আজ
|| ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ২৯শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ || ২৩শে শাবান, ১৪৪৭ হিজরি
স্মরণ : সাহিত্যিক সাংবাদিক পথপ্রদর্শক মুহিউদ্দিন খান
প্রকাশের তারিখঃ ২৪ এপ্রিল, ২০২৫
অনলাইন ডেস্ক :
মাওলানা মুহিউদ্দিন খান একটি নাম, একটি ইতিহাস। যেকোনো একটি পরিচয়ের ভেতর তাঁকে আটকে ফেলার সাধ্য নেই।
এমন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, সব্যসাচী আলেম আমাদের এই অঞ্চলে খুব কমই জন্মেছেন। তিনি একাধারে ছিলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক, অনুবাদক, ইসলামী চিন্তাবিদ, বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও মাসিক মদীনার সম্পাদক।
উনার জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ এপ্রিল। বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার ছয়চির গ্রামের মাতুলালয়ে।
পৈতৃক নিবাস ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার আনসার নগরে। পিতা ছিলেন বিশিষ্ট সাধক পুরুষ, প্রবীণ শিক্ষাবিদ মৌলভী হাকিম আনসার উদ্দিন খান। আর উনার মাতার নাম মোছাঃ রাবেয়া খাতুন।
তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় পাঁচবাগ ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসায়। সেখানে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন তিনি। মায়ের ইন্তেকালের পর তিনি মাতামহীর তত্ত্বাবধানে থাকতেন। পরে সেখানকার নিকটবর্তী তারাকান্দি মাদরাসায় ১৯৪৭ সালে ভর্তি হন মুহিউদ্দীন খান। কিন্তু সেখানে মন বসাতে না পারায় তিনি দু বছর পর আবার পাঁচবাগ মাদরাসায় ফিরে আসেন।
পাঁচবাগ মাদরাসা থেকে ১৯৫১ সালে আলিম ও ১৯৫৩ সালে স্কলারশিপসহ ফাজিল পাস করেন।
এরপর ১৯৫৩ সালে ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন তিনি। ১৯৫৫ সালে হাদিস বিষয়ে কামিল ও ১৯৫৬ সালে ফিকহ বিষয়ে কামিল ডিগ্রি লাভ করেন। আলিয়া ধারায় লেখাপড়া করলেও খান সাহেব কওমি ধারার সাথে বেশি সম্পর্ক রেখে চলতেন।
মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ছাত্রজীবনেই সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তিনি ১৯৬০ সালে ‘মাসিক দিশারী’, ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ‘সাপ্তাহিক নয়া জামানা’ সম্পাদনা করেন।
১৯৬১ সাল থেকে আমৃত্যু ‘মাসিক মদীনা’ সম্পাদনা করেছেন। এক সময় তাঁর সম্পাদিত ‘আজ’ সাহিত্য মহলে সাড়া জাগায়।
মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ১৯৮৮ সালে সৌদি ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রাবেতায়ে আলমে ইসলামী’র কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন। এর মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক মহলেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
দেশের বাইরেও বাংলাভাষীরা তাঁর লেখার গুণমুগ্ধ পাঠক। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ প্রবাসে মরহুম খান নন্দিত লেখকের মর্যাদা পেয়েছেন।
এছাড়াও তিনি ছিলেন মু’তামার আল আলম আল ইসলামী এর বাংলাদেশ শাখার প্রেসিডেন্ট। জাতীয় সীরাত কমিটি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। নাস্তিক-মুরতাদ প্রতিরোধ আন্দোলন ইসলামী মোর্চার সভাপতি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের প্রধান।
প্রতিভাধর মাওলানা মুহিউদ্দিন খান বাংলা ভাষায় ইসলামি সাহিত্য রচনা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে অনন্য সাধারণ ভূমিকা পালন করেছেন।
বাংলা ভাষায় সীরাত সাহিত্যের বিকাশে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা. সাহিত্যের আলাদা একটা বিষয় হতে পারেন এবং সেটা হতে পারে অতুলনীয়, এই ধারণার বাস্তবতা দিয়েছেন তিনি। আজ সীরাত সাহিত্য বাংলা ভাষায় একটি সমৃদ্ধ শাখা।
তিনি প্রায় ১০৫ টি গ্রন্থ অনুবাদ ও রচনা করেছেন। পবিত্র কুরআনকে বাংলা ভাষীদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তুলতে মরহুমের ভূমিকা প্রতিষ্ঠানতুল্য।
তাঁর সম্পাদিত ‘মাসিক মদীনা’র প্রশ্নোত্তর সঙ্কলন ‘সমকালীন জিজ্ঞাসার জবাব’ ২০ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।
মাসিক মদীনা লাখো মানুষকে বছরের পর বছর ইসলামি সাহিত্যের মৌলিক ধারার সাথে সম্পৃক্ত রেখেছে।
মাসিক মদীনা এবং মাওলানা মুহিউদ্দিন খান যেন অভিন্ন এক পরিচিতি। আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. বিরচিত ৮ খণ্ডের কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ ‘মাআরিফুল কুরআন’ তিনি উর্দু থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে এটি প্রকাশিত হয়।
১৪১৩ হিজরীতে মদীনার বাদশাহ ফাহাদ কুরআন মুদ্রণ প্রকল্পের উদ্যোগে ‘মাআরিফুল কুরআন’ সংক্ষিপ্তাকারে ১ খণ্ডে বাংলায় ছেপে সারা দুনিয়ায় বাংলাভাষীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।
ইমাম গাজ্জালীর ‘এহ ইয়াউ উলুমিদ্দিন’ ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ‘ইনসানিয়ত মওত কে দরওয়াযে পর’ ( জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ) গ্রন্থের স্বার্থক অনুবাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান রহ.।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত মদীনা পাবলিকেশন্স ১৯৫৭ সাল হতে এ পর্যন্ত কুরআন, হাদীস, সীরাতে রাসূল, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অভিধান বিষয়ক ৬০০ মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশ করেছে।
তিনি ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ময়মনসিংহের গফরগাঁও নির্বাচনী এলাকা থেকে জমিয়তের প্রার্থী হিসেবে খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালের সম্মেলনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে তিনি নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থেকে ২৫ জুন ২০১৬ সালে তিনি পরলোকগমন করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। শ্রদ্ধাঞ্জলি।
* মেসবাহ খানের আইডি থেকে সংগৃহীত।
Copyright © 2026 দৈনিক বাংলাদেশ নিউজ. All rights reserved.