মো. আব্দুল মান্নান :
ভাই দোস্ত বুজুর্গ, আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চাইতেন যাতে তার সকল উম্মত জান্নাতি হয়। উনার উম্মত হিসেবে আমাদেরও চাওয়া একটাই। কিন্তু কিছু কিছু রাজনীতিবিদের অবস্থা এত খারাপ! যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শুধু ইশারা ইঙ্গিতে বুঝে নিতে হবে তারা আসলে কারা? তাদের চেনার উপায় কি? তাদের চেনার উপায় হলো- প্রকৃত রাজনীতিবিদের যেসব গুণাবলি থাকা দরকার খোদাভীরুতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মানবতা তা তাদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তারা মঞ্চে উঠেই সর্ব প্রথম আল্লাহর প্রশংসা না করে নবীর উপর দুরুদ না পড়ে বরং দলীয় প্রধানের অতিরিক্ত চাটুকারিতামূলক প্রশংসা করবেন। যা দ্বারা ওই প্রধানের ইজ্জত বাড়ে না বরং কমে। দলীয় প্রধানের প্রশংসা যতটুকু আছে ততটুকু করা খুবই ভালো কিন্তু তারা এর সীমা অতিক্রম করে কয়েক গুণ বাড়িয়ে করবেন। দলীয় প্রধানকে তারা এতটা সম্মান করেন যে, তাদের বিরুদ্ধে কেহ যুক্তিসঙ্গত মন্তব্য করলেও তারা তা সহ্য করতে পারেন না। গায়ে লাগে। অপরদিকে, নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যদি কেহ অপমান করে কথা বলে তাতেও তাদের গায়ে লাগে না। ব্যাপার কি? তাহলে কি নবী মুহাম্মাদ (সা.) তাদের দলীয় প্রধানেরও তলে? এসব নেতারা দলের জন্য ক্ষতিকর। আবার যেসব নেতা কর্মীদের মুখ থেকে অতিরিক্ত প্রশংসা শুনে খুশি হন, সাপোর্ট করেন তারা আরও জঘন্য! যেসব নেতা গঠনমূলক বক্তব্য না দিয়ে, এলাকার মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা ফুটিয়ে না তোলে, ভাঙা রাস্তাঘাট মেরামতের কথা, ব্রিজ কালভার্ট সংস্কারের কথা বা হতদরিদ্র মানুষের অসুবিধা দূর করার কথা না বলে এলাকা উন্নয়নে বা মানুষের অধিকার আদায়ের কথা তুলে না ধরে বরং যতটুকু সময় পান এর সবটুকু বিরোধী দলকে গালিগালাজ করে শেষ করে দেন এরা দল ও দেশের সবার জন্য ক্ষতিকর। এদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। দেখা যায়, অনেক সময় ধর্মীয় সভায় বা আলেমদের কোন অনুষ্ঠানে জেনারেল শিক্ষিত এসব নেতাদের দাওয়াত করা হয়। এমনকি অনেক সভায় বড় বড় আলেম মুরুব্বি রেখে তাদের প্রধান অতিথিও করা হয়। এর কারণ কি? কারণ যাই থাকুক না কেন আমরা পজিটিভলি চিন্তা করবো। দীনদার লোকেরা দুনিয়াদারদের দীনমুখী বা আল্লাহমুখী করতে নানা রকম পদ্ধতি বা পন্থা অবলম্বন করে থাকেন। এর মধ্যে এটা একটা যে, তাকে প্রধান অতিথি বানানো হলো। একটা মাদরাসার সভাপতি বানিয়ে দেওয়া হলো। উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্যটা যদি এমন হয় যে, আমরা যদি তাকে মূল্যায়ন করি তবে তিনিও আমাদের মূল্যায়ন করবেন। এর শোকরিয়াস্বরূপ দীনের পথে এগিয়ে আসবেন। সুন্নাতের উপর আমল করবেন। প্রধান অতিথি মনে মনে এমনও ভাবতে পারেন যে, এসব আলেমের সামনে আমার কি এমন গুণ আছে যে, আমি তাদের প্রধান অতিথি হতে পারি? যেহেতু আল্লাহ তায়ালা আমাকে এতবড় ইজ্জত বা সম্মান দান করেছেন, উলামায়ে কেরামের মাধ্যমে আমাকে তাদের সভাপতি বা প্রধান অতিথি বানিয়ে দিয়েছেন কাজেই আমাকে সেভাবেই চলতে হবে। আমার পক্ষ থেকেও তাদেরকে সম্মান করা উচিৎ। এখানে আলেমদের সম্মান দেওয়ার মানে কি? মানে হলো- আমি আলেমদের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী চলবো। আল্লাহর হুকুমমত, আল্লাহর মনমত চলবো। আল্লাহর রাসূলের অনুসরণ করবো। এমন ফিকির যদি তার ভেতরে ঢুকে যায় তাহলে আলেমরা এবং ওই নেতারা সবাই কামিয়াব। আসলে এমনই হওয়া উচিৎ। কিন্তু এমন ফিকির না করে যদি ফিকিরটা এমন হয় যে, নেতা অনেক ধনী মানুষ। তাকে যদি আমরা প্রধান অতিথি বানাই তাহলে তিনি আমাদের প্রতিষ্ঠানে বড় অঙ্কের অনুদান মঞ্জুর করবেন। আমরা এক দানেই অনেক দূর এগিয়ে যাব। নেতাও যদি এভাবে চিন্তা করেন যে, এরা কিসের আলেম? আমি আলেম না হয়েও আলেমদের প্রধান অতিথি, সভাপতি। আমি যদি তাদের চেয়ে উত্তম না হতাম তাহলে কি তারা আমাকে এরকম পদ দিতো? আমি কি বেডাডা তাদের চেয়ে কম নাকি? পাঁচশর মধ্যে এক হাজার টাকা দিলেই ওরা ভাষা পরিবর্তন করে ফেলে। মারহাবা দিতে দিতে আমার প্রশংসা করতে করতে মুখে ফেনা উঠিয়ে ফেলে। আমি চোর বাটপার থাকলেও আমাকে বিনা হিসাবে তারা বেহেশতে পাঠিয়ে দেয়। তাহলে আমি কম কিসে? ধারণাটা যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে এবং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন প্রধান অতিথি তাহলে কত ক্ষতি চিন্তা করেছেন কি? সাধারণ আলেম তো নয়ই বরং বড় বড় আলেমও তার কাছে তখন মানুষই মনে হয় না। এরকম ধারণা যারা পোষণ করবেন তারা উভয় জাহানেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কখনো কখনো এরকম নেতাদেরকে প্রধান অতিথি বানানো হয় যারা উলামায়ে কেরামের কুরআন হাদীসের বয়ানে বাধা দেয়। আলেমের টুঁটি চেপে ধরতে চায়। তাকে ওখানে প্রধান অতিথি বানানোর উদ্দেশ্যই কি তাহলে খারাপ ছিল? তিনি মাহফিলের খরচটা দিয়ে দিবেন অথবা সরকারি তহবিল থেকে বড় অঙ্কের অনুদান মঞ্জুর করাবেন যা প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো হবে। এরকম দুনিয়াবি উদ্দেশ্য নিয়ে দীনী মাহফিলের সভাপতি বা প্রধান অতিথি বানানো ঠিক নয়। দেখা যায়, এসব প্রধান অতিথিদের বোধ কম। দীনী বুঝ না থাকার কারণে তারা উল্টাপাল্টা করে। তাদেরকে বক্তব্য দেওয়া হয় বয়ান করার জন্য নয় বরং ওই মঞ্চে দাঁড়িয়ে অতি সংক্ষেপে তার জন্য দোয়া চেয়ে আগামী দিনে তার নির্বাচনে পাশে থাকতে বা তাকে ভোট দিতে আবেদন জানিয়ে চুম্বক চুম্বক দুয়েকটি কথা বলে শেষ করে দিবেন। যাতে শ্রোতামন্ডলির মাঝে অতৃপ্তি ভাব না আসে। ওমা! তারা করেন কি? তারা আলেমদের বসিয়ে রেখে লম্বা ওয়াজ শুরু করে দেন। নিজেদের মধ্যে সুন্নাতের আমল না থাকলেও কুরআন হাদীসের জ্ঞান বা বয়ান করার জন্য যেসকল যোগ্যতা লাগে তা না থাকলেও তারা শোনা কিছু কিচ্ছা কাহিনী যথাযথভাবে উপস্থাপন না করে ভুল রেফারেন্সসহ অনেকটা সময় বয়ান করেন। নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের আমল নিজের মধ্যে না থাকলেও নবীকে অত্যাধিক ভালোবাসেন এটা বুঝাতে চেষ্টা করেন। আবার সারা দেশের হাজারো লাখো আলেমের মধ্যে কেহ যদি কোন অপরাধ করে থাকে তাহলে সকল আলেমকে জড়িয়ে অপমান অপদস্ত করে আলেমদের বিরুদ্ধে এরাই বেআদবিমূলক বক্তব্য দেন। বলুন তো, এরকম মানুষের আখেরাত বনবে কিভাবে?
ভাই দোস্ত বুজুর্গ, ব্যবসায়ীর আখেরাত বনবে তার ব্যবসা দিয়ে, মজুরের আখেরাত বনবে তার মুজুরি দিয়ে, এরকমভাবে রাজনীতিবিদের আখেরাত বনবে তার রাজনীতি দিয়ে। এজন্য প্রত্যেকটি মানুষ তার পেশা কিভাবে আদায় করলে তার আখেরাত বনবে সে বিষয়ে তাকে ইলম হাসিল করতে হবে।
ঈমানের পর ইলমের দরজা সবচেয়ে বড়। ইলমের দ্বারা মানুষ আদিল বা ন্যায় বিচারক বনে। যাকে আল্লাহ তায়ালা ইলম দান করেছেন তাকে অনেক বড় নিয়ামত দান করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা নবীদেরকে ইলম দান করেছিলেন। ইলম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য বহুত বড় এক নিয়ামত। এর জিম্মাদারি আমাদেরকে পালন করতে হবে। ইলেমের তাকাজা পূরণ করতে হবে। ইলেমের প্রথম তাকাজা হলো- ইলেমের ইত্তেবা করা। যে জিনিস ফরজ উহার ইলম হাসিল করাও ফরজ। যে জিনিস ওয়াজিব উহার ইলম হাসিল করাও ওয়াজিব। প্রত্যেক আলেম তার ইলেমের উপর কায়েম থাকবে। তার ইলেমের পাবন্দ করবে। দাওয়াতের ইলম শিখে দাওয়াতের আমল করবে। যাকে মাল দেওয়া হয়েছে সে তার মালের ব্যবহার বিষয়ে ইলম শিখবে। যে সন্তান পেয়েছে সে তার সন্তানের হক কেমনে আদায় করবে সে বিষয়ে ইলম শিখবে। যে রাজনৈতিক দলের কোন পদ পেয়েছে সে তার ওই পদ অনুযায়ী যেসব দায়িত্ব রয়েছে সে বিষয়ে ইলম শিখবে এবং সে অনুযায়ী তার রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করবে। আলেমসহ সবাই তার মালের যাকাত পাই পাই হিসাব করে আদায় করবে। তাহলে কোন মুসলমান গরিব থাকবে না।
ভাই দোস্ত বুজুর্গ, তেজারতকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন উহা দ্বারা আখেরাত বনে। ঠিক এমনিভাবে রাজনীতিসহ যার যে পেশা আছে সে বিষয়ে ইলম শিখে সেটাকে এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে যেন এর দ্বারা তার আখেরাত বনে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বুঝার তাওফীক দান করুক।