আজ
|| ১১ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৬শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ২১শে রমজান, ১৪৪৭ হিজরি
ছারছীনার দাখিল ৮৮ ব্যাচমেট মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল
প্রকাশের তারিখঃ ২ আগস্ট, ২০২৫
মো. আব্দুল মান্নান :
নারায়ণগঞ্জের কৃতি সন্তান ছারছীনা দারুস সুন্নাত আলিয়া মাদরাসার প্রাক্তন ছাত্র দাখিল ১৯৮৮ ও আলিম ১৯৯০-এর ব্যাচমেট বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাওলানা মুহিউদ্দিন মোল্লা চলতি ২০২৫ সনের ২৩ জুলাই বুধবার দিবাগত রাত দেড়টায় অর্থাৎ ২৪ জুলাই বৃহস্পতিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। মাওলানা মুহিউদ্দিন মোল্লা ছিলেন ওই ব্যাচমেটদের প্রিয় বন্ধু, আল্লাহওয়ালা, অনন্য, অসাধারণ, ব্যক্তিত্ববান, আদর্শবান ও নানা গুণের অধিকারী একজন মানুষ। তার স্মরণে তার বন্ধুদের উদ্যোগে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে শুক্রবার লন্ডন সময় বিকাল ৪টায় ও বাংলাদেশি সময় রাত ৯টায় এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশি সময় রাত ৯টায় শুরু হয়ে শেষ হয় রাত ১২টায়।
এতে ইউকে, কানাডা ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসী ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মরহুমের ক্লাসমেট, পরিবারের সদস্যবৃন্দ, আত্মীয় স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা অংশ নেন। লন্ডন প্রবাসী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ড. মাহমুদ বিন সাঈদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনান্স বিভাগের ডিরেক্টর হাফেজ মাওলানা মোফাজ্জল হুসাইন, লন্ডন প্রবাসী বিজনেসম্যান মাওলানা আবু তাহের, কানাডা প্রবাসী মাওলানা শরীফ মাহমুদুল হাসান, জেদ্দা প্রবাসী মাওলানা হাবিবুল্লাহ, জেদ্দা প্রবাসী বিজনেসম্যান মাওলানা আবু তায়েব, জেদ্দা প্রবাসী বিজনেসম্যান মাওলানা আবু জাফর, দারুন্নাজাত কামিল মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা জহিরুল ইসলাম, শরীয়তপুর আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মিজানুর রহমান, ভোলা লালমোহন আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মোশাররফ হুসাইন, বাবুগঞ্জ ভুতেরদিয়া আলিম মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা আশরাফুল আলম শাহীন, ময়মনসিংহের ফুলপুর এক্সিলেন্ট স্কুল অ্যান্ড মাদরাসার পরিচালক বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব মাওলানা মো. আব্দুল মান্নান প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত ব্যক্তিত্ববান ও দীনদার একজন মানুষ। তিনি অনেক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হলেও সিম্পল জীবন যাপন করতেন। কোন দেমাগ দেখাতেন না। কাউকে বুঝতে দিতেন না যে, তিনি অনেক ধনী। তিনি কাউকে কখনো হার্ড করে কথা বলতেন না। কানাডা প্রবাসী মাওলানা শরীফ মাহমুদুল হাসান বলেন, মুহিউদ্দিনের কথা ভাবতে গেলে চোখে পানি চলে আসে। সে হারিয়ে গেছে একথা ভাবতে পারি না। কষ্ট হয়। মাহমুদ, গোলাম রব্বানী হারিয়ে যাবে একথা ভাবতে পারি না। আল্লাহ তায়ালা সবাইকে ভালো রাখুক। জেদ্দা প্রবাসী মরহুমের খুব কাছের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু মাওলানা হাবিবুল্লাহ কান্নার জন্য কথাই বলতে পারছিলেন না। কেঁদে কেঁদে তিনি বলেন, মৃত্যুর অল্প কদিন আগে মেসেঞ্জারে মুহিউদ্দিনের সাথে কথা হয়। সে সকলের দোয়া চায় আর বলে, আমার অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলগুলো ক্ষমা করে দিও। জেদ্দা থেকে যুক্ত হন আবু তায়েব নামে মরহুমের একজন ঘনিষ্ঠজন। তিনি বলেন, মুহিউদ্দিন অনেক বড় মনের একজন মানুষ ছিলেন। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. গোলাম রব্বানী বলেন, আমাদের বন্ধুদের যে একটি গ্রুপ আইডি ছিল সেটা হাবিবুল্লাহ চালাতো। তাই সে হাবিবুল্লাহর মাধ্যমে আমাদের সবার কাছেই দোয়া চেয়েছে। আল্লাহ তায়ালা যেন ঈমানের সাথে আমাদেরকে থাকার তাওফীক দান করেন। তিনি আরও বলেন, মাওলানা মুহিউদ্দিন মোল্লা ছিলেন একজন আল্লাহওয়ালা লোক। যেমন ছিল ধন তেমনই ছিল তার মন। হাদীসে আসছে, তিন ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ তায়ালা ফেরত দেন না। ১. মা-বাবার দোয়া, ২. মুসাফিরের দোয়া ও ৩. মজলুমের দোয়া। এর মধ্যে মুহিউদ্দিন তার মা-বাবার দোয়া পেয়েছে। তিনি বলেন, সুখে দুঃখে আল্লাহর রহমতের প্রতি মুহিউদ্দিনের আস্থা ছিল। নিঃসন্দেহে সে একজন আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিল। এসময় তিনি মাওলানা জহির ভাইকে জুমে অ্যাড করার কথা বলে বলেন, দুনিয়াতে যে যার সাথে চলে পরকালেও সে তার সাথে চলবে। জহির ভাই একজন ভালো মানুষ। মুহিউদ্দিন তার সাথে চলতো। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা যেন শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে দীনের উপর, ঈমানের উপর ইস্তেক্বামাত রাখেন। এসময় শরীফ ভাই প্রতি মাসে বা ২ মাসে এ ধরনের একটি প্রোগ্রাম করার প্রস্তাব দেন। ড. মাহমুদ বিন সাঈদ বলছিলেন আমি সেটাই ভাবছিলাম।

যাক, পরবর্তীতে আমরা কখন আবার এভাবে কথা বলবো তা গ্রুপে জানিয়ে দেওয়া হবে, ইনশাআল্লাহ। এসময় আরেকজন ভাই বললেন, মাওলানা মুহিউদ্দিন কতটা ভালো মানুষ ছিলেন, তার মা-বাবা তাকে কতটা ভালবাসতেন তা বলে বুঝানো যাবে না। শুধু এতটুকুতেই অনুমান করেন যে, মুহিউদ্দিনের বাবা তাকে নাম ধরে ডাকতেন না। মাওলানা সাহেব বলে ডাকতেন। মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, মুহিউদ্দিন আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল। তার বাসা আমার বাসা থেকে দেখা যেতো। আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গরিব ছিলাম না। বন্ধুত্বের খাতিরে মহব্বতে অনেক সময় আমি তার মশারী টানিয়ে দিতাম। টাওয়েল বা গামছা গায়ে বসে দুই বন্ধু অনেক সময় একসাথে খানা খেয়েছি। এসব স্মৃতি আজও মনে পড়ে। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে আলা মাক্বাম দান করুক। মুহিউদ্দিনের বাবা এ আলোচনা সভায় যুক্ত হয়ে বলেন, মুহিউদ্দিন খুব ভালো ছিল। সে খুব আল্লাহওয়ালা ছিল, আদবওয়ালা ছিল। আপনারা সবাই মাওলানা মুহিউদ্দিনের জন্য দোয়া করবেন। মরহুমের একজন বোনজামাই বলেন, তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও মিশুক লোক ছিলেন। সব জায়গায় সবাইকে তিনি কনভেন্স করতে পারতেন। জায়েদসহ মাওলানা মুহিউদ্দিন মোল্লার দুই ছেলে ও মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামাতা মাওলানা আব্দুল হান্নান বক্তব্য রাখেন। মেয়ের জামাই মাওলানা আব্দুল হান্নান বলেন, আব্বুকে আমি কম সময় পেয়েছি। খাবার টেবিলে তিনি নানা বিষয়ে কথা বলতেন। উনার ছারছীনার বন্ধুদের গল্প করতেন। অনেক শিক্ষণীয় গল্প শুনতাম। তার অনুপস্থিতি অনেক কষ্ট দেয়। এরপর বক্তব্য রাখেন মরহুমের ছোট ভাই মাওলানা মুফিজ উদ্দিন। তিনি কেঁদে দেন। বলেন যে, ভাই নাই। তার ক্লাসমেট ব্যাচমেট আপনারাই আমাদের বড়ভাই। এসময় তিনি তার ভাইয়ের জন্য সন্তানাদির জন্য সকলের দোয়া চান। সবশেষে মরহুমের বোনজামাই আবেগঘন ভাষায় দোয়া পরিচালনা করেন। সমাপনী বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক যিনি অল্প কিছুদিনের মধ্যে মালয়েশিয়ার নামকরা বিশ্বিবদ্যালয় মালয় ইউনিভার্সিটির শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে যাচ্ছেন সকলের প্রিয় বন্ধু ড. মাহমুদ বিন সাঈদ। তিনি বলেন, মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন মোল্লা চতুর্মুখি প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি আমাদের ছারছীনার দাখিল আলিম (১৯৮৮-১৯৯০) ব্যাচমেট ছিলেন। তার সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ভাল সময় কেটেছে। তাকে বার বার মনে পড়ে। তার অনুপস্থিতিতে তার মা-বাবা, তার সহধর্মিণী ও সন্তানাদি কে কেমন আছেন, কিভাবে দিন গুজরান করছেন এসব খোঁজ খবর নেওয়া, বন্ধুদের সবার অংশ গ্রহণে তার জীবন সম্বন্ধে আলোচনা করে আরও জানা, তার ভালো ভালো গুণগুলো তুলে ধরা যা আমাদের পাথেয় হিসেবে কাজ করবে ও তার রূহের মাগফিরাত কামনার লক্ষ্যে আমরা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম।
আলহামদুলিল্লাহ, অনুষ্ঠান অত্যন্ত সুন্দর ও সার্থক হয়েছে। আগামী দিনে আমরা আরও এ ধরনের অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবো। এসময় তিনি দেশে গেলে মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন মোল্লাসহ আরও যারা ইন্তেকাল করেছেন সকলের কবর জিয়ারত করার চেষ্টা করবেন বলে জানান। এরপর অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলাদেশ নিউজ. All rights reserved.