আজ
|| ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ || ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ || ২৮শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি
মাওলানা মাসূম বিল্লাহ, ঝালকাঠি :
● রোযার হাকীকাত
নামাযের পরই মুসলমানদের প্রতি মহান আল্লাহ তা'আলা যে ইবাদাত ফরয করেছেন, তা হচ্ছে রমযান মাসের রোযা। সুবহে সাদেক থেকে সন্ধা পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাসসহ সকল ধরণের পাপাচার বন্ধ রাখার নামই রোযা। নামাযের ন্যায় রোযাকেও আবহমানকাল থেকে সকল নবীর শরীয়তেই ফরয করা হয়েছে। অতীতের সকল নবী এবং রসূলগণের উম্মতরা এমনিভাবেই রোযা রাখত, যেমন রাখছেন শেষ নবী মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আ'ল্ইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতগণ। অবশ্য রোযার হুকুম আহকাম, রোযার সংখ্যা, রোযার সময় ও মুদ্দাতের ব্যাপারে বিভিন্ন নবীগণের শরীয়তে পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, প্রত্যেক ধর্মেই রোযা রাখার প্রথা কোনো না কোনো প্রকারে বর্তমান আছে। অবশ্য তারা এতে নিজেদের ইচ্ছামত অনেক কিছু যোগ করে নিয়েছে এবং নানাভাবে এর আসল রূপ বিকৃত করে দিয়েছে। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমাদের জন্য রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল।"
----- (সূরা আল বাকারাঃ ১৮৩)
■■ এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর তরফ থেকে যত শরীয়াত দুনিয়ায় নাযিল হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতেই রোযা রাখার বিধি-ব্যবস্থা ছিল। চিন্তা করার বিষয় এই যে, রোযার মধ্যে এমন কি বস্তু নিহিত আছে, যার জন্য আল্লাহ তা'আলা সকল যুগের শরীয়াতেই এর ব্যবস্থা করেছেন।
■■ মানুষেরে সমগ্র জীবনকে ইবাদাত অর্থাৎ আল্লাহর বন্দেগীতে পরিণত করাই হচ্ছে ইসলামের আসল উদ্দেশ্য। মানুষ জন্মগতভাবেই আল্লাহর বান্দাহ, আল্লাহর বন্দেগী তার প্রকৃত স্বভাব। কাজেই ইবাদাত অর্থাৎ চিন্তা ও কর্মের দিক দিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর বন্দেগী পরিত্যাগ করা মানুষের পক্ষে উচিত নয়। জীবনের প্রত্যেকটি কাজ এবং সকল সময় আমাদের চিন্তা করা উচিত যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি কিসে, আর কোন জিনিসে তার অসন্তোষ। তারপর তাঁর সন্তুষ্টির দিকেই যাওয়া উচিত এবং যেদিকে তাঁর সকল অসন্তুষ্টি সেদিক থেকে ঠিক তেমনি দূরে থাকা উচিত! যেমন আগুন থেকে প্রত্যেকটি মানুষ দূরে থাকে।
■■ যে পথ আল্লাহ পছন্দ করেন সেই পথে চলা এবং যে পথ তিনি পছন্দ করেন না সেই না চলাই মানুষের কর্তব্য। এভাবে মানুষের সমগ্র জীবন যখন গঠিত এবং পরিচালিত হবে, তখন প্রমাণিত হবে যে, সে যথাযথভাবে আল্লাহর বন্দেগী করছে এবং وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالاِنْسَ اِلاَّ لِيْعْبُدُوْنَ ـ (الذريت) মানুষ ও জ্বীন জাতিকে কেবলমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্যই সৃষ্টি করেছি------মহান আল্লাহ তা'আলার এ ঘোষণা অনুসারে সে নিজের জন্মের উদ্দেশ্য সার্থক করতে পেরেছে।
■■ কালিমা/ঈমান, নামায, রোযা, হাজ্জ্ব ও যাকাত নামে পরিচিত যে ইবাদাতগুলো মানুষের প্রতি ফরয করা হয়েছে, মানুষকে সেই আসল ইবাদাতের জন্য তৈরি করাই হচ্ছে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য! এগুলো ফরয সাব্যস্ত করার অর্থ এ নয় যে, গুণে গুণে দিনে রাতে পাঁচবার নামায পড়লেই ঐবং রমযান মাসে ত্রিশ দিন ধরে সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ক্ষুধা-পিপাসার কষ্ট সহ্য করলেই, মালদার হলে বছরে একবার যাকাত এবং জীবনে একবার হাজ্জ্ব আদায় করলেই মান আল্লাহর প্রতি মানুষের সব কর্তব্য পুরোপুরি পালন হয়ে গেল এবং তারপর মানুষের পূর্ণ আযাদী-যা ইচ্ছে তাই করতে পারে বা পারবে! বরং এসব ইবাদাতগুলোর ভিতর দিয়ে মানুষকে সঠিকভাবে গঠন করা এবং মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহ তা'আলার বন্দেগীর যোগ্য করে তোলাই হচ্ছে এসব ইবাদাতগুলোকে ফরয করার আসল উদ্দেশ্য। এখন আমাদেরকে এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে বিচার করতে হবে যে, রোযা মানুষকে কেমন করে সেই আসল ইবাদাতের জন্য প্রস্তুত করে!
■■ রোযা ছাড়া অন্যান্য যেসব ইবাদাত আছে, তা পালন করার জন্য কোনো না কোনো রূপে বাহ্যিক প্রকাশের আশ্রয় নিতে হয়। নামায পড়ার সময় নামাযীকে ওঠা-বসা ও রুকু- সাজদা করতে হয়। এটা অন্য লোকে দেখতে পারে। হাজ্জ্ব করার জন্য দীর্ঘ পথ সফর করতে হয়, আর সেই সফরও করতে হয় হাজার হাজার মানুষের সাথে মিলে এবং যাকাত আদায়ের ব্যাপারও অন্ততপক্ষে দুজন লোককে জানতে হয়! একজন যিনি যাকাত দেন; আর অন্যজন যিনি যাকাত গ্রহণ করেন! এসব ইবাদতে বিষয় কারো কাছেই গোপন রাখা সম্ভব নয়! এগুলো আদায় করলেই অন্যান্য লোকজন তা জানতে পারে। কিন্তু রোযার কথা আল্লাহ এবং রোযাদার ভিন্ন অন্য কেউ জানতে পারে না। এক ব্যক্তি যদি সকলের সামনে সসহরী খায় এবং ইফতারের সময় সকলের সাথে মিলে ইফতার করে, আর দিনের বেলা গোপনে কিছু খায় বা পান করে, তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। প্রকাশ্যভাবে সকল লোকই তাকে রোযাদার বলে মনে করবে একথা ঠিক; কিন্তু আসলে সে মোটেই রোযাদার নয়।
■■ রোযার এ দিকটা সামনে রেখে চিন্তা করুন। যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রোযা রাখে এবং লুকিয়ে কিছু পানাহার করেন না, কঠিন গরমের সময় পিপাসায় যখন তার কলিজা ফেঁটে যাবার উপক্রম হয়, তখনও যে এক ফোঁটা পানিও পান করে না; অসহ্য ক্ষুধার দরুন চোখে তারা ফুটতে শুরু করলেও কোন কিছু খাওয়ার ইচ্ছা করে না! সেই ব্যক্তির ঈমান কত মযবুত! আল্লাহ তা'আলা যে আ'লিমুল গায়িব ও সামিয়ূম বাড়ির, সেই কথা সে কতখানি দৃঢ়তার সাথে বিশ্বাস করে। কত নিঃসন্দেহে সে জানে যে, তার কাজ দুনিয়ার লোকদের কাচে অজানা থাকলেও সারাজাহানের মালিকের কাছে কিছুই গোপন বা অজানা নয়। তার মনে আল্লাহর ভ|য় কত তীব্র। অসহ্য কষ্ট স্বীকার করা সত্ত্বেও কেবলমাত্র আল্লাহর ভ|য়েই সে এমন কাজ করে না, যাতে তার রোযা ভেঙ্গে যেতে পারে। পরকালের বিচারের প্রতি তার আকীদা-বিশ্বাস কত দৃঢ়! গোটা এক মাস সময়ের মধ্যে সে কমপক্ষে তিনশত ষাট ঘন্টাকাল রোযা থাকে। এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তার মনে কিন্ত কখনো কোনো সন্দেহ জাগে না। এ ব্যাপারে তার মনে যদি এতটুকু সন্দেহ হতো যে, পরকাল আসলেই আছে কিনা বা সেখানে আ|যাব বা সওয়াব হবে কিনা বলে কোনো দ্বন্দ্ব যদি তার মনে থাকতো, তাহলে সে কিছুতেই তার রোযা সঠিক ভাবে পূর্ণ করতে পারতো না। এ ধরণের কোনো সন্দেহ সৃষ্টি হলে কেবলমাত্র আল্লাহর হুকুম বলে মানুষ কিন্তু পানাহার ও যৌনসম্ভোগ না করার সংকল্পে মযবুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
■■ এভাবে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বছর এক মাসকাল মুসলমানদের ঈমানের ধারাবাহিক পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। এ পরীক্ষায় মানুষ যতই মযবুত হয়, ততই তার ঈমান দৃঢ় হয়। বস্তুতঃ এটা পরীক্ষার ওপরে আরেকটি পরীক্ষা! ট্রেনিং এর ওপরে আরেকটা কঠিন ট্রেনিং। কারো কাছে যখন কোনো আমানাত রাখা হয়, তখন তার ঈমান বড় পরীক্ষায় পড়ে যায়। যদি সে এ পরীক্ষায় ভালভাবে উত্তীর্ণ হতে পারে এবং সে যদি আমানাতের কোন ধরণের খিয়ানত না করে, তখন তার মধ্যে আমানাতের এই কঠিন বোঝা বহন করার জন্য আরো বেশী ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। ক্রমে সে আরও আমানাতদার হতে থাকে। তদ্রুপ আল্লাহ তা'আলাও ক্রমাগতভাবে এক মাসকাল পর্যন্ত দৈনিক বারো চৌদ্দ ঘন্টা থেকে বাইশ ঘন্টা ধরে মুসলমানদের ঈমানকে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। এ পরীক্ষায় সে যখন পুরোপুরি ভাবে উত্তীর্ণ হয়, তখন তার মধ্যে আল্লাহকে ভ|য় করে অন্যান্য গু|নাহ হতে ফিরে থাকার যোগ্যতা অধিক পরিমাণে জাগ্রত হয়। তখন সে আল্লাহকে আলিমুল গায়িব এবং সামিয়ূম বাছির মনে করে গোপনেও আল্লাহর দেয়া কোনো আইন ভঙ্গ করতে পারে না। প্রত্যেকটি কাজে সে সেই কি|য়াম|তের দিনকে মনে করবে, যেদিন সবকিছুই খুলে যাবে এবং নিরপেক্ষভাবে এর প্রত্যেকটি ভাল কাজের জন্য ভাল ফল এবং মন্দ কাজের জন্য মন্দ ফল দেয়া হবে!
■■ রোযার আর একটি বৈশিষ্ট্য এই যে, এটা মুসলমাকে দীর্ঘকাল শরীয়াতের হুকুম ধারাবাহিকভাবে পালন করতে বাধ্য করে। নামাযের এক একটি ওয়াক্তে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগে নামায আদায় করতে! যাকাত বছরে একবার মাত্র আদায় করতে হয়। হাজ্জ্বের সময় অবশ্য দীর্ঘ সময় লাগে! কিন্তু তার সুযোগ সমগ্র জীবনে মাত্র একবারই এসে থাকে। তাও আববর সকল মুসলমানের জন্য নয়! শুধুমাত্র মালদার লোকেরাই সেই সুযোগ পান। কিন্তু রোযা এসব ইবাদাত হতে অস্পূর্ণ আলাদা এবং অনন্য! যা প্রত্যেক বছর পূর্ণ একটি মাস ধরে দিন-রাত প্রত্যেক সামর্থবান মুসলমান নর-নারীকে ইসলামী শরীয়াত পালনের অভ্যাস করায়। শেষ রাতে সাহরী খাওয়ার জন্য ওঠতে হয়, একটি নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই খানাপিনা সব বন্ধ করতে হয়, সারাদিন পানাহার সহ মানুষের স্বাভাবিক এবং স্বভাবজাত কোনো কোনো কাজ কিছুতেই করা যায় না, সন্ধ্যায় নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার করতে হয়-একটু আগেও নয়, একটু পরেও নয়। ইফতারের পরে খানাপিনা ও আরাম করার অনুমতি আছে। কিন্তু তার পরেই তারাবীহ নামযের জন্য দৌঁড়াতে হয়। এভাবে প্রত্যেক বছর পূর্ণ একটি মযবুত আইনের দ্বারা সকল মুসলিম নর-নারীকে বেঁধে রাখা হয়। তারপর বছরের বাকী এগারো মাসের জন্য তাকে জীবনের কর্মক্ষেত্রে মুক্ত করে দেয়া হয়। পবিত্র এই রমযান মাসে যে ট্রেনিং সে পেয়েছে, পরবর্তী এগারোটি মাস তার সকল কাজ-কর্মের ভিতর তা যেন প্রতিফলিত হয় এবং তারপরও কোনো বিষয় অস্পূর্ণ থাকলে, পরবর্তী বছর তা যেন পূর্ণ করে দেয়া হয়!
■■ মুসলমান সমাজের এক এক ব্যক্তিকে আলাদাভাবে এ ট্রেনিং নেয়ার ব্যবস্থা করা হলে তা মোটেই ফলপ্রসু হতো না। সৈনিকদেরকে কখনো এক একজন করে প্যারেড করানো হয় না, গোটা সৈন্যবাহিনীকে একত্রে এক সাথে তা করানো হয়। সকলকে একই সময় বিউগলের আওয়ায শুনে উঠতে হয় এবং বিউগলের আওয়ায অনুসারে নির্দিষ্ট কাজে লেগে যেতে হয়। ফলে সৈন্যদের মধ্যে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার একটা অভ্যাস তৈরী হয়। সেই সাথে একজনের ট্রেনিং-এ অন্যজন:প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে থাকে। কোনভাবে একজনের ট্রেনিং কোনরূপ অসম্পূর্ণ থাকলে দ্বিতীয়জন এবং দ্বিতীয়জনের অসম্পূর্ণ থাকলে তৃতীয়জন তা পূর্ণ করে থাকেন। ঠিক এজন্য ইসলামে রমযান মাসকে রোযা পালন করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়ছে। সমগ্র মুসলমানকে আদেশ করা হয়েছে, তারা সকলে মিলে এ সময়ে রোযা রাখতে শুরু করবেন। বস্তুত এ হুকুমটি মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদাতকে সামগ্রিক ইবাদাতে পরিণত করে দিয়েছেন।
■■ এক সংখ্যাকে লক্ষ্য দ্বারা গুণ করলে যেমন লক্ষ্যের একটি বিরাট সংখ্যা হয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি ভাবে এক এক ব্যক্তির আলাদা আলাদা ভাবে রোযা রাখায় যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ করা যায়; লক্ষ কোটি মানুষ একত্রে রোযা রাখলে লক্ষ্য কোটি গুণ বেশী উন্নতি লাভ করা সম্ভব।
■■ গোটা রমযান মাস সমগ্র বিশ্বের পরিবেশকে নেকী আর পরহেযগারীর পবিত্র ভাবধারায় উজ্জল করে তোলে। গোটা জাতীয় জীবনে তাকওয়া-পরহেযগারীর সবুজ তাজা ফসল বৃদ্ধি পায়। প্রত্যেক ব্যক্তি কেবলমাত্র নিজেই গু|নাহ হতে বাঁচাতে চেষ্টা করে না, বরং তার মধ্যে কোনো প্রকারের দুর্বলতা থাকলে, তার জন্য অন্যান্য সব রোযাদার ভাই তার সাহায্য এবং সহযোগিতা করে।
■■ রোযা রেখে কোনো গু|নাহ করতে প্রত্যেকটি মানুষের লজ্জাবোধ হয়। পক্ষান্তরে প্রত্যেকের মনে কিছু ভাল এবং সওয়াবের কাজ করার ইচ্ছা জাগে। সম্ভব হলে গরীবকে একবেলা খাবার দেয়া, বস্রহীন ব্যক্তিক কাপড় দান করা, বিপন্নের সাহায্য করা সহ বিভিন্ন নেক কাজের আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং এসব কাজে মানুষ অংশগ্রহণ করে। কোথাও পা|প কাজ হতে থাকলে তা বন্ধ করতে চেষ্টা করে। এভাবেই সব ব্যক্তি, সমাজ, দেশ সহ গোটা বিশ্বের চারদিকে নেকী এবং তাকওয়ার একটি মনোরম পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে সকল প্রকারের পুণ্য ও ভাল কাজ বৃদ্ধি পাওয়ার অনুকূল মৌসুম শুরু হয়। বস্তুত দুনিয়াতে সকল ফসল নির্দিষ্ট মৌসুমে ফলে থাকে। তখন চারদিকে কেবল সেই ফসলেরই চমৎকার দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হয়। এজন্যই শেষ নাবী সল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম অরশাদ করেছেনঃ
كُلُّ عَمَلٍ اِبنِ ادَمَ يُضُاعَفُ الْحَسَنَةَ بِعَشَرِ اَمْثَالِهَا اِلى سَبْعِ مَائَةِ ضِعْفٍ ـ قَالَ اللهُ تَعَالى الصَّوْمُ اِلاَّ الصَّوْمُ فَانَّهُ لِىْ وَاَنَا اَجْرِى بِه ـ
-------"মানুষের প্রত্যেকটি কাজের ফল আল্লাহর দরবারে কিছু না কিছু বৃদ্ধি পায়; একটি নেক কাজের ফলে দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বেশী হয়ে থাকে। কিন্তু মহান আল্লাহ বলেন, রোযাকে এর মধ্যে গণ্য করা হবে না! কারণ রোযা খাছ করে কেবল আমারই জন্য রাখা হয়। আর আমিই এর প্রতিফল দান করবো।"
■■ এ হাদীস দ্বারা পরিষ্কারভাবে জানা গেল যে, কোনো নেক কাজ যে করে তার নিয়ত অনুসারে নেক কাজের ফল অত্যাধিক বৃদ্ধি পায় বটে, কিন্তু সে সবের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। কিন্তু রোযার ফল বৃদ্ধির কোনো শেষ সীমা নির্দিষ্ট নেই। রমযান মাস যেহেতু মঙ্গল, কল্যাণ এবং নেকী বৃদ্ধি পাবার অন্যতম একটি মৌসুম, এ মৌসুমে কেবল একজন মুসলমানই নয় বরং লক্ষ কোটি মুসলমান মিলে এ নেকীর বাগিচায় পানি ঢালে। এজন্য তা সীমা সংখ্যাহীন ফল দান করতে পারে। এ মাসে যত ভাল নিয়তের সাথে ভাল কাজ করা যাবে, যত বারাকাত রোযাদার নিজে লাভ করবে এবং অন্য রোযাদার ভাইকে দিতে চেষ্টা করবে। তারপর পরবর্তী এগারো মাস পর্যন্ত এ মাসের যত প্রভাব রোযাদারের ওপর থাকবে, এটা ততোটাই বেশী সুফল দেবে। এটা এমনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকবে, যার কোনো শেষ সীমা পরিসীমা থাকবে না। এখন মুসলমান নিজেরাই যদি এটাকে সীমাবদ্ধ করে রাখে, তবে সে কথা স্বতন্ত্র।
■■ রোযার এ আশ্চর্যজনক সুফল এবং বারাকাতের কথা শুনে প্রত্যেকের মনেই এ প্রশ্ন জাগতে পারে যে, আজ এসব কোথায় গেল? মুসলমানরা আজ রোযা রাখে এবং নামাযও পড়ে। কিন্তু এর সুফল, যা বর্ণানা করা হয় তা তারা আদৌ লাভ করছে না কেন? এর উল্লেখযোগ্য একটা কারণ হলো,
------"ইসলামের ব্যাপক বিধানের বিভিন্ন অংশকে আলাদা আলাদা করে ফেলার পর এবং তাতে বাইরের অনেক নূতন জিনিসের আমদানী বা সংযুক্ত করার পর, তা থেকে আর আসল ফল লাভের আশা করা যায় না!"
■■ দ্বিতীয় কারণ এই যে, ইবাদাত সম্পর্কে বর্তমান সময়ে মুসলমানদের দৃষ্টিভংগী সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তারা এখন মনে করেছে যে, সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত সময় কিছু খানাপিনা না করার নামই ইবাদাত। আর এ কাজ কোনো লোক করলেই তার ইবাদাত পূর্ণ হলো, এরূপ মনে করা হয়। এভাবে অন্যান্য সকল ইবাদাতরেও কেবল বাইরের কাঠামো এবং অনুষ্ঠানকেই ইবাদাত বলে মনে করা হয়। এজন্যই সব কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হওয়া আবশ্যক। এখন মুসলমানদের শতকরা ৯৯ জন বরং তার চেয়েও বেশী সংখ্যক লোকই তা থেকে বঞ্চিত। ঠিক এজ্যই ইবাদাতসমূহ তার পরিপূর্ণ ফল দেখাতে পারে না। কারণ, ইসলামে নিয়ত ও বুদ্ধি-বিবেচনা এবং আন্তরিকতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে!
■■ রোযা মানুষের আত্মার উন্নতি বিধানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীব প্রবৃত্তিকে দুর্বল করতঃ মানবীয় সকল গুণাবলীর বিকাশ সাধন করে আল্লাহ্ তা'আলার প্রতি সঠিক এবং পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করে তাঁর গুনে গুণান্বিত হওয়ার শিক্ষাদান করাটাই হলো রোযার মূল উদ্দেশ্য! রোজাদার ব্যক্তি স্বীয় জীব প্রবৃত্তি দুর্বল হয়ে পড়া অবস্থায় যখন আল্লাহ তা'আলার জিকিরে নিমগ্ন থাকেন, তখন রোযার পরিপূর্ণ ফায়েজ, বারাকাত এবং রহমাত তার উপর অবতীর্ণ হয়। ফলে তার আত্মার সব জীব প্রবৃত্তি তথা বদস্বভাব গুলো দূর হয়ে যায়। মানুষ যখন রোযা রেখে পরিপূর্ণভাবে আত্মশুদ্ধি লাভে সক্ষম হয়, তখনি মানুষের মাঝে মানবীয় গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। এমতাবস্থায় তিনি প্রকৃত মু'মিনে পরিণত হন। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সেই বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে বান্দার হৃদয়ে আসন গ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে হাদিসে কুদসীতে মহান আল্লাহ্ তা'আলা ফরমানঃ
-------"রোযা আমার জন্য এবং আমি তার প্রতিদান।"
■■ রসূলণসল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ -------"যারা এক মাস পূর্ণভাবে রোযা পালন করে, তারা রমযান শেষে সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় পুতঃপবিত্র হয়ে যায়!" এজন্যই অনাদিকাল থেকেই সকল নাবী-রসুল এবং সকল আওলিয়ায়ে কেরামগঢ ও সূফী সাধকগণ রোযাকে তাঁদের সাধনকর্মে গুরুত্ব সহকারে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন।
■■ হাকিকতে সিয়াম বা প্রকৃত রোযার ব্যাখ্যা হলো এই যে, রোযাকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়! যথাঃ ● ০১] সাধারণ শ্রেণীর রোযা; ● ০২] মধ্যম শ্রেণীর রোযা এবং ● ০৩] উচ্চ শ্রেণীর রোযা! আর্থ হলো, শুধুমাত্র পানাহার ও কামাচার হতে বিরত থাকা হলো- সাধারণ শ্রেণীর রোযা! পানাহার, কামাচার এবং পা|পাচার হতে বিরত থাকা হলো- মধ্যম শ্রেণীর রোযা এবং পানাহার, কামাচার ও প|পাচার হতে বিরত থেকে সর্বক্ষণ মহান আল্লাহ্ তা'আলার জিকির বা স্মরণে নিমগ্ন থাকাকে উচ্চ শ্রেণীর রোযা হিসেবে গণ্য করা যায়! আর এই উচ্চ শ্রেণীর রোযাই হলো- হাকিকতে সিয়াম বা প্রকৃত রোযা!
■■ প্রত্যেকটি সাধারণ মানুষের জন্য একজন দ্বীনদ্বার, পরহেজগার, মুত্তাকী এবং আল্লাহ ওয়ালা আলিম/পীর/অলী-আল্লাহ/শায়খ এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁর সোহবাত বা সঙ্গ লাভ করা জরুরী! অতঃপর তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী সব নেক আমল সহ নামায আদায় করলে নামাযে হুজুরী বা একাগ্রতা সৃষ্টি হয় এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেক ধ্যান-সাধনা কিংবা মোরাকাবা করলে আত্মা শুদ্ধ হয়। অনুরূপভাবে রোযাকে সঠিকভাবে পালনের জন্যও অলী আল্লাহ্গণের সোহবতে গিয়ে তাঁদের শিক্ষা লাভ করা প্রয়োজন! কারণ শুধুমাত্র উপবাস থাকলেই মানুষের রোযার ফরয আদায় হয় না!,যেমনঃ সুবেহ সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোন একটি প|শুর পানাহার বন্ধ করে উপবাস রাখলে ওই প|শুর জন্য তা রোযা হবে না! কারণ রোযা ফরয করা হয়েছে মানুষের জন্য, তার প|শু প্রবৃত্তিকে দমন করে মনুষ্য চরিত্র অর্জন করার জন্য! সুতরাং প্রকৃত রোযা পালনের জন্য পানাহার, কামাচার এবং সকল পা|পাচার হতে বিরত থেকে পরিশুদ্ধ অন্তঃকরণে মহান আল্লাহ্র জিকিরে নিমগ্ন থাকা শর্ত! আর এটাই হলো পবিত্র রমযান এবং রোযার প্রকৃত হাকীকাত!!
●● ইয়া আল্লাহ তা'আলা! আমাদের সবাইকে সঠিক এবং পরিপূর্ণভাবে জানার, বোঝার ও মেনে চলার এবং পবিত্র রমযানের পরিপূর্ণ হক্ব আদায় করার এবং পবিত্র রমযান ও রোযার এবং শব-ই ক্বদরের পরিপূর্ণ ফযীলত ও হাকীকাত অর্জন করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদেরকে পবিত্র রমযান ও শব-ই ক্বদরের পরিপূর্ণ ফযীলত,রহমাত, খায়ের, বারাকাত, মাগফিরাত ও নাজাত দান করুন এবং আমাদের সবাইকে ক্ষমা, কবুল ও হিফাযত করুন এবং আমাদেরকে সুস্থ্য, সুন্দর, নিরাপদ ও ভালো রাখুন।
* হোয়াটসঅ্যাপ থেকে সংগৃহীত।