মাওলানা আবরারুল হক :
আলহামদুলিল্লাহ। সকল প্রশংসা ও শুকরিয়া আল্লাহ তাআলার জন্য; যিনি মুসলিমকে শ্রেষ্ঠতম মাস রমযান দান করেছেন ও রমযানকে বিশেষ রাত্রি দ্বারা হাজার মাস থেকেও শ্রেষ্ঠতর করেছেন।
রোজা : এটি ফার্সি শব্দ। এর আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘সওম’। যার বহুবচন ‘সিয়াম’। পরিভাষায় রোজা হলো, সুবহে সাদিক তথা ফজরের সময় শুরু হওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর রাজি-খুশির উদ্দেশ্যে পানাহার ও স্ত্রী-সঙ্গম থেকে বিরত থাকা।
রমযান মুমিনের জন্য বসন্ত। ইবাদত, ক্ষমা ও নেকির সয়লাব হলো যে বসন্তের ফুল। রমযান হলো ফলবান বৃক্ষের ন্যায়। যার ফল ইহকাল-পরকাল উভয় জগতেই বিস্তৃত। যে মাসের দিনে সিয়াম ও রাতে ক্বিয়ামের মাধ্যমে ‘খালেক ও মাখলুকে’র মাঝে নিগুঢ় সম্পর্ক স্থাপন হয়। এ মাসে থাকে বান্দার পক্ষ থেকে ত্যাগ, ধৈর্য, আমল আর আল্লাহর পক্ষ থেকে থাকে রহমত, মাগফেরাত, নাজাত এবং সর্বশেষে ক্ষমার পয়গাম সম্বলিত বরকতময় ঈদুল ফিতর।
আর সেই মহান উদ্দেশ্যেই রমযানের শুরু হতে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনকে আহ্বান করে বলা হয়, “হে কল্যাণ অন্বেষী, নেকির পথে তুমি আরো বেগবান হও। আর হে অকল্যাণের পথিক, তুমি নিবৃত্ত হও, নিয়ন্ত্রিত হও।” (তিরমিজি, হাদিস নং ৬৮২)
কুরআনে আল্লাহ বলেন, “হে ইমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে; যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৩)
উক্ত আয়াতের মাধ্যমে মুসলিমদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। রোজা এমন একটি বিধান, যা পূর্ববর্তী অনেক নবী ও তাদের উম্মতের উপর ফরজ করা হয়েছিল। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী জাতিই যে কোনভাবেই হোক রোজাকে তাদের অবশ্য পালনীয় মনে করে থাকে। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পাদ্রীগণ বিভিন্ন উপলক্ষে রোজা বা উপবাসব্রত পালন করে থাকেন। ইহুদিদের ওপর মহররম মাসের প্রথম দশদিন রোজা ফরজ ছিল। কেননা, তাদের অনুসরণীয় নবী হযরত মূসা (আঃ) এই ক’দিন তূর পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান করেছিলেন ও সেসময় তাওরাত কিতাব লাভ করেছিলেন। তাছাড়া, হিন্দু জাতিগোষ্ঠীর মাঝে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দু’দিন ব্যাপি উপবাসব্রত পালন করার প্রথা ও বৌদ্ধদের মধ্যে ভিক্ষু সম্প্রদায় প্রতিদিন দ্বিপ্রহর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করার প্রথার প্রমাণ ইতিহাসে পাওয়া যায়।
এছাড়াও কুরআন হাদিসে হযরত নূহ (আঃ), দাউদ (আঃ), মূসা (আঃ) ও ঈসা (আঃ)সহ অনেক নবী-রাসূলের রোজা রাখার তথ্য-প্রমাণ বর্ণিত রয়েছে।
সর্বশেষে, সাইয়্যিদুল আম্বিয়া রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর উম্মতের উপর রোজার বিধান ফরজ করা হয়েছে। রাসূল (সাঃ)-এর জীবনে রোজার বিধান তিনটি ধারায় অবধারিত হয়েছে। প্রথমত: আশুরার রোজা, দ্বিতীয়ত আইয়ামে বীজের ( চান্দ্রমাসের ১৩,১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা, অতপর রমযানের রোজার বিধান করা হয়েছে। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ২য় হিজরির শাবান মাসে সমগ্র মুসলিম, বালেগ, বিবেক সম্পন্ন, সক্ষম ও মুকীম তথা নিজ অবস্থানে অবস্থানকারীর উপর রমযানের রোজা ফরজ করা হয়েছে।
রমযানের ফাযায়েল : রমযান এক বরকতময় ও মহিমান্বিত মাস। রমযান কুরআন নাযিলের মাস। রমযান অনেক নবী-রাসূলের উপর সহীফা (আল্লাহর কিতাব) নাযিলের মাস। রমযান ক্বদর রজনী ধারণের মাধ্যমে একটি শ্রেষ্ঠ মাস। আল্লাহ তাআ’লা রমযানকে বিশেষ মর্যাদাবান করেছেন এবং রমযানের রোজা পালনকারীদের জন্য বিশেষ নেয়ামতরাজী ঘোষণা করেছেন।
রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। রাসূল (সাঃ) বলেন, “ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে পঞ্চম হলো রমযানের রোজা।” তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাব (আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও সওয়াবের প্রত্যাশা) নিয়ে রমযান মাসে রোজা রাখবে তার পূর্বের সকল (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী, হাদিস নং ৮)
রোযা একমাত্র আল্লাহ তাআ’লার জন্য নিবেদিত হয়। রোজা আল্লাহর নিকট অনেক প্রিয় একটি আমল। তাই রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের সুগন্ধি থেকেও অধিক প্রিয়। রোজাদারের আসল আনন্দের মূহুর্ত তো হবে তখন, যখন পরকালে সে স্বয়ং আল্লাহকে দেখতে পারবে। রাসূল (সাঃ) বলেন, “রোজাদারের জন্য দু’টি বিশেষ আনন্দের মূহুর্ত রয়েছে। একটি হল ইফতারের সময়। অপরটি হল যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (মুসলিম, হাদিস নং ১১৫১)
এমনকি তখন রোজাদার সকলে খালিকুল মাখলুক, রব্বুল মামলুক স্বয়ং আল্লাহ তাআ’লা কর্তৃক পুরষ্কৃত হওয়ার দ্বারা ধন্য হবে। যা প্রতিটি মুমিনের দিলের তামান্না। হাদীসে কুদসীর বর্ণনায় রয়েছে, “রমযানে মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকির সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ বলেন, তবে রোযা আলাদা। কেননা, উহা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করবো। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং পানাহার থেকে বিরত থাকে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৯৭১৪)
অন্য হাদিসে রাসূল (সাঃ) বলেন, “রমযান বরকতময় মাস। আল্লাহ তোমাদের উপর এ মাসে রোজা ফরজ করেছেন। এ মাসে জান্নাতের সব ফটক খুলে দেওয়া হয় ও জাহান্নামের সব ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে আবদ্ধ করে ফেলা হয়।” (বুখারী, হাদিস নং ৩২৭৭)
আর রোজাদারের জন্য অফুরন্ত বরকতের মূহুর্ত হলো ইফতারের সময়। হাদিসের বর্ণনা মতে, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। এক. ইফতার পর্যন্ত রোজাদারের দোয়া, দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া, তিন. মাজলুমের দোয়া। তাছাড়া, জান্নাতে রোজাদারের জন্য ‘রাইয়্যান’ নামক বিশেষ ফটক নির্দিষ্ট থাকবে; যার দ্বারা রোজাদারকে সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করা হবে। রাসূল (সাঃ) বলেন, “জান্নাতে একটি ফটক রয়েছে। নাম ‘রাইয়্যান’। কিয়ামতের দিন সেটা দিয়ে রোজাদারগণ প্রবেশ করবে। তারা ব্যতিত অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।” (বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৬)
তিনি বলেন, “কেয়ামতের দিন রোজা ও কুরআন বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে।” (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৬৬২৬)
মহান আল্লাহ কর্তৃক রোজাদারের জন্য এতো ফজিলত প্রদান বান্দার মর্যাদা ও সৌভাগ্যের প্রতীক। বান্দাকে আল্লাহ অনেক ভালোবাসেন বলেই বান্দা গুনাহমুক্ত, পূত-পবিত্র ও মাকবুল হওয়ার জন্য তিনি এতো অফুরন্ত সুযোগ দিয়ে রেখেছেন। যেন বান্দার জান্নাতে যাওয়ার পথ সুগম হয়।
রমযানে পালনীয় কর্তব্য : রমযান এক বরকতময় মাস। রমযান গুনাহ মাফের মাস, পূতপবিত্র হওয়ার মাস। এ মাসে রোজাদার ব্যক্তি যেমন হয় মহিমান্বিত ও সৌভাগ্যবান, তেমনি রোজা ভঙ্গকারী হয় সর্বহারা ও হতভাগা। এমনকি রোজা কবুল হওয়ার জন্য রোজার নিয়তে শুধু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ‘উপবাস’ যাপন করলেই হবে না; মেনে চলতে হবে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত ইসলামের উত্তম বিধানাবলী। কেননা, রাসূল (সাঃ) বলেন, “রোজা ঢাল স্বরূপ হয়, যতক্ষণ না তা বিদীর্ণ করে ফেলা হয়। নবীজিকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কিভাবে তা বিদীর্ণ হয়? উত্তরে বলেছেন, মিথ্যা ও গীবতের মাধ্যমে।” তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, মন্দ কাজ ও মূর্খসুলভ আচরণ ছাড়লো না, তার পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (বুখারী, হাদিস নং ৬০৫৭)
সুতরাং এমন যেন না হয়, সারাদিন না খেয়ে থাকা হলো আর দিন শেষে ফলাফল শূন্য। একদা রাসূল (সাঃ) জিব্রাইল (আঃ)-এর এক দোয়া উল্লেখ করে বলেন, “জিব্রাইল বললেন, ঐ ব্যক্তি হতভাগা, যে রমযান মাস পেল, আর রমযান শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তার গুনাহ মাফ হলো না। রাসূল (সাঃ) দোয়ার সাথে সাথে বলেন, আমীন।” (বুখারী, হাদিস নং ৬৪৪)
নবীজি (সাঃ) কখনো উম্মতের ক্ষতি চান না বরং তিনি চেয়েছেন, এমন অতুলনীয় সুযোগের মাস রমযান পেয়ে যেন আমরা সবাই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে পারি এবং আল্লাহ থেকে ক্ষমা অর্জন করে পূত-পবিত্র হতে পারি।
সে উদ্দেশ্যে লাইলাতুল ক্বদর হতে পারে এক বিশেষ লক্ষ ও আমলের রাত্র। আল্লাহ তাআ’লা ক্বদরের রাত্রকে মর্যাদাবান করে ঘোষণা দিয়েছেন। “ক্বদর রজনী হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ (জিব্রাইল আঃ) অবতরণ করেন।” (সূরা ক্বদর, আয়াত ৩-৪)
রাসূল (সাঃ) বলেন, “এই মহিমান্বিত রমযান মাস উপস্থিত। তাতে একটি রজনী রয়েছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হলো, সে যেন সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। আর কেবল অভাগাই এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত থাকে।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৬৪৪)
এমন শ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত রাতে সকল মুসলিমের ইবাদত ও আমল করা উচিৎ; বরং জরুরী। রাসূল (সাঃ) বলেন, “তোমরা রমযানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে ‘ক্বদর’ অন্বেষণ করো। (বুখারি, হাদিস নং ২০১৬)
ক্বদর রজনীর সৌভাগ্য সহজে পেতে একটি সহজ উপায় ও বিশেষ সুন্নত আমল হলো ই’তিকাফ। ‘নবীজি (সাঃ) ইন্তিকালের আগ পর্যন্ত রমযানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস নং ১১৭২)
রমযানসহ সারা বছরের জন্যই এক বিশেষ আমল হলো তাহাজ্জুদ নামাজ। কেননা, রাসূল (সাঃ) বলেন, “ফরজ নামাজের পর মধ্যরাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ) সর্বোত্তম।” (বুখারী, হাদিস নং ১১৬৩)
কুরআনে রাসূল (সাঃ)-কে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ের জন্য বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং রমযান মাস কুরআন তেলাওয়াতের জন্য হতে পারে এক মোক্ষম সময়। রমযানে কুরআন তেলাওয়াত ও খতম করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য হাসিল করা অধিকতর সহজ ও উত্তম পন্থা।
রমযান উপলক্ষে এক দায়িত্ব হলো সাহরি ও ইফতার করা। মুমিনের জন্য সাহরি ও ইফতার এক ইবাদতও বটে। রাসূল (সাঃ)-এর হাদিস অনুযায়ী ইফতারের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ মূহুর্ত। ইফতার পরবর্তী আমল তারাবির নামাজ। যা সকলের জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এর মাধ্যমে বান্দার ক্বিয়াম, কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ, আল্লাহকে স্মরণসহ অনেক আমল একত্রে আদায় হয়।
এভাবে সাহরি, ইফতার, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, তেলাওয়াত, ইত্যাদি আমলসহ রোজা দীর্ঘ একমাস জুড়ে পালিত হয়। এর মধ্যে কখনো ছোটখাটো, ভুল-ঘাটতি হয়ে যেতে পারে। ইসলাম সেটার সুন্দর মার্জনা ও কাফফারা স্বরূপ ‘সদকায়ে ফিতর’ বিধানের ব্যবস্থা করেছে। এতে দু’টি হিকমত বিদ্যমান। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, “রাসূল (সাঃ) সাদকাতুল ফিতরের বিধান করেছেন রমযানে রোজাদারকে যাবতীয় ভুল-ঘাটতি থেকে পবিত্র করার জন্য ও মিসকিন, দরিদ্রদের খাবারের উত্তম ব্যবস্থা করার জন্য।”
রহমত ও আমলে ভরপুর একটি মাস রমযান। রমযানের রোজা তো বরকতময় ও মহিমান্বিত। আবার রমযান পরবর্তী শাওয়াল মাসে এমন ছয়টি রোজা রয়েছে, যা রাখার দ্বারা সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়। রাসূল (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি রমযানে রোজা রাখবে, এরপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখবে সে পুরো বছর রোজা রাখার সওয়াব লাভ করবে।” (মুসলিম, হাদিস নং ১১৬৪)
রমযানে পুরো এক মাস রোজা রাখার দ্বারা এক অভ্যাস ও মানসিকতা তৈরি হয়ে থাকে। যার দ্বারা শাওয়ালের ছয় রোজা রাখাও তুলনামূলক সহজ হয়। সুতরাং, সক্ষম ব্যক্তিদের এ বিশেষ আমলটিসহ রমযানের প্রতিটি আমল সঠিকভাবে আদায় করা উচিত।
রমযানের শিক্ষা ও তাৎপর্য : রমযান বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের শিক্ষাকেন্দ্র। মানবজীবনের সার্বিক দিক বিবেচনায় অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় গুণ হলো- তাকওয়া, যা রোজার মাধ্যমে অধিক অর্জন হয়। আল্লাহ বলেন, “তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়াবান (খোদাভীরু) হতে পারো।” (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৩)
তাকওয়া হলো এমন গুণ যার দ্বারা ব্যক্তির হৃদয়ে আল্লাহর ভীতি জাগ্রত হয় ও আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে যাবতীয় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা ও ইবাদত করা যায়। রোজা হলো ফলবান বৃক্ষের ন্যায়, যার একটি উল্লেখযোগ্য ফল হলো তাকওয়া। কেননা, রোজা রাখা হয় রিয়ামুক্তভাবে একমাত্র আল্লাহ তাআ’লার জন্য। আর রোজাদার তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত হয়ে লুকিয়ে আহার করার একাধিক সুযোগ থাকার পরেও কিছু ভক্ষণ করে না। আর সেটা একমাত্র আল্লাহ তাআ’লার ভয়েই সম্ভব হয়। এমনটা শুধু রোজার উত্তম ফল তথা তাকওয়ার দ্বারাই সম্ভব হয়ে থাকে।
এছাড়াও রোযার দ্বারা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা এবং রিয়া ও অহংকারমুক্ত জীবন যাপনের গুণ অর্জন হয়। রোজার উল্লেখযোগ্য আরো কিছু গুণ হলো- ধৈর্য, সততা, সহনশীলতা, নৈতিক আদর্শ ইত্যাদি। যা সঠিকভাবে রোজা রাখার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
রোজা এমন একটি আমল যাতে বিভিন্ন শিক্ষা, হেকমত, তাৎপর্য লুকায়িত। রোজা ধনী-গরিবের মধ্যে এক বিস্ময়কর সেতুবন্ধন। ধনী ব্যক্তি রোজা রাখার মাধ্যমে দরিদ্রের কষ্টের নমুনা অনুভব করতে পারে। ফলে সে দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। রমযানে দরিদ্রকে দান-সদকা করে, যাকাত প্রদান করে। এভাবে সমাজে ধনী-গরিবের মাঝে স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি তৈরি হয়। যার আধ্যাত্মিক ও পরোক্ষ প্রভাব অনেক গভীর।
এছাড়াও বর্তমানে আধুনিক যুগে অনেক বিজ্ঞানী, ডাক্তারগণ রোজা রাখার দ্বারা স্বাস্থ্যগত উপকার, ক্ষতিকর বস্তু জলীয় পদার্থ হ্রাস, শরীরে অতিরিক্ত মেদ হ্রাসসহ হৃদযন্ত্র, পরিপাকতন্ত্রের উপকারের মতো বহুবিধ উপকারিতা আবিষ্কার করেছেন। যার দ্বারা সারা বিশ্বে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের রোজা সর্বজ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত ও হেকমতপূর্ণ বিধান।
রমযান ও কিছু মাসআলা : রমযান সম্পর্কিত সাধারণ প্রসিদ্ধ মাসায়েলগুলো অনেকের জানা রয়েছে। তবে বিশেষ কিছু মাসায়েল উল্লেখযোগ্য।
রোজার নিয়ত করা ফরজ। পূর্বের দিনের সূর্যাস্তের পর থেকেই নিয়তের সময় শুরু হয়। যা সুবহে সাদিক পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে। তবে রাতে নিয়ত করতে না পারলে দিনের দুপুরে সূর্য ঢলে পড়ার প্রায় এক ঘন্টা আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যাবে। পুরো মাসের রমযানের জন্য একবারে একত্রে নিয়ত না করে প্রত্যেক রোজার পৃথক নিয়ত করতে হবে।
বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা পান করলে রোজা ভেঙে যাবে। দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে যদি থুথুর সাথে পেটে চলে যায় আর থুথুর পরিমাণ রক্তের থেকে কম হয় তাহলে রোজা ভেঙে যাবে। হস্তমৈথুন, স্ত্রী-চুম্বন, আলিঙ্গন ইত্যাদি দ্বারা বীর্যপাত হলে রোজা ভেঙে যাবে। তবে স্বপ্নদোষের কারণে রোজা ভাঙবে না। রোজা অবস্থায় হায়েজ-নেফাস শুরু হলে রোজা ভেঙে যাবে। পরে সেটা কাযা করতে হবে। তবে কোন মহিলা মেডিসিনের মাধ্যমে হায়েজ বন্ধ রাখলে তার উপর তখন নামাজ-রোজা আদায় করা ফরজ।
তবে প্রয়োজনে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারীনি মহিলা, মুসাফির, অসুস্থ, মাযূর ব্যক্তি রমযানে রোজা না রেখে পরবর্তীতে কাযা আদায় করতে পারবে। আর দূর্বল-বৃদ্ধ, বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি রোজা একদমই না রাখার মতো অবস্থা হলে রোজা না রেখে প্রত্যেক রোজার পরিবর্তে ফিদইয়া হিসেবে একজন গরিবকে দুই বেলা খাওয়াবে বা পৌঁনে দুই কেজি গমের মূল্য সদকা করে দিবে। তবে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য বা পড়াশোনার অজুহাতে রোজা না রাখা বা ভাঙার কোন অবকাশ ইসলামে নেই।
আর চিকিৎসার প্রয়োজনে শরীরে ইনজেকশন দেওয়া, এন্ডোস্কপি করা ও রোজা অবস্থায় রক্ত দেওয়া বা নেওয়ার দ্বারা রোজা ভাঙে না। তবে ইনহেলাল ব্যবহারের দ্বারা রোজা ভেঙে যায়।
আর রোজার হালতে মিথ্যা-গীবত, গালি-গালাজ, ঝগড়া-বিবাদের দ্বারা, টিভি-সিনেমা দেখা, গান-বাজনা শুনা, বড় ধরনের গুনাহে লিপ্ত হওয়ার দ্বারা রোজা মাকরূহ হয়।
রমযান শেষে ঈদ এক গুরুত্বপূর্ণ আমল। যার মাধ্যমে ইবাদত অনুযায়ী বান্দাকে ক্ষমা ও বরকত দান করা হয়। এমন এক নেয়ামতপূর্ণ সময়ে উৎসব নামে পশ্চিমা কালচার, বেহায়াপনা ও অতি বাড়াবাড়ি অনুচিত। অনেকাংশে তা গুনাহের কারণ। যা নেককার মুমিনের গুণ হতে পারে না।
সুতরাং পরিপূর্ণ হকসহ রমযানের রোযা আদায়শেষে পবিত্রভাবে ঈদ উদযাপন করতে হবে ও আল্লাহর নিকট মাকবুল বান্দা হতে হবে।
সময়ের পরিক্রমায় প্রতিবছর রমযান আসে ও চলেও যায়। এভাবে জীবনের সময়ও একদিন ফুরিয়ে যাবে। পরিমাপ হবে সওয়াব ও গুনাহ। সেদিন সফল হবে সে ব্যক্তিই, যে ইহকালে রোজা, নামাজ, আমল সঠিকভাবে আদায় করেছে। যাবতীয় গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে তাকওয়া অর্জন করতে পেরেছে। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পেরেছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন।
লেখকঃ
এক্সিলেন্ট স্কুল অ্যান্ড মাদরাসার সাবেক ছাত্র, কাজিয়াকান্দা কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জয়নুল আবেদীন দামাত বারাকাতুহুমের সাহেবজাদা।
বর্তমানে :
স্নাতক অধ্যয়নরত, সায়েন্সেস অব হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
ফাজিলে অধ্য, মোমেনশাহী ডি. এস. কামিল মাদ্রাসা, ময়মনসিংহ।