ড. মাহমুদ বিন সাঈদ :
আরবি ভাষা একটি গভীরভাবে প্রোথিত সাংস্কৃতিক, বৌদ্ধিক এবং আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার যা কেবল একটি ভাষার বাইরেও বিস্তৃত। আমার পথ আমাকে একটি অ-আরবি-ভাষী জাতির (বাংলাদেশ) একটি ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা থেকে ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা শিক্ষায় পিএইচডি প্রোগ্রামে নিয়ে গেছে, ঐতিহ্যবাহী এবং সমসাময়িক উভয় শিক্ষাগত পরিবেশে চলাচল করে। আমার যাত্রার সময়, আমি বিভিন্ন শিক্ষাগত বাধার সম্মুখীন হয়েছি, বিভিন্ন শিক্ষার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছি এবং বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যে আরবি শেখাতে সাহায্য করেছি। এই ব্লগটি আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং কীভাবে এটি বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যে অ-স্থানীয় ভাষাভাষীদের আরবি শেখানোর আরও সাধারণ সমস্যাগুলিকে উপস্থাপন করে তা বর্ণনা করে।
ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসায় আরবি: সম্মানিত কিন্তু সীমাবদ্ধ
আমার আরবি শেখা শুরু হয়েছিল (১৯৮০-এর দশকে) একটি বাংলাদেশী ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসায় যেখানে আরবি ভাষা মূলত ইসলাম এবং ইসলামী গ্রন্থগুলি বোঝার জন্য একটি প্রেরণাদায়ক হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হত। সরকারী অর্থায়নে পরিচালিত আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা অনুসারে পরিচালিত পাঠ্যক্রমটিতে আল-নুখাব আল-আরাবিয়া, বাকুরাতুল আদাব, মিরকাতুত-তারজামা, আল-আদাবুল-আসরি, আল-মুনতাখাবুল-আরাবী, আল-বালাগাহ, রূপবিদ্যা (সরফ) এবং ধ্রুপদী আরবি ব্যাকরণ (নাহু) এর মতো পাঠ্যপুস্তকের উপর জোর দেওয়া হয়েছিল। এটি ব্যাকরণে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। তবে এটি আধুনিক স্ট্যান্ডার্ড আরবি (MSA) যোগাযোগ দক্ষতার ক্ষেত্রে খুব বেশি অবদান রাখতে পারেনি।
কথা বলা, শোনা, এমনকি লেখার ক্ষেত্রেও তেমন কোন অভ্যাস ছিল না। পরিবর্তে, আমরা বাক্য গঠনের নিয়মগুলো মুখস্থ করেছিলাম এবং নথি অনুবাদ করেছিলাম। শিক্ষক-কেন্দ্রিক পাঠ্যক্রমের একচেটিয়া লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের আরবি পাঠের বোধগম্যতার উপর। বিভিন্ন শিক্ষার ক্ষেত্রে লক্ষণীয়ভাবে অভাব ছিল। কারণ নির্দেশনা ধারাবাহিকভাবে একটি একক পাঠ এবং মানসম্মত প্রশ্নোত্তরের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল। বিভিন্ন শিক্ষার্থীর চাহিদা বা তাদের দক্ষতার বিভিন্ন স্তরের দিকে খুব কমই মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। তত্ত্ব এবং অনুশীলনের মধ্যে এই দূরত্বের কারণে আরবি ভাষাকে দূরে মনে হত। এটি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উচ্চতর কিন্তু ভাষাগতভাবে অপ্রাপ্য বলে বিবেচিত হত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি পাঠ্যক্রম: বিস্তৃত বিষয়বস্তু, সীমিত শিক্ষাগত সংস্কার
যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ধ্রুপদী এবং আধুনিক উভয় আরবি সাহিত্যকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সম্প্রসারিত হয়েছিল, তবুও বেশিরভাগ শিক্ষাদান ঐতিহ্যবাহী ব্যাকরণ-অনুবাদ কৌশলের উপর ভিত্তি করেই চলছিল। বেশিরভাগ প্রশিক্ষকের আধুনিক ভাষা শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে খুব কম অভিজ্ঞতা ছিল কারণ তারা মূলত দ্বিতীয় ভাষার শিক্ষাদানের পরিবর্তে আরবি সাহিত্য অধ্যয়নে প্রশিক্ষিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা সমসাময়িক লেখা এবং প্রাক-ইসলামিক কবিতাসহ বিভিন্ন ধরণের সাহিত্য পড়ত, কিন্তু এই নির্দেশনা বাস্তব-বিশ্বের কথোপকথনের জন্য সীমিত সুযোগ প্রদান করত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের অন্যান্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি শিক্ষাদান এখনও পুরানো শিক্ষাদানের আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত, যার মধ্যে অনেকগুলো ঔপনিবেশিক যুগের ভাষা শিক্ষা কাঠামো থেকে উদ্ভূত এবং এই মডেলগুলো আধুনিক যুগের শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের চাহিদা পূরণ করে না। যদিও একাডেমিক পরিবেশ আরবি সাহিত্য সম্পর্কে আমার বোধগম্যতা উন্নত করেছে। তবে এটি আমাকে আরবি ভাষায় বাস্তব-বিশ্বের যোগাযোগের জন্য পর্যাপ্তভাবে সজ্জিত করতে পারেনি।
বাংলাদেশ এবং যুক্তরাজ্যে আরবি ভাষা শিক্ষা: একটি আদর্শ পরিবর্তন
আমার শিক্ষাগত এবং পেশাগত বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল আরবি ভাষার শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত। ২০০২ সালে যখন আমি প্রথম বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি, তখন আমি এমন শিক্ষার্থীদের পেয়েছি যারা আরবি শেখার ব্যাপারে সত্যিই আগ্রহী ছিল। তবুও, এই উৎসাহ সত্ত্বেও, পাঠ্যক্রমটি বেশিরভাগই পাঠ্য-ভিত্তিক ছিল এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাদান বা যোগাযোগ দক্ষতার উপর খুব কম মনোযোগ দিত। পাঠ্যক্রম নকশা এবং শিক্ষার্থীর প্রেরণার মধ্যে পার্থক্য অ-স্থানীয় ভাষাভাষীদের আরবি শেখানোর জন্য আরও গতিশীল এবং উদ্দেশ্য-চালিত পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এই বৈষম্য আমাকে নতুন ধারণাগুলো বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল:
যেমন ক) সংলাপ-ভিত্তিক কার্যকলাপ, খ) শব্দভান্ডার বৃদ্ধি এবং গ) প্রায়শই স্ব-নির্মিত যোগাযোগমূলক আরবি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনটিই আধুনিক স্ট্যান্ডার্ড আরবি (MSA) তে খুব বেশি শিক্ষাদান করেনি। বেশিরভাগ কোর্সই সকল যুগের আরবি সাহিত্যের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল।
২০০৬ সাল থেকে, যুক্তরাজ্যে আরবি শেখানোর আমার অভিজ্ঞতা তার সাথে বেশ কিছু নতুন শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। যার বেশিরভাগই বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের কারণে তৈরি হয়েছে। যাদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য একাডেমিক, পেশাদার এবং ধর্মীয় লক্ষ্যের সাথে যুক্ত। ফলস্বরূপ, বিভিন্ন চাহিদা এবং প্রত্যাশা পূরণের জন্য আমাকে আমার শিক্ষাদানের কৌশলগুলো পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
ফলস্বরূপ, আমি আমার শিক্ষাদানের কৌশলগুলো সম্পূর্ণরূপে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়েছিলাম এবং ভাষাগত প্রাসঙ্গিকতা উন্নত করতে ও শিক্ষার্থীদের মিথস্ক্রিয়াকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিকভাবে সমৃদ্ধ উপায়ে উৎসাহিত করার জন্য সাংস্কৃতিক বিষয়বস্তু ব্যবহার শুরু করেছিলাম। স্থির জ্ঞান প্রদান থেকে শুরু করে গতিশীল শ্রেণীকক্ষ কার্যকলাপে শিক্ষার্থীদের জড়িত করা পর্যন্ত, আমার শিক্ষাদানের ধরণ পাঠ্যপুস্তক-ভিত্তিক থেকে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। INSET (ইন-সার্ভিস এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং) এ অংশগ্রহণ এবং যুক্তরাজ্যে আমার সহকর্মীদের পাঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, আমি বাংলাদেশে প্রয়োগ করা পদ্ধতিগুলির উল্লেখযোগ্য শিক্ষাগত পরিবর্তন সম্পর্কে আরও সচেতন হয়েছি। এটি আমাকে শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, পার্থক্যমূলক শিক্ষা, গঠনমূলক মূল্যায়ন, এবং প্রতিক্রিয়া এবং যোগাযোগের উপর জোর দেওয়ার দিকে পরিচালিত করেছিল। প্রতিফলিত অনুশীলন এবং অভিযোজিত শিক্ষাদানের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি, এই পেশাদার বিকাশের সুযোগগুলি আমাকে বহুসংস্কৃতির, অ-স্থানীয় পরিবেশে শিক্ষার্থীদের অসংখ্য চাহিদা পূরণের জন্য আমার নিজস্ব শিক্ষাদান কৌশলগুলি মূল্যায়ন এবং অভিযোজিত করতে পরিচালিত করেছিল।
ওয়ারউইকে পিএইচডি: কেন এর পেছনে তা বোঝা
উপরোক্ত জটিল বিষয়গুলি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, আমি ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি শিক্ষায় পিএইচডি প্রকল্প গ্রহণ করেছি (২০১৮-২০২৩)। এই মাল্টিপল কেস স্টাডি (এমসিএস) যুক্তরাজ্যের তিনটি স্বাধীন মুসলিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে (আইএমএসএস) কীভাবে আরবি শেখানো হয় তা পরীক্ষা করে। এটি ছয়টি দিক পরীক্ষা করে: আরবি শিক্ষকদের শিক্ষাগত পটভূমি; শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের প্রেরণা; সম্পদ; শিক্ষাগত অনুশীলন; মূল্যায়ন; এবং আরবি ভাষা শিক্ষক এবং কেস স্কুলের ছাত্ররা আরবি শেখা এবং শেখানোর ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হন। গুণগত পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে শিক্ষকদের সাথে আধা-কাঠামোগত সাক্ষাৎকার, শিক্ষার্থীদের সাথে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, নথি বিশ্লেষণ এবং শ্রেণীকক্ষ পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অনুসন্ধানগুলি ইঙ্গিত দেয় যে শিক্ষকদের শিক্ষাগত পটভূমি এবং বিষয়গত জ্ঞান তাদের শিক্ষাগত অনুশীলনকে গঠন করে এবং এই স্কুলগুলির শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলিও তুলে ধরে। গবেষণাটি কুরআনের আরবি এবং আধুনিক মানসম্মত আরবিকে পাঠ্যক্রমের বিষয় হিসাবে শেখানোর মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট করে। এই গবেষণায় শিক্ষাদান এবং শেখার জন্য বিভিন্ন প্রেরণাদায়ক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। উপরন্তু, গবেষণাটি পরামর্শ দেয় যে উপলব্ধ বিধান শিক্ষার্থীদের আরবি শেখার আকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণরূপে পূরণ করে না। স্কুলের প্রধান শিক্ষক, আরবি প্রধান এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য এই গবেষণার নীতিগত প্রভাবগুলির মধ্যে রয়েছে তহবিলের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয়তা, উপযুক্ত সম্পদ এবং আরবি শিক্ষকদের চাকরিকালীন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ। যোগ্য শিক্ষকের সংখ্যার অভাব এবং সকল ক্ষেত্রে যোগাযোগের ক্লাস ঘন্টার অভাবকে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আধুনিক বিদেশী ভাষা (MFL) হিসাবে আরবি ভাষার জন্য উপযুক্ত সম্পদ এবং উপকরণের অভাব একটি সাধারণ চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিবেচিত হয়। গবেষণার সীমাবদ্ধতা, ব্যক্তিগত প্রতিফলন এবং ভবিষ্যতের গবেষণার সম্ভাবনাও চিহ্নিত করা হয়েছে।
লেখক :
সভাপতি – যুক্তরাজ্য গবেষণা ও শিক্ষা
সাবেক আরবি প্রভাষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ।

অনুবাদক : মো. আব্দুল মান্নান