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষাগুলোতে খারাপ ফলাফল করলে কোনো সময় হতাশ হওয়া যাবে না। নিজেকে বুঝাতে হবে যে It’s ok to fail.
পূর্বের ভুলসমুহ শোধরাতে হবে এবং চেষ্টা করতে হবে ।
আর নিজের মনের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, আমি পারবো ।
পড়ালেখার ক্ষেত্রে বলবো যে, বেশি বেশি ভুল করবা। বেশি বেশি শোধরাবা। পড়া জমিয়ে রাইখো না ।
সকলের জন্যা শুভ কামনা ।
দেখা হবে বিজয়ে ❤️
সবাই আমার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য দোয়া করবেন। আমি যেন একজন ভালো মানুষ ও ভালো ডাক্তার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করতে পারি 🖤
– তানজিম শর্বা
জাতীয় মেধায় ১ম
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ
তানজিমের জন্য দোয়া রইলো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও ইসলামিক আদর্শ ফলো করে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য উপদেশ থাকলো। পাশাপাশি আশা করি তিনি তার এ অর্জন ছোট বেলার শিক্ষকদেরকে উৎসর্গ করবেন। যাদের হাতে গড়া তার ফাউন্ডেশন।