মো. আব্দুল মান্নান :
ময়মনসিংহের ফুলপুর পৌরসভার শিববাড়ী রোড ও গ্রীণ রোডসহ বিভিন্ন রোডের বেহাল অবস্থা। পৌর ভবনের সামনের রাস্তাটারও কাজ হচ্ছে না দীর্ঘদিন ধরে। চোখে পড়ছে না এসব রোড সংস্কারের উদ্যোগ। তবে এসব অভিযোগের জবাবে পৌর প্রশাসক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান ফারুক জানিয়েছেন, এসব রোড উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ইনশাআল্লাহ শীঘ্রই পৌরবাসীর নিকট তা দৃশ্যমান হবে। এদিকে, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নবঞ্চিত হয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী পৌরবাসী। রাস্তাঘাট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও লাইটিং ব্যবস্থাসহ নানা সাইডে তারা আরও ব্যাপক উন্নয়ন দাবি করেন।
জানা যায়, ২০০১ সনে এ পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২ যুগ অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত হারে হয়নি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, লাইটিং উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও অন্যান্য উন্নয়ন। নানা অসঙ্গতি ও অবহেলা বিরাজ করছে পৌরসভার পরতে পরতে। পৌরসভা সৃষ্টির পর আজও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এমন রাস্তাও রয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত কষ্ট করতে হচ্ছে ও বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে এলাকাবাসীর। ওইসব এলাকার ভুক্তভোগী পৌরবাসী আরও দ্রুত আরও বেশি উন্নয়ন প্রত্যাশা করেন।
সোমবার (৩০ জুন) সকাল ৭টার দিকে সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে কথা হয় উপজেলার জারুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাবরেজিস্ট্রার অফিস সংলগ্ন গ্রীণ রোড নিবাসী মোফাজ্জল হোসেন স্যারের সাথে। তিনি বলেন, বহুদিন ধরে সংস্কার কাজ হয় না গ্রীণ রোডে। ড্রেনেজ ব্যবস্থারও নেই কোন উন্নতি। ফলে এ রোডের বাসিন্দারা বলতে গেলে কষ্টেই আছেন। শিববাড়ী রোডে দেখা হয় কাজিয়াকান্দা মোড়লবাড়ী এলাকার রিকশাচালক তারা মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, এইন্দা রিকশা লইয়া যাওন যায় না। উল্ডা দিক দিয়া আরেকটা গাড়ি আইয়া ফরলে ক্রস করা রিস্ক অইয়া যায়।
এরপর কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সামনে দেখা হয় কাজিয়াকান্দা কামিল মাদরাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাওহীদের সাথে। তিনি প্রতিদিন সকালে এ রোড দিয়ে ছনকান্দায় প্রাইভেট পড়তে যান। তাওহীদ বলেন, শিববাড়ী রোডের একপাশ দেবে গেছে। এই কৃষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রায়ই ট্রাক দিয়ে বীজ এনে রাখা হয়। ট্রাকটি যখন রাস্তার উঁচু অংশে দাঁড় করিয়ে রাখে তখন দেবে যাওয়া সাইড দিয়ে রিকশায় যাওয়ার সময় রিকশা উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। ভয় লাগে। একই রোডের বাসিন্দা আদর্শ মাদরাসা ও এমবিশন স্কুলের মাঝামাঝি মা ভ্যারাইটিজ স্টোরের মালিক বাবুল হোসেন বলেন, রোড ত খারাপ আরও আছে। তবে গ্রীণ রোড আর আমাদের শিববাড়ী রোডের মত এত খারাপ রোড আর চোখে পড়ে না। আমরা খুব কষ্টে আছি। এসময় রোডটি জরুরি ভিত্তিতে তিনি সংস্কারের দাবি জানান। এছাড়া সাবেক এমপি হায়াতোর রহমান খান বেলালের বাড়ি থেকে যে রাস্তাটি মিনি স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে ঢাকা-হালুয়াঘাট আঞ্চলিক মহাসড়কে কুইড়ার ব্রিজে গিয়ে যুক্ত হয়েছে ওখানে অল্প রাস্তা সংস্কার না করায় পৌরসভা সৃষ্টির পর থেকে ওই এলাকার ভুক্তভোগী পৌরবাসীকে আজও পর্যন্ত দ্বিগুণ ভাড়া ও সময় খরচ করে ফুলপুর বাসস্ট্যান্ডে যাতায়াত করতে হয়।
জানা যায়, প্রায় ৮-১০ বছর আগে সাবেক মেয়র ফুলপুর পৌর বিএনপির আহ্বায়ক মো. আমিনুল হকের আমলে অনেকগুলো নতুন রোড পাকাকরণ ও বেশ কিছু পুরাতন রোডের সংস্কার কাজ করা হয়েছিল। এরপর মেয়র হয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি মি. শশধর সেন। তিনি প্রায় ৫টি বছর ক্ষমতায় ছিলেন কিন্তু চোখে পড়ার মত কোন কাজ দেখাতে পারেননি বরং সাবেক মেয়র আমিনুল হক ও সাবেক মেয়র শাহজাহানের আমলে যেসব সড়ক বা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল ওইগুলো চোখের সামনে ভেঙে ভেঙে পড়েছে, সংরক্ষণও করতে পারেননি। গোল চত্বর এলাকায় মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু ওই সৌন্দর্য, রেলিং ও বিভিন্ন সড়ক একটু একটু করে ভেঙে গেছে, যা সময়মত সামান্য খরচেই সংস্কার করা যেতো, সরকারি মাল হেফাজত হতো কিন্তু করা হয়নি। বহু রাস্তা এভাবে এখন চলাচলে অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিরোধমূলক কোন পদক্ষেপটাও তিনি নিতে পারেননি।
জানা যায়, ফুলপুর পৌরসভা সৃষ্টির শুরুলগ্নে সাবেক প্রথম মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম শাহজাহান আনুমানিক ১৪ বছর মেয়র ছিলেন। উনার আমলে যেসব রোড পাকাকরণ করা হয়েছিল এর মধ্যে যেগুলোতে আজও সংস্কার কাজ করা হয়নি সেসব সড়কের খুবই করুণ অবস্থা বিরাজ করছে। এমনকি সাবেক মেয়র আমিনুল হকের করা সড়কগুলোও ভেঙে গেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক মেয়র মি. শশধর সেন নিজে তো কোন রাস্তা নতুন করে করতে পারেননি এমনকি করা রাস্তাগুলোও সেইভ করতে পারেননি। মি. শশধর সেন বর্তমানে জেল হাজতে আছেন। তিনি ফুলপুরকে ফুলের মত সাজাবেন বলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও তার কোন প্রতিশ্রুতি তিনি রাখতে পারেননি। তার মেয়াদকালে ময়লা আবর্জনা ফেলানোর ভাগাড়ের জন্য কিছু জমিক্রয় ব্যতীত কোন দৃশ্যমান উন্নয়ন কাজ করে যেতে পারেননি। জানতে চাইলে শুধু বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানাতেন। জুলাই আন্দোলনের পর পরই মেয়র শশধর সেনের পতন ঘটে। এরপর থেকে পৌর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান ফারুক। উনার নিকট পৌরবাসীর প্রত্যাশা অনেক।
জানতে চাইলে পৌর প্রশাসক মেহেদী হাসান ফারুক বলেন, পৌরবাসীর জন্য কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও সেবাদানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে আমরা ৫টি রাস্তার কাজ শুরু করেছি। ফুলপুর সরকারি কলেজ রোড, কলের বাড়ি রোড, গোদারিয়া রোড, চরপাড়া রোড ও কদমতলী রোডের কাজ ইজিবি টেন্ডারের মাধ্যমে শুরু করেছি। এগুলো প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে। তিনি আরও বলেন, এডিবির একটা বরাদ্দ আছে। প্রায় ২৫টি প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে। এগুলো (চলতি) জুলাই মাসে কাজ শুরু হবে, ইনশাআল্লাহ। ইতালি রাইস মিল এলাকায় জলাবদ্ধতা দূরীকরণের লক্ষ্যে একটি বড় ড্রেন করা হবে। উহা খরিয়া নদীতে গিয়ে পতিত হবে। ওই ড্রেনটি হলে ওই এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে। এতে প্রায় ১০ কোটি টাকা খরচ হবে। এটা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, অর্থ পেলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। এছাড়া ফুলপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যাত্রী ছাউনি সংলগ্ন স্থানে যে পাবলিক টয়লেটটি রয়েছে এটাকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংস্কার করা হচ্ছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে এর দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখা যাবে। এ কাজটি শেষ হলে এটি ইজারা দিয়ে দেওয়া হবে।
শিববাড়ী রোড ও গ্রীণ রোড সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব রোড উন্নয়নের বরাদ্দের জন্যেও আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে শীঘ্রই কাজ ধরা হবে, ইনশাআল্লাহ।