মো. আব্দুল মান্নান :
মনে হচ্ছে, কাজে লাগতে শুরু করেছে আমাদের প্রচেষ্টা। যদিও সয়েল টেস্টের পরও ব্রিজ হওয়া পর্যন্ত রয়েছে আরও অনেক পর্ব।
আপনারা জানেন, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ৮নং নড়াইল ইউনিয়নের পূর্ব নড়াইল টু কাওয়ালিজান রাস্তায় ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা নাগধরা নদীতে স্বাধীনতার ৫৩ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও হয়নি একটি ব্রিজ। একটি ব্রিজের অভাবে ওই এলাকার মানুষকে কী পরিমাণ দুঃখ দুর্দশার শিকার যে হতে হচ্ছে তা বলে বা লিখে শেষ করা যাবে না।

এক সময় প্রচুর স্রোত ছিল এই নদীতে। নৌকা ডুবে ও গরুর লেজ ধরে নদী পারাপারের সময় হাশেম, তাহের ও বারেক নামে তিনজন ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে এই নদীতে। এরপরও কেউ একটি বাঁশ কাঠের সেতু দেওয়ারও চেষ্টা করেনি। নদীর উত্তর পাশে প্রচুর বিল বিলান্তি ও ধানের জমিজমা রয়েছে। এসব জমির মালিক যারা তাদের অধিকাংশের বাড়ি নদীর দক্ষিণ পাড়ে নড়াইল গ্রামে। ডাবল ভাড়া দিয়েও তারা ঘরে উঠাতে পারেন না তাদের ফসল। আর উত্তর পাড়ে যারা আছেন তারা সবসময় দক্ষিণ পাড়ের উপর নির্ভরশীল। কেননা, বাজার, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, হাসপাতাল ও বিভিন্ন অফিস সবই দক্ষিণ পাড় এলাকায় অবস্থিত। একটি বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতার কার্ড করাতেও যেতে হয় দক্ষিণ পাড়ে। বাজার থেকে রাতে আসতে একটু দেরি হয়ে গেলে বা ঝড় তুফান শুরু হলে মাঝি ঘাটে নৌকা বেধে বাড়ি চলে যান। হাজার ডাকাডাকি করেও কাউকে পাওয়া যায় না। পরে আবার ব্যাকে গিয়ে কেউ কেউ পূর্ব নড়াইল দাখিল মাদরাসা মসজিদেও রাত কাটানোর কথা জানিয়েছেন।
মেম্বার চেয়ারম্যানের নিকট কোন কাজ থাকলে এর জন্যেও যেতে হয় নদীর দক্ষিণ পাড়ে ইউনিয়ন পরিষদে। সবমিলিয়ে উনারা দক্ষিণ পাড় নির্ভরশীল। উত্তর পাড়ে কোন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও নেই। ব্রিজ না থাকায় দক্ষিণ পাড়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ।

যে কারণে বড়রা তো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রয়েই গেছেন; এই আধুনিক যুগে এসে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেও অভিভাবকরা তাদের শিশুদেরকেও শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারছেন না। শুধু একটি ব্রিজের অভাবে উন্নয়ন, শিক্ষা ও সুবিধাবঞ্চিত এসব এলাকার লোকজন। আমার বাড়িও ওই এলাকায়। মধ্য নড়াইল গ্রামে। নাগধরা নদীর উত্তর পাড়ে আমাদের আলহামদুলিল্লাহ কিছু কৃষি জমি রয়েছে।

ছোটবেলায় ওখানে যাতায়াতের সুবাদে ব্রিজের অভাব ও দুর্ভোগের বিষয়টি রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পেয়েছি। এক সময় গরু রাখতাম। গরু বা মহিষের লেজ ধরে এই নদী পার হতাম। ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয়েছে। ভয় ঢুকেছিল তখন যখন শুনেছি, এই নদীতেই প্রবল স্রোতের সময় গরুর লেজ থেকে ছুটে মারা গিয়েছিলেন হাশেম ভাই। আর নৌকা ডুবে মারা গিয়েছিলেন আবু তাহের ও বারেক নামে দুজন। বিষয়টি আমার বিবেককে নাড়া দেয়। মনে মনে ভাবতাম, কিভাবে মানুষের এ কষ্ট দূর করা যায়?

১৯৯৫ সনে কামিল পাস করার মধ্য দিয়ে মোটামুটিভাবে শেষ হয়েছে লেখাপড়া পর্ব। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করি। শিক্ষকতার পাশাপাশি ২০১২’র দিকে একটি পত্রিকায় উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ি। পরে ২০১৭ সনের ১৩ জুন ‘আর কত প্রাণের বিনিময়ে নড়াইলবাসি পেতে পারে একটি ব্রিজ!’ শিরোনামে ‘দৈনিক ময়মনসিংহ প্রতিদিন’ ও ‘দৈনিক তথ্যধারা’ পত্রিকায় আমার একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। এ লেখার জন্য সরেজমিনে এলাকাবাসীর মন্তব্য আনতে গিয়ে নাগধরা নদীতে একটি ব্রিজের দাবি আলোচনায় আসে। উপজেলা প্রকৌশলীর অফিসে যোগাযোগ করি। তখন হালুয়াঘাট উপজেলা প্রকৌশলী ছিলেন শান্তনু সাগর আর সাব-এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন আব্দুর রহমান ভাই। উনাদেরকে আমি নাগধরা নদীর যে জায়গাটাতে ব্রিজ হবে সেটা ভিজিট করিয়েছি। তখন সাব-এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রহমান ভাই চেক দিয়ে বলছিলেন যে, এই নদীতে ব্রিজের জন্য এর আগে আর কেউ আবেদন করেননি। তারপর তাদের পরামর্শক্রমে তৎকালীন ময়মনসিংহ-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য জুয়েল আরেংয়ের বাড়িতে যাই এবং ব্রিজের বিষয়টি আলোচনা করি। তারপর উনার নিকট থেকে একটি ডিও লেটার এনে ২০১৭ সনের ২১ নভেম্বর উহা সচিবালয়ে গিয়ে জমা দিয়ে আসি। ডিও লেটার আনার দিন এমপি সাহেব ধোবাউড়ায় চলে যাওয়ায় সকালে গিয়ে পাইনি। পরে সন্ধ্যায় আবার বৃষ্টিতে ভিজে উনার বাড়িতে যেতে হয়েছিল।
ডিও লেটার জমা দেওয়ার পর উর্ধতন কর্মকর্তারা বিষয়টি আমলে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। পরে শুনেছি, সাবেক এমপি (তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান) মাহমুদুল হক সায়েম ও সাবেক এমপি জুয়েল আরেং আরেকটি ডিও লেটার জমা দিয়েছেন।
তারপর সায়েম এমপি থাকাকালীন আমরা শুনছিলাম যে, ব্রিজটি হয়ে যাবে। পরে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে বন্ধ হয়ে যায় কাজ।
এখন প্রায় বছর খানেক পর শুক্রবার (১৮ জুলাই) সয়েল টেস্ট শুরু হয়েছে নাগধরা নদীতে ব্রিজ নির্মাণের লক্ষ্যে। এসময় ওই এলাকার শওকত ভাই, আলতু, মোফাজ্জল, তফাজ্জল, জহুর, সুলতান ভাই ও আলী আকবরসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। শুনে খুশি হলাম, আলহামদুলিল্লাহ।
এ বিষয়ে জানতে কথা হয় হালুয়াঘাট উপজেলা প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. ওয়াহেদুল হকের সাথে। তিনি বলেন, ঢাকা থেকে এলজিইডির উর্ধতন কর্মকর্তারা জায়গাটি পরিদর্শন করেছেন। তখন শুকনা সীজন ছিল। নদীর তলায় পানি ছিল। এজন্য তাদের ধারণা ছিল ব্রিজ ছোট হবে। পরবর্তীতে বর্ষা মৌসুমে আবার তারা পরিদর্শন করেন। এখন সয়েল টেস্ট হচ্ছে। সয়েল টেস্টের পর ডিজাইন করা হবে। ডিজাইনের পর এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে। ওখানে থাকবে ব্রিজটি কত ফুট দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ হবে, খরচ কি পরিমাণ হবে ইত্যাদি। পরে ওই প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে আরও পরিদর্শন হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সবকিছু যদি পজিটিভ থাকে তাহলে আগামী ৬ মাসের মধ্যে ব্রিজের কাজ শুরু হতে পারে। ব্রিজটি হলে কপাল খুলবে বিশেষ করে বাতাইন্যা পাড়া, কাওয়ালিজান, পূর্ব নড়াইল, কুমুরিয়া ও থল বা নামা এলাকার লোকজনের। সয়েল টেস্ট করতে যাওয়ায় মনে হচ্ছে, আমাদের প্রচেষ্টা কিছুটা হলেও কাজে লাগতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।