মো. আব্দুল মান্নান :
২০ জুন শুক্রবার রাত সোয়া ৮টার দিকে ঢাকা-হালুয়াঘাট আঞ্চলিক মহাসড়কে ময়মনসিংহের ফুলপুর পৌরসভার বাশবাড়ি এলাকায় মনোয়ার হোসেনের বাসার সামনে শ্যামলী বাংলা গাড়ির চাপায় মাহিন্দ্রের মধ্যে থাকা যাত্রীদের ঘটনাস্থলে ৬জনসহ মোট ৮ জন মারা গেছেন। ৩ জন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

মৃত ৮ জনের মধ্যে একজন হলেন ফুলপুর পৌরসভার জাগির কাজিয়াকান্দা পশ্চিম (বড়বাড়ি সংলগ্ন) গ্রামের তিন চিল্লার সাথী মো. জসিম উদ্দিন ও হামিদা খাতুনের ছেলে দিনমজুর মো. ফরিদ মিয়া (৩৮)। এই ফরিদ মিয়ার ভাঙা টিনের ছাপড়াটুকু ছাড়া আর কিছু নেই। বাইরে কোন জমিজমা বা সম্পদ নেই। দিনমজুরি করে চলতো তার সংসার। তিনি মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা এখন কেমন আছেন? কেমনে চলে তাদের সংসার জানতে ইচ্ছে করে না কি আপনাদের? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করে।

এজন্যই আজ ২৩ জুন সোমবার সকাল ৭টার দিকে সরেজমিন আমরা গিয়েছিলাম ফরিদ মিয়ার ভাঙা টিনের ছাপড়ায়। দেখে আসলাম। খুবই করুণ অবস্থা। বেড়া, চাল সবই ভাঙা। বৃষ্টির সময় ঝরঝর করে পানি পড়ে বিছানায়। উঠে বসে থাকতে হয় বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে। আজ গিয়ে দেখি, মেঝেতে মাটির মধ্যে ছালার বস্তা বিছিয়ে শুয়ে আছে ফরিদের কন্যা হোসনে আরা বেগম আর পাশে বসে আছেন তার বিধবা স্ত্রী কামরুন্নাহার।
আনুমানিক ১৫ বছরের একটি ছেলে ফরিদের। নাম মুস্তাক্বীম। যার এখন পড়াশোনা করার কথা। প্রাণোচ্ছল থাকার কথা কিন্তু তাকে দেখাচ্ছিল মনমরা। তাকে বাধ্য হয়ে কাঁধে নিতে হয়েছে তার বিধবা মা ও অসহায় ছোট বোনের সাংসারিক খরচের দায়ভার। সে আগে তার নানার বাড়ি বিহারাঙা এলাকায় একটি মাদরাসায় নাজেরা পড়তো। ছেলেটিকে দেখে খুবই কষ্ট লাগলো। তাকে এ বয়সে পড়াশোনাতেই মানাতো ভালো কিন্তু সে এখন ছনকান্দা বাজারে সবজির দোকানে কাজ করে। তার মা গৃহিণী কামরুন্নাহার জানালেন, ‘স্বামী (ফরিদ মিয়া) ছিলার বাজার থেকে মাহিন্দ্রে উঠেছিলেন। সম্ভবত সরচাপুরে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু মাত্র ১-২শ গজ পথ যাওয়ার পরই বাসের নিচে পড়েন তিনি। তিনি কোন সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। টুকটাক দিনমজুরি কাজকাম করেই চলতো তাদের সংসার। এখন তাও বন্ধ। এমতাবস্থায় ছেলেমেয়ে নিয়ে হঠাৎ যেন সাগরের মধ্যে পড়ে গেছি। কোনো কূল কিনারা দেখতে পাচ্ছি না। ওখান থেকে কিভাবে যে পাড়ে উঠবো তা বুঝতে পারতেছি না। চিন্তায় কিচ্ছু ভাল্লাগে না।’

এসময় এ প্রতিবেদকের সাথে থাকা তিন চিল্লার সাথী নকলার মুনির হোসেন তাকে প্রাথমিকভাবে কিছু সামান্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এছাড়া তিনি মেয়েটিকে মহিলা মাদরাসায় ভর্তি করার পরামর্শ দেন। মহিলা মাদরাসায় ভর্তি করলে এর লেখাপড়ার খরচটাও তিনি দিবেন বলে জানান।
জানতে চাইলে ফরিদের ছেলে মুস্তাক্বীম জানান, তারা যে ঘরে আছেন এটা তার দাদার শ্বশুর বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ওয়ারিশের জায়গা। তার দাদার প্রকৃত বাড়ি ফুলপুর সদর ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামে আর মুস্তাক্বীমের নানার বাড়ি উপজেলার রূপসী ইউনিয়নের বিহারাঙা গ্রামে। ছোটবোন হোসনে আরা বেগম বিহারাঙায় তার নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিল। সবমিলিয়ে তারা অনেক অসহায় একটি পরিবার। ফুলপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসকসহ সরকারের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ধনাঢ্য মানবিক ব্যক্তিরা যদি ফরিদের এই অসহায় পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়াতেন তাহলে ফরিদের আত্মাসহ পরিবারটি কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পেতেন। আপনারাও হতেন অনেক সাওয়াবের ভাগী। আল্লাহ তায়ালা সকলের সহায় হোক।